সেতু কেবল একটি কাঠামোই নয়, দুই প্রান্তের জনজীবনকে যুক্ত করার মাধ্যম। মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় নির্মাণ শুরু হওয়া সেতু ধীরে ধীরে নগরায়ণ ও উন্নয়ন-সমৃদ্ধির নিয়ামকে পরিণত হয়েছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত
ইতিহাস
সেতু হলো নির্মিত সংযোগ কাঠামো। অধিকাংশ সময় দুই প্রান্তের দূরত্ব কমিয়ে চলাচল সহজ করে তোলে। সেতুর ধরন মূলত নকশা, নির্মাণশৈলী, নির্মাণস্থলের প্রাকৃতিক অবস্থান, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী ও বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সেতু নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীর প্রথমদিকের সেতুগুলো প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছিল। সে সময় খরস্রোত নদীর ওপর গাছের কোনো গুঁড়ি পড়ে বা কাছের উঁচু কোনো পাহাড় থেকে অনেক পাথরের খন্ড পড়ে প্রাকৃতিকভাবে সেতু তৈরি হয়েছিল। এভাবে প্রকৃতিই তখনকার মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে কোনো কাঠামো তৈরি করে সংযোগ স্থাপন করা হয়। শুরুতে মানুষ সাধারণ কাঠামোয় সেতু নির্মাণ শুরু করে। সে সময় গাছের গুঁড়ি বা কাঠ কেটে তক্তা বানিয়ে, পাথর দিয়ে বা ঘরের খড়িকাঠের খন্ড এক সঙ্গে জুড়ে কমজোরের সেতু তৈরি করত। কখনো কখনো এই উপকরণগুলো একসঙ্গে জুড়ে রাখার জন্য প্রাকৃতিকভাবে তৈরি আঁশ সুতা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সেতু খিলান বা তোরণ সেতু। গ্রিসের পেলোপনিসের আর্কাডিকো একটি খিলান সেতু, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ’ শতকে নির্মিত হয়।
প্রাচীন রোমানরা শ্রেষ্ঠ সেতু নির্মাতা জাতি হিসেবে পরিচিত। তারা শুরুতে তোরণ সেতু নির্মাণ করেছিল। নালা বা খালের ওপর নির্মাণ করা এই সেতুগুলো আজও টিকে আছে। এই সেতুগুলো নির্মাণ করার সময় পানি, চুন বালি ও আগ্নেয় শিলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের সিমেন্ট ব্যবহার করা হতো। তাদের সবচেয়ে সুন্দর সেতুগুলো কিছু গিরিখাত ও নদীর ওপর নির্মিত হয়েছিল। ওই নদী বা গিরিখাতের আশেপাশে কোনো পাথর বা দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল না। সে সময় সেতুর ভারী স্তম্ভগুলো কীভাবে সেখানে নিয়ে যওয়া হয়েছিল আজও বিস্ময় জাগায়। খ্রিস্টপূর্ব ৪শ’ থেকে ৩শ শতাব্দীতে ভারতীয়দের সেতু নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের প্রাচীন গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’-এ সেতু নির্মাণের বিষয় উল্লেখ আছে। তারা এই সেতু নির্মাণের সময় প্রলেপযুক্ত বাঁশ ও লোহার শেকল ব্যবহার করত।
সেতু নির্মাণে এর পরেই রয়েছে চীন। চীনের এ পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন পাথরের তৈরি সেতু হলো ঝাঁওঝো সেতু। সেতুটি সুই রাজবংশের সময় ৫৯৫ থেকে ৬০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছিল। চীনে এ ছাড়াও প্রায় ত্রিভুজ আকৃতির পৃথক পৃথক অংশজুড়ে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পাথরের তৈরি তোরণ সেতুও রয়েছে। এর পর আসে ফরাসি জাতির কথা। তারা ১২শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে এমন অনেক সেতু নির্মাণ করেছিল যেগুলোর ওপর বাড়ি ছিল। সে সময় প্রাচীরঘেরা শহরগুলোর