টেনিস অভিজাত শ্রেণির খেলা। আমজনতার এটা খেলার সামর্থ্য বলেন কিংবা অধিকার, কোনোটাই নেই। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থরা শখের বসে র্যাকেট নিয়ে কোর্টে নামবেন। খানিকটা ঘাম ঝরাবেন। এটাই চল। তাই দেশের নানা প্রান্তের টেনিস কোর্টগুলোর বেশিরভাগ প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ধারণাটাকে ভাঙতে চান বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ হায়দার। কেবল ভ্রান্ত ধারণা ভাঙা নয়, যোগ্য নেতৃত্ব সংকটে ফেডারেশনে নেমে আসা স্থবিরতা তিনি কাটাতে চান আন্তরিক প্রচেষ্টায়। সাবেক এই টেনিস খেলোয়াড় আগের অ্যাডহক কমিটিতে থেকেও ভালো কাজের কিছু নজির স্থাপন করেছিলেন। এবার নির্বাহী দায়িত্ব নিয়ে পাল্টে দিতে চান খেলাটির খোলনলচে।
এদেশে টেনিস খেলাটার অবস্থা অনেকটা ‘সারা অঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা?’ প্রবাদের মতো। ৩২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ায় কিছুদিন আগে রমনা জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। দু’তিন বছর আগে স্থাপিত আটটি কোর্টে ফ্লাডলাইডে বিদ্যুৎ সংযোগ না দেওয়ায় রাতে খেলার সুযোগ নেই। বছরের পর বছর গ্যালারির নিচের দোকানগুলো অবৈধভাবে দখল করে আছেন অনেকে। ভাড়া বকেয়া ৪২ লাখ টাকা। এর বাইরে ফেডারেশনে আন্তঃকোন্দলও লেগেই আছে। সঙ্গে টেনিস খেলা নিয়ে ভুল ধারণা তো আছেই। এসব প্রতীকূলতাকে দূর করে খেলাটাকে সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়। তবে হায়দার জানিয়েছেন সেই চ্যালেঞ্জটা নিতে প্রস্তুত তিনি, ‘বড়লোকের খেলা। সরঞ্জামাদির অনেক দাম। এটা সমাজের উঁচু স্তরের কিছু মানুষ খেলে। এমন একটা ভুল ধারণা নিয়ে আমরা বসে আছি। এটাকে এখন ভাঙতে হবে। চোখ দিতে হবে তৃণমূলে। খেলাটাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ফেডারেশনের। সেই কাজটা করতে আমরা অনেক সরঞ্জামাদি নিয়ে প্রস্তুত আছি। রমনায় যে একটা টেনিস কমপ্লেক্স আছে, কার্যক্রম না থাকায় সেটাই তো অনেকের জানা নেই। অথচ এই স্থাপনা দিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব। তাছাড়া মাননীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন অনেকগুলো কোর্ট স্থাপন করেছেন। অতীতে আমি নিজেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খেলার আয়োজন করে দেখেছি শিশু-কিশোরদের এ নিয়ে কত উৎসাহ। তাদের এই উৎসাহ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি বিশ্বাস করি, আন্তরিকতা থাকলে টেনিসের স্বর্ণালি অতীত ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’ খেলোয়াড়ি জীবনে নানা বয়সভিত্তিক দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন হায়দার। আঙিনায় ডেভিস কাপের মতো আসর হতে দেখেছেন। সিঙ্গাপুর, পাকিস্তানের মতো দলকে হারানোর অভিজ্ঞতাও আছে। তাই খেলাটার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই হায়দারের, ‘পাশের দেশ ভারত যদি সানিয়া মির্জার মতো তারকার জন্ম দিতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? একজন সানিয়া হয়তো ১০০ জনের মধ্য থেকে পাব না। তবে দশ হাজার জনের মধ্য থেকে একজন সানিয়া মির্জা গড়ে তোলা সম্ভব।’ দায়িত্ব নিয়ে কমপ্লেক্সের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে খেলোয়াড়দের জন্য ডরমেটরি নির্মাণের কথা বলেছেন হায়দার, ‘বছরের পর বছর গ্যালারির নিচের অংশটা দখল করে আছে কিছু মানুষ। তাদের কাছে ফেডারেশন ভাড়া পাবে ৪২ লাখ টাকা। সেটাও দিচ্ছে না, আবার নোটিস দিলেও দোকানগুলো ছাড়ছে না। তাই প্রজ্ঞাপন হয়ে গেলে দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রীড়া পরিষদ ও প্রশাসনের সহায়তায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সেখানে খেলোয়াড়দের আবাসনের ব্যবস্থা করব।’ বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করে হায়দার বলেন, ‘অবৈধ দখলদারদের পেছনে মাসে ৫০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বাবদ সাবসিডি দিতে হয় ফেডারেশনকে। তারা ঠিকমতো ভাড়া দিলে বিল এতটা বকেয়া পড়ত না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃসংযোগের ব্যবস্থা করব না যতক্ষণ পর্যন্ত অবৈধদের সরাতে না পারি। প্রয়োজনে নিজস্ব ব্যবস্থায় জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হবে।’
কোর্টে স্থাপিত ফ্লাডলাইটগুলো দায়িত্ব নিয়ে জ্বালানোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে জোর গলায় বলেছেন, আন্তরিকতা দিয়েই ফেডারেশনের স্পন্সর সংকট কাটিয়ে খেলাটাকে এগিয়ে নেওয়ার কথা।