ফল উৎপাদনে অনন্য উদাহরণ

ফল ছোট-বড় সবার প্রিয় খাদ্য। ফলে শর্করা, আমিষ, স্নেহ পদার্থ ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ ও ভিটামিন। রঙিন ফল ভিটামিনের এক অনন্য উৎস। টকজাতীয় ফলে রয়েছে ভিটামিন-সি। মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফলের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ফলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি রান্না ছাড়াই অতি সহজে খাওয়া যায়। সব ফলের মধ্যে পানির পরিমাণ থাকে বেশি। সে কারণে গরমের সময় শরীরের পানিশূন্যতা পূরণে ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফল মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে, ফলের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের ভেতরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সহায়তা করে। রঙিন ফলের ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে ও চোখের চারপাশের শুষ্কতা দূর করে। লেবুজাতীয় ফল ভিটামিন-সি-সমৃদ্ধ। লেবুর রসে মধু বা আদা বা লবণ মিশিয়ে পান করলে ঠান্ডা, সর্দি-কাশি উপশম হয়। ভিটামিন-সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পাশাপাশি হাড়, দাঁত ও মাড়ির জন্য ভিটামিন-সি অনেক উপকার। এটি ত্বকের টিস্যু গঠনেও সরাসরি অংশগ্রহণ করে। যেকোনো ক্ষত খুব তাড়াতাড়ি সারিয়ে তুলতে এই ভিটামিন-সিয়ের কোনো বিকল্প নেই।

ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সফলতার অনন্য উদাহরণ। বর্তমান বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হারের রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার হিসাবে, ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে সাড়ে ১১ শতাংশ হারে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম এবং পেঁপে উৎপাদনে ১৪তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আজ থেকে ২০ বছর আগে আম, কাঁঠাল, কলাই ছিল এ দেশের প্রধান ফল। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ রকমের প্রচলিত, অপ্রচলিত ও বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে। আম, কাঁঠালের বাইরে মৌসুমি ফলের মধ্যে রয়েছে জাম, লিচু, কুল, কামরাঙা,বেল, তাল আনারস, আতা, সফেদা, লটকন, তরমুজ ইত্যাদি। ২০০৮-০৯ সালে বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন ছিল এক কোটি টন, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ টনে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু দৈনিক দানাদার জাতীয় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে বেড়েছে ফল গ্রহণের পরিমাণ। ২০০৬ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, যা বেড়ে এখন হয়েছে ৮৫ গ্রাম।

২০১৮-১৯ সালের হিসাবে, বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষ হয়েছে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে ফল আবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে হয়েছে আমের চাষ এবং তা থেকে প্রায় ২২ লাখ ৩২ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে লিচু উৎপাদন হচ্ছে ২ লাখ ৩২ হাজার টন। ৭১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি থেকে কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে ১৮ লাখ ৮৯ হাজার টন। অন্যদিকে ২০ হাজার ১২০ হেক্টর জমি থেকে আনারস উৎপাদন হচ্ছে ৪ লাখ ৯৭ হাজার টন। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২০০ গ্রাম করে ফল খাওয়া উচিত। এজন্য বেশি করে ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং বসতবাড়ির আশপাশে ও বাড়ির ছাদবাগানে ফলের চাষ করতে হবে। ফলের উৎপাদন, বিপণন ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ অত্যন্ত শ্রমঘন কাজ বিধায় এগুলো গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এ ছাড়া দানাদার ফসলের চেয়ে হেক্টরপ্রতি ফলের উৎপাদন এবং লাভ বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক একর জমিতে ধান চাষে যেখানে আয় হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, সেখানে কলা ও আম চাষে আয় হয় যথাক্রমে ৮০ হাজার ও ১ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০০২-২১ অর্থবছরে দেশ থেকে ফলমূল রপ্তানি হয়েছে ০.৫৮ মিলিয়ন ডলার। ফল উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য উত্তম কৃষিচর্চা মেনে উৎপাদন, ফল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, রপ্তানি উপযোগী জাতের ব্যবহার, আধুনিক প্যাকিং হাউজ নির্মাণ, এক্রিডিটেড ল্যাবব্যবস্থা স্থাপনসহ নানান কাজ চলমান রয়েছে। দেশে প্রতি বছর সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফল বিনষ্ট হচ্ছে। ফল ফসলকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াজাত সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। এসব বিষয়ে ফলচাষি, পরিবহন শ্রমিক, প্রক্রিয়াজাতকারী ও ভোক্তাসহ সবাইকেই আরও সচেতন হতে হবে। এরই মধ্যে আমাদের বিজ্ঞানীরা ৩০টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। দেশীয় ফলের সঙ্গে স্ট্রবেরি, প্যাশন ফল, ড্রাগন, এভোকাডো, সৌদি খেজুর প্রভৃতি বিদেশি ফলের চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের পাহাড়ি অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে কাজুবাদামের চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৯০ টন আম ও ৮ টন লিচু রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। দেশে বহু ধরনের ফলের চাষ হলেও সারা বছর সমভাবে ফল উৎপাদন হয় না। দেশে উৎপাদিত ফলের শতকরা ৫৪ ভাগ উৎপাদিত হয় মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এবং বাকি ৮ মাসে ৪৬ শতাংশ ফল উৎপাদিত হয়।

দেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সারা বছর ফলপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে নিম্ন লিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

এক. দেশের ৩ কোটি ২১ লাখ বসতবাড়ির আঙিনায় উন্নত জাতের বিশেষ করে বারোমাসি আম, কাঁঠাল, আমড়া, লেবু এবং কলা ও পেঁপে উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

দুই. এ ছাড়া যেসব জাতের আম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে পাওয়া যায় যেমন : গৌরমতি, বারিআম-৪ ও আশি^না জাতের আবাদ বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

তিন. শীতকালে বাংলাদেশে ফলের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ থাকে খুব কম। এ সময়ের চাহিদা পূরণে বলসুন্দরী কুল, বাউকুল ও আপেলকুল ও থাইপেয়ারা চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। চর এলাকার পতিত জমিতে কুলের বাগান সৃজনেও গুরুত্বারোপ করতে হবে।

চার. সারা দেশে ফল চাষ সম্প্রসারণে প্রতিটি উপজেলায় উদ্যানতত্ত্ব নার্সারি স্থাপন করে সুলভ মূল্যে ফলচাষিদের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত গুণগত মানের ফলের চারা বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।

পাঁচ. দেশের বেসরকারি নার্সারিগুলোকে নতুন উদ্ভাবিত জাতের ফলের প্রয়োজনীয়সংখ্যক মাতৃগাছ সরবরাহ এবং নার্সারি মালিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ছয়. প্রধান প্রধান ফলের মৌসুমের আগে ফলচাষিদের ফল উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

সাত. উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে দেশের বিভিন্ন ফল উৎপাদন এলাকায় প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে এবং বিদেশে ফল রপ্তানি বাড়াতে হবে।

আট. ফল বাগানি ও নার্সারি মালিকদের শতকরা ৪ ভাগ সরল সুদে কৃষিঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

নয়. প্রত্যেক উপজেলা ও ইউনিয়নপর্যায়ে গাছের চারা বিক্রির জন্য পৃথক বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে।

দশ. দেশের নগরের প্রতিটি বাসাবাড়ির ছাদে ফল বাগান গড়ে তোলার জন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে দায়িত্ব দিতে হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের ব্যবস্থাও করতে হবে।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন