বেনাপোল। যশোরের এই এলাকাটি অনেক কারণেই সারা দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত স্থলবন্দর সেখানে। আর সীমান্তবর্তী অঞ্চল বলেই মাদক, চোরাকারবারির অভয়ারণ্য বেনাপোল। সেই এলাকার একটি গ্রাম ভবেরবেড়। এই গ্রামটি মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের কেন্দ্রস্থলে রূপ নিয়েছে নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে। অথচ এই গ্রামেই গড়ে উঠেছে আলহাজ নুর ইসলাম ফুটবল একাডেমি। বেনাপোলের কিশোর-যুবাদের ভয়াল মাদক ও চোরাকারবারি থেকে দূরে রাখতে এই একাডেমি গড়ে তোলেন বেনাপোলের পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন। যে গ্রামের মানুষের ভাবনা থেকে খেলাধুলা মুছে গিয়েছিল, সেই গ্রামেরই ফুটবল একাডেমির ছেলেরা আজ দেশসেরা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে। জাতীয় স্কুল ফুটবলে প্রতিযোগিতার ফাইনালে বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিপক্ষ নীলফামারীর ছমিরউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয় দলের সব খেলোয়াড়ই আলহাজ নুর ইসলাম ফুটবল একাডেমির। মাদকের চারণক্ষেত্র থেকে এই কিশোররা ফুটবলের আলো ছড়াতে চান, নিজ গ্রামের গল্পটা লিখতে চান নতুন করে। একাডেমির রূপকার লিটন নেপথ্যের গল্পটা খুলে বললেন দেশ রূপান্তরের কাছে ‘নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে বেনাপোলের মানুষের মন থেকে খেলাধুলার বোধটা মুছে যায়। বেশিরভাগ মানুষ বন্দরকেন্দ্রিক নানা কাজকর্মের পাশাপাশি অবৈধ মাদক ও চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়েন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর পণ করি মাদক, চোরাকারবারি থেকে বেনাপোলের শিশু, কিশোর, যুবসমাজকে দূরে রাখতে কিছু একটা করব।’ সেই চিন্তা থেকেই লিটন প্রয়াত বাবার নামে গড়ে তোলেন স্পোর্টস একাডেমি। এই একাডেমি বেনাপোলে নিয়মিত ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করে দীর্ঘদন ধরে ‘মাদক একেবারেই নয়, খেলাধুলায় মিলবে জয়’ সেøাগানকে সামনে রেখে নয় বছর আগে আলহাজ নুর ইসলাম একাডেমি করি। বেনাপোলের মানুষকে মাদক ও চোরাকারবারি থেকে মুক্তি দিতে প্রাণের টানেই এটা করেছি। এতে কতটা সমাজ বদলাবে কিংবা এমন কিছু করে নাম কামাব সেই চিন্তা থেকে করিনি। একাডেমির মাধ্যমে খেলাধুলায় যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে যদি কিছু ছেলেপেলে সুস্থভাবে গড়ে ওঠে তাতেই শান্তি পাব।’
স্পোর্টস একাডেমি আগে হলেও জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সাব্বির আহমেদ পলাশকে পাশে পেয়ে ২০১৬ সালে লিটন শুরু করেন ফুটবল একাডেমির যাত্রা। একাডেমি ও বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়ের কোচ পলাশ সেই স্মৃতি রোমন্থন করেছেন, ‘প্রথমে মাত্র ১০ জন ছাত্র নিয়ে শুরু করেছিলাম। ধীরে ধীরে ফুটবল একাডেমিতে এখন ২১৫ জন ছাত্র। এই একাডেমি ২০১৭ সালে পাইওনিয়র লিগে অংশ নেয়। স্থানীয় অনেক টুর্নামেন্টে সাফল্য পাওয়ায় এখন পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও আগ্রহীদের ফোন পাই।’ খেলোয়াড়ি জীবনে আবাহনী, মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবে খেলা পলাশ বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয় দলের অধিনায়ক সাইদুর রহমান রাহুলের একটা গল্প বলে বোঝাতে চাইলেন ভবেরবেড় গ্রামের চালচিত্র ‘রাহুলের একটা সময় পড়ালেখায় মন ছিল না। তার সব আগ্রহ ছিল খেলাধুলায়। ফুটবল, ক্রিকেট, ক্যারমসহ সব খেলাই সে ভালো খেলত। একাডেমি হওয়ার পর ও আমার এখানে অনুশীলন শুরু করে। পড়াশোনা না করে খেলার মাঠে পড়ে থাকায় ওর পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে একবার আমার ওপর চড়াও হয়। বলে, আমি নাকি রাহুলের মাথায় খেলাধুলার পোকা ঢুকিয়ে দিয়েছি। তারা আমার নামে স্থানীয় থানায় মামলাও করতে গিয়েছিল। পরে ওর পরিবারকে বলি রাহুলকে নিয়ে যেতে। তবে ওর মধ্যে সাব্বির (সাবেক তারকা রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির) ভাইয়ের অনেকগুলো গুণ দেখতে পেয়েছিলাম বলে হাল ছাড়িনি। চেষ্টা চালিয়ে গেছি। এক সময় ওকে বোঝাতে সক্ষম হই, ভালো খেলোয়াড় হতে হলে পড়ালেখাও করতে হবে। তখন আমি ওকে একাডেমিতে নিয়ে আসি। বেনাপোল উচ্চ বিদ্যালয়েও ভর্তি করাই। এখন এই ছেলের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পাই।’ তিনি যোগ করেন ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই ছেলেরা খেলাধুলায় আসায় অন্তত অবৈধ ব্যবসা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে। তাছাড়া এর মধ্যেই আমাদের দলের সর্বোচ্চ ১৩ জন ফুটবলারকে বাফুফে বাছাই করেছে। বেশ কজন ফুটবলারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্লাব আলোচনা করছে। ইতিমধ্যে স্টপারব্যাক জাহিদ হোসেনকে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব সাইন করিয়েছে। আরও দুজনকে নিয়েছে বিসিএলের দুটি ক্লাব। এই শিরোপাটা জিততে পারলে বেনাপোলের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের নিয়ে উৎসব করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমিও বিশ্বাস করি এই সাফল্য সে এলাকার মানুষকে খেলাধুলার প্রতি আবারও আগ্রহী করে তুলবে।’
দশম শ্রেণির ছাত্র রাহুলও একই বিশ্বাস নিয়ে আজ শিরোপায় চোখ রেখে মাঠে নামার কথা বলেছেন, ‘আমাদের দলের গল্পটা অন্য সবার মতো নয়। যেখান থেকে আমরা উঠে এসে ফুটবল খেলছি, সেটা বড় এক চ্যালেঞ্জ। আমরা অন্তত এটা বুঝতে পেরেছি খেলাধুলা কেবল মুক্তি দিবে না, নতুন দরজাও উন্মুক্ত করে দিবে আমাদের সামনে। এর মধ্যেই দলের অনেকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বাস করি ফুটবলের মধ্য দিয়ে আমাদের গ্রামকে সারা দেশের মানুষ অন্য পরিচয়ে চিনবে।’
রাহুল, জাহিদ, বাবুদের সেই আশাটা যাতে পূরণ হয়।