তরুণ মজুমদার : জীবনঘনিষ্ঠ এক নির্মাতা

ভারতের বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’-এর শেষ কিংবদন্তি পরিচালকদের অন্যতম তরুণ মজুমদার। প্রবীণ এই নির্মাতা চলচ্চিত্রশিল্পকে পণ্যে রূপ না দিয়ে জীবনের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন। তার প্রয়াণে বাংলার সাংস্কৃতিক ও বিনোদন জগতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

নক্ষত্রের পতন

ভারতীয় কিংবদন্তি বাঙালি চলচ্চিত্রকার ও লেখক তরুণ মজুমদার। সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনের এই গল্পকার একাধিক কালজয়ী সামাজিক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ৪ জুলাই বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের সম্পর্কের ইতি ঘটে। সংস্কৃতি জগতের এই অমিতাভ নক্ষত্রের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ তার অগণিত দর্শক। বিরহে কাতর হয় চলচ্চিত্র জগৎও।

বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে গল্প বলার সরল ও ছন্দময় শৈলীর জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। সমাজের সাধারণ ও ভালো-মন্দ মানুষের বৈশিষ্ট্যকে চলচ্চিত্রের পর্দায় অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলতেন। বিশেষ করে তার চলচ্চিত্রে গল্পের আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে রবীন্দ্রসংগীতের গভীর উপলব্ধির চিত্রায়ণ অনন্য বৈশিষ্ট্য পায়। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্তও চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তা করে গেছেন। ৮৮ বছর বয়সে তার শেষ দুটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ওই দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি ছিল মানবিক আবেদনধর্মী তথ্যচিত্র ‘অধিকার’। আর অন্যটি রোমান্টিক নাটক ‘ভালোবাসার বাড়ি’। তবে এই জনপ্রিয় পরিচালকের শেষ দুটি সৃষ্টি বরাবরের মতো দর্শকদের ভালোবাসা  অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। যা হয়তো এই সফল নির্মাতাকে মর্মাহতও করেছিল। তবে তরুণ মজুমদারের এই চিরতরের বিচ্ছেদ হয়তো তার অনুরাগীদের হৃদয়কে এবার নাড়া দেবে।

প্রচারক থেকে পরিচালক

১৯৩১ সালে ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়া জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের) এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তরুণ মজুমদার। তার বাবা বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মা ছিলেন গৃহিণী। তার ডাক নাম ছিল তনু। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের তনু নামের এই ছেলেটিই যে একদিন ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের নামডাকওয়ালা পরিচালক হবেন, তা হয়তো কেউ ভাবতে পারেননি! ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্র প্রচারণার কাজ শুরু করেন। সে সময়েই  যুবক তরুণ মজুমদার দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলে ‘যাত্রিক’ নামের সংস্থা গড়ে তোলেন। শুরু হয় ‘যাত্রিক’-এর ত্রয়ী পরিচালকের পথ চলা। যাত্রিকের প্রথম চলচ্চিত্র ‘চাওয়া পাওয়া’ (ইচ্ছা এবং পূর্ণতা) নির্মাণের মধ্য দিয়েই পরিচালক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সে সময়ের জনপ্রিয় জুটি উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘চাওয়া পাওয়া’ দর্শক জনপ্রিয়তা পায়। প্রথম চলচ্চিত্রেই সফলতা দিয়ে পরিচালক তরুণ মজুমদারের যাত্রা শুরু।

তরুণ মজুমদারের ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে মুসলিম অধ্যুষিত বগুড়ার এক অসাম্প্রদায়িক ছোট শহরে। যা পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিগত ও সৃষ্টিশীল জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছিল। বগুড়ার স্কুলজীবনে সাদা পাঞ্জাবি-ধুতি পরা অঙ্কের শিক্ষক জসীম উদ্দিন তার আদর্শ হয়ে ওঠেন। আর মায়ের অনুপ্রেরণায় সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক বনে যান তিনি। সে সময় ওই শহরের ‘ভারতী লাইব্রেরি’ এবং ‘উত্তরা’ ও ‘মেরিনা’ সিনেমা হল তার শিল্পীসত্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই লাইব্রেরিতেই তিনি রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ ও তারাশঙ্করের মতো লেখকদের সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সে সময়ের সাহিত্যচর্চা ও সিনেমা হল দুটিতে দেখা সিনেমাই তার চলচ্চিত্র নির্মাণের সুপ্ত ইচ্ছাকে নেশায় পরিণত করেছিল।

পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ মজুমদার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিমল করের কালজয়ী সাহিত্যকে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ২০১৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমাদের গল্প সব সময়ই পড়তে হয়। ছবি করব বলেই যে গল্প পড়তে হবে তা নয়। গল্প পড়ার একটা নেশাও আছে। নেশাটা অনেক আগে থেকেই ছিল। পড়তে পড়তে কোনো একটা গল্পে মনে হয় এটাতে ছবির প্রচুর সম্ভাবনা আছে। এমনও হয়, একটা আইডিয়া মাথায় এলো, কিছু টুকরো টুকরো ছবি চোখের সামনে ঘুরতে শুরু করল কিন্তু সেটা ভালোভাবে গাঁথা যাচ্ছে না। এক বছর দু বছর তিন বছর একটা স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টা করছি কিন্তু হচ্ছে না। তারপর একদিন হঠাৎ করেই হয়ে গেল। ফুলেশ্বরী ছবিটা যেভাবে হলো। তিন বছর সময় লেগেছিল। আবার কোনো কোনো স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়তো দেড় মাস দুমাসেই হয়ে যায়।’

সংগ্রাম

ছেলেবেলায় তরুণ মজুমদারের পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যরাও (কাকা) স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। এ-কারণেই তখন বেশির ভাগ সময়ই বাবা ও কাকাদের তিনি কারাবন্দি থাকতে দেখেছেন। এরপর ৪৭-এর দেশভাগের মধ্য দিয়ে ভারত স্বাধীন হলো।  কিন্তু এক পর্যায়ে তার পরিবারকে বাধ