অল্পসংখ্যক বাড়ি থাকায় তারা এমন উপায় বেছে নিয়েছিল। কেবল ফ্রান্সেরই এমন সেতু আছে ৩৫টি। ১৬শ’ শতাব্দীর ইনকা সভ্যতায় দড়ির তৈরি সেতুর প্রচলন ছিল। এগুলো ঝুলন্ত সেতু ছিল। এরপর ১৮শ শতকে হান্স উলরিচ ও জোহানেস গ্রুবেনম্যান সেতু নির্মাণের কৌশলে পরিবর্তন আনেন। সেই থেকে লোহার তৈরি সেতু নির্মাণ শুরু হয়। ১৭৭৯ সালে ইংল্যান্ডের কোলব্রুকডেলে প্রথম লোহার সেতু নির্মিত হয়েছিল। সেতুটির নির্মাণশৈলী আজও বিস্ময় জাগায়। কারণ নির্মাণের সময় ঢালাই লোহা ব্যবহার হয়েছিল। ১৯ শতকে শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে সেতু নির্মাণে পরিবর্তন আসে। এ সময় পেটা লোহা দিয়ে সেতু নির্মাণ শুরু হয়।
এরপরই সেতু নির্মাণে যুক্ত হয় অনেক বেশি স্থায়িত্বের ইস্পাতসামগ্রীর। লোহার স্থান দখল করা এই ধাতু দিয়েই আধুনিক দীর্ঘস্থায়ী বড় বড় সেতু নির্মাণ শুরু হয়। ইস্পাতের সেতু নির্মাণের পথিকৃৎ হলেন ফরাসি প্রকৌশলী আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেল। ২৭ বছর বয়সে ১৮৬০ সালে তিনি ইউরোপের প্রথম সেতু নির্মাণ করেন। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বন্দরনগরী বর্দোর গারন নদীর ওপরে ৫০৪ মিটার দীর্ঘ লোহার রেলিং দেওয়া সেতুর নাম ‘পন্ত দি বোর্দো’। এরপর ১৯২৭ সালে বিশ্বের প্রথম ঢালাই সড়ক সেতু নির্মাণ করেন স্টেফান ব্রাইলার। পোলিশ এই নির্মাণ প্রকৌশলকে ঢালাই সেতুর অগ্রদূত বলা হয়।
নির্মাণশৈলী
বিভিন্ন নকশা ও উপকরণ ব্যবহার করে সেতু নির্মাণ করা হয়। সেতুকে অনেক ভার বহন করতে হয়। এ কারণে স্প্যান অনেক শক্তিশালী করে তৈরি করতে হয়। নির্মাণ কৌশলের দুর্বলতা কাটাতে পরবর্তীকালে সেতুতে নানা ধাপের পরিবর্তন আসে। ১৯ শতকের শুরুতে সেতুর নকশায় নান্দনিকতা যুক্ত হয়েছিল। মজার বিষয় বিশ্বের সব বড় সেতু সে দেশের জনগণের অর্থেই নির্মিত হয়েছে। নির্মাণ কৌশলের ভিন্নতার কারণে সেতুকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। স্ট্যান্ডার্ড ওভারপাস সেতু ও অনন্য নকশার (নদী, খাদ বা মোহনার ওপরের) সেতু। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে চারটি উপকরণ ব্যবহার হয়ে থাকে। যথাকাঠ, পাথর, লোহা ও কংক্রিট। তবে আধুনিক সেতু নির্মাণে লোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ এই লোহা থেকেই আধুনিক শক্তিশালী সেতুর অন্যতম উপকরণ ইস্পাত তৈরি হয়। আধুনিক সেতু একচেটিয়াভাবে ইস্পাত দিয়ে লোহার রডের মধ্যে শক্তিশালী কংক্রিটের মসলা বসিয়ে নির্মাণ করা হয়ে থাকে।
নকশা
বিশ্বের প্রথম সেতু প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সময় নির্মাণ করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ বছর আগে সুমেরীয় জাতি কাঠের গুঁড়ি, পাথর ও ধুলা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ কাঠামোর সেতু নির্মাণ করেছিল। তবে এরও ২শ’ বছরে নির্মাণ কৌশল ও উপকরণের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেতুর নির্মাণ চলতে থাকে। এর মধ্যে শিল্প হিসেবে লোহার উৎপাদন শুরু হলে আধুনিক সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছিল। সে সময়েই প্রকৌশলীরা ঢালাই লোহা দিয়ে মজবুত সেতু নির্মাণের সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় প্রথমে পেটানো লোহা ও ইস্পাতের কাঠামোর সেতু ও সবশেষ যুক্ত হয় লোহার রডের মধ্যে মসলা বিছানো বাড়তি শক্তির কংক্রিটের সেতু। এই উপকরণগুলো শিল্প বিপ্লবের সময়ে কাঠ ও পাথর দিয়ে নির্মিত সেতুর নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। সেতু নির্মাণের এই বিপ্লবে শিল্পভিত্তিক শক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ শতকের শুরুর দিকে বিশে^র নেতৃত্বস্থানীয় শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো নির্মাণ হয়েছিল। এই শতকের শেষ দিক থেকে শুরু করে ২০ শতকের মধ্য পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেতু আবিষ্কারের ধারা অব্যাহত ছিল। ঠিক একই সময়েও জার্মানি ও জাপানেও সেতু নির্মাণ হয়েছিল। সুইজারল্যান্ডও সেতু নির্মাণে এগিয়ে ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ শতকের শুরুর দিকে চীন বিশে^র সবচেয়ে দীর্ঘতম রাস্তার ওপর দিয়ে বেশ কয়েকটি দ্রুতগামী রেলসেতু নির্মাণ করেছিল।
প্রাচীনকালের সেতু
কাঠ ও পাথর দিয়ে প্রাথমিক যুগের সেতু তৈরি শুরু হয়েছিল। পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাথর বা গাছের গুঁড়ি দিয়ে প্রবল স্রোতের ওপর এ সেতুগুলো নির্মিত হতো। এগুলোকে ‘বিম’ সেতু বলা হয়। এই সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় দাস, সৈনিক বা বাসিন্দারা পারিশ্রমিক পেত। সেতুর অবলম্বনগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দিতে তখন তারা বিভিন্ন ধরনের ঘাস ও আঙুরলতা দিয়ে তৈরি দড়ি ব্যবহার করত। সে সময়ে বড় ও সরু পাথরের একাধিক খন্ড দিয়ে ক্ল্যাপার সেতু নামে আরও একধরনের সেতু তৈরি হতো। এ ধরনের সেতু বেশি চীনে দেখা যায়। এরপর রোমান জাতি ‘আর্চ’ সেতু নির্মাণ করেছিল। সামরিক বাহিনীর প্রচারণায় সহায়তা করতে তারা আর্চ সেতু নির্মাণ শুরু করে। বৃত্তাকার খিলান আকৃতি ব্যবহার করার জন্য আর্চ সেতুগুলো বিখ্যাত ছিল। আর্চ সেতুগুলোর স্প্যান পাথরের বিমের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা ও কাঠের সেতুর চেয়ে বেশি স্থায়ী ছিল। বড় নদীর ওপরে এ সেতুগুলোর স্তম্ভ পাথর দিয়ে নির্মাণ করা কঠিন হওয়ায় সে সময় রোমানরা কফারড্যাম তৈরি করেছিল। এখনো পর্যন্ত টিকে থাকা বেশিরভাগ রোমান সেতু পাথর দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। ১৮শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে টাইবার নদীতে নির্মিত কফারড্যাম ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে রোমের সান্ট-অ্যাঞ্জেলো সেতুটি। রোমনারা বেশিরভাগই কাঠের তৈরি সেতু নির্মাণ করেছিল। তবে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীকালে পাথরের তৈরি যে সেতু নির্মাণ করা হয় তা খ্যাতি পেয়েছিল। স্পেনের আলকান্তারায় টাগুস নদীর ওপর রোমানদের নির্মিত আলকান্তারা সেতুটি প্রায় ২ হাজার বছর ধরে টিকে আছে।
এরপর শুরু হয় বড় খিলান ও আর্চ সেতুর নির্মাণ। সে সময় এশিয়ায় কাঠের বড় খিলানের (কান্টিলিভার) সেতু বেশি জনপ্রিয় ছিল। এ সেতুর সবার উপরের দিকে ইংরেজি ওয়াই আকৃতির বড় খিলানের পাটাতনগুলো লম্বা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে জোড়া থাকত। পাটাতনের নিচে গাছের গুঁড়িগুলোকে আড়াআড়িভাবে রাখা হতো। চীনের নদী উপত্যকার অঞ্চলগুলোতে নরম পলির ওপর অনেক সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো মজবুত না হওয়ায় পরে রাজমিস্ত্রি দিয়ে খিলান সেতু তৈরি শুরু করে। পাথরের পাতলা ও বাঁকা সø্যাব ব্যবহার করে সেতুগুলো তৈরি করা হতো। লি চুন চীনের দক্ষিণ হেবেই প্রদেশের ‘গ্রেট স্টোন ব্রিজ’ (একে ঝাওঝো সেতুও বলা হয়) নির্মাণ করেছিলেন। এই সেতুর ব্যবহার করা ধরনটি ইউরোপে ১৮ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের আগে খুব কমই দেখা যেত। এই ধরনটি ২০ শতকে রবার্ট মেলার্টের কংক্রিটের সেতুর নকশায় প্রভাব রেখেছে।
মধ্যযুগের সেতু
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই ইউরোপজুড়ে সেতু নির্মাণের গতি কমে আসে। যদিও সে সময় সুন্দর নকশার সেতু ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। মধ্যযুগীয় সেতুগুলো বিশেষভাবে ওগিভাল বা সূক্ষ্ম খিলানের জন্য উল্লেখযোগ্য ছিল। অনেক টাওয়ার ও প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত ওই সেতুগুলোর ওপর সে সময় চ্যাপেল ও দোকান নির্মিত হতো। মধ্যযুগের উদ্ভাবিত আরেক ধরনের সেতু হলো টানা সেতু। সে সময়ের বিখ্যাত সেতুটি ছিল ‘ওল্ড লন্ডন ব্রিজ’। ১২ শতকের শেষের দিকে কোলেচার্চের যাজক পিটারের নির্দেশে সেতুটির নির্মাণ শুরু হয়। ‘ওল্ড লন্ডন ব্রিজ’টি ৬শ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু নির্মাণ কৌশলের দুর্বলতার কারণে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছিল।
রেনেসাঁ ও পরবর্তী সময়কার সেতু
রেনেসাঁর সময় ইতালীয় স্থপতি আন্দ্রেয়া প্যালাদিও সেতুর ট্রাস ধরন অনুসরণ করে বেশ কয়েকটি কাঠের সেতুর নকশা করেছিলেন। ওই সেতুগুলো সে সময়ের দীর্ঘতম সেতু ছিল। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাজমিস্ত্রিদের দ্বারা (ম্যাসনারি) সেতু নির্মাণ শীর্ষে পৌঁছেছিল। জিন-রডলফ পেরোনেট সরু স্তম্ভের ওপর খুব সমতল খিলান দেওয়া তার সময়ের সেরা কিছু সেতু নির্মাণ করেছিলেন। ১৮ শতকে বিশেষ করে ট্রাসের ব্যবহার ও দৈর্ঘ্যে বড় স্প্যান দিয়ে কাঠের সেতু নির্মাণ নতুন মাত্রা পেয়েছিল। এদিকে ১৭৭৯-১৯২০ সাল পর্যন্ত লোহা ও ইস্পাতের সেতু নির্মাণ চলে। শিল্প বিপ্লবের ফলে কাঠ ও রাজমিস্ত্রিদের হাতে তৈরি সেতুর জায়গা দখল করে নেয় লোহা। ইংল্যান্ডের কোলব্রুকডেলের কাছে সেভারন নদীর ওপর প্রথম লোহার তৈরি সেতু নির্মিত হয়েছিল। ১৭৭৯ সালে টমাস প্রিচার্ডের করা নকশায় আব্রাহাম ডার্বি সেতুটি নির্মাণ করেন। ১৮২৬ সালে স্কটিশ প্রকৌশলী টমাস টেলফোর্ড উত্তর-পশ্চিম ওয়েলসের মেনাই প্রণালির ওপর মেনাই সেতু নির্মাণ করেছিলেন। ১৯ শতকে পরিবহনের একটি মাধ্যম হিসাবে ভ্রমণসহায়ক রেলসেতুর উত্থান ঘটেছিল। প্রথমদিকের রেলসেতুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল রবার্ট স্টিফেনসনের ব্রিটানিয়া সেতু। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ শুরু হয়। ১৮৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলী জন রোবলিং ওহিও নদীর ওপর সিনসিনাটি সেতু (বর্তমানে জন এ. রোবলিং সেতু বলা হয়) নির্মাণ করেছিলেন। ৩১৭ মিটারের লোহার তারের তৈরি ওই সেতুটি ছিল সে সময়ের বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু।
১৯ শতকের শেষ দিকে কংক্রিটের সেতুর নির্মাণ শুরু হয়েছিল। এই শতকে কম খরচের লোহা ও ইস্পাত উৎপাদন শুরু হয়েছিল। এরপর ১৮২৪ সালে পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের উদ্ভাবনে ফলে শক্তিশালী কংক্রিটের বিকাশ ঘটে। এই শতকের শেষ দিক থেকে পাথরের বিকল্প হিসেবে কংক্রিটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। ১৯০৪ সালে এমিল মোর্শের নকশা করা জার্মানির গ্রুনওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী কংক্রিট স্প্যানের নির্মিত ‘ইসার নদীর সেতুটি’ বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হয়ে ওঠে।
ইস্পাতে নির্মিত জর্জ ওয়াশিংটন সেতুর সাফল্য ১৯৩০-এর দশকে ঝুলন্ত সেতুর নকশায় দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে সেতুর গার্ডারের গভীরতা ও স্প্যানের ছোট অনুপাতের কারণে এর নকশায় যে বিপ্লব ঘটেছিল তা বেশ কয়েকটি বড় সেতু নির্মাণে উৎসাহিত করে। এর পরই কেবল চালিত সেতুর প্রচলন দেখা যায়। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে কেবল বা তারে চালিত সেতুর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ১৯৬৬ সালে নির্মিত জার্মানির বনের বন-নর্ড ব্রিজ প্রথম কেবল চালিত সেতু ছিল।
এশিয়ার দীর্ঘ-স্প্যান সেতু ও ভায়াডাক্ট
১৯৭০-এর দশকে এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে জাপানিরা সেতুর বিভিন্ন ধরন ব্যবহার করে ইস্পাত দিয়ে দীর্ঘ-স্প্যান সেতু নির্মাণ শুরু করেছিল। এরপর অন্য এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে চীন রেলব্যবস্থার অংশ হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘতম ভায়াডাক্ট বা রেলসেতু নির্মাণ করে। তাদের নির্মিত সেতুর মধ্যে অনেকগুলোই বিশ্বের দীর্ঘতম স্প্যান ও দীর্ঘতম সেতু হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
বিস্ময় জাগানো সেতু
নির্মাণের শুরু থেকে প্রযুক্তিগত বিস্ময় ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বেশকিছু সেতু বিখ্যাত হয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীন ধরনের সেতু যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে আধুনিক সেতুও। প্রাচীন সেতুর মধ্যে রয়েছে আরকাডিকো সেতু, সেভারান সেতু, আঞ্জি সেতু, ব্যান্ড-ই কায়সার, তার স্টেপস, অ্যাকুয়াডাক্ট অব সেগোভিয়ার, পন্ত জুলিয়েন, ইউরিমেডন সেতু, গুয়াংজি সেতু এবং আরও অনেক। আধুনিক যুগের বিস্ময় হয়ে ওঠা সেতুর মধ্যে রয়েছে: গোল্ডেন গেট সেতু, ব্রুকলিন সেতু, পন্তে ভ্যাচিও, টাওয়ার সেতু আকাশি-কাইকিও সেতু, সিডনি হারবার সেতু, থ্রু আর্চ সেতু , হ্যাংঝু বে সেতু, রয়্যাল গর্জ সেতু ও পার্ক এবং মিলেনিয়াম সেতু। এ ছাড়াও বিশ্বের দীর্ঘতম ১০টি সেতুর কথাও উল্লেখ করা যায়। দৈর্ঘ্যরে বিবেচনায় দীর্ঘতম ১০ সেতুর ৭টিরই অবস্থান চীনে। এগুলো হলো চীনের ‘ডানইয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ’, তাইওয়ানের ‘চাংহুয়া-কোয়াশিউং’ রেলসেতু, চীনের ‘ক্যান্ডি গ্র্যান্ড ব্রিজ’, চীনের ‘তাইয়ানজিন গ্র্যান্ড’ সেতু, চীনের ‘উইনান উইহি গ্র্যান্ড’ সেতু, চীনের ‘হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও’ সেতু, থাইল্যান্ডের ‘ব্যাং না এক্সপ্রেসওয়ে’ সেতু, চীনের ‘বেইজিং গ্র্যান্ড সেতু’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘লেক পন্টচারট্রেইন কজওয়ে’ সেতু এবং চীনের ‘লাইন-১ উহান মেট্রো’ সেতু অন্যতম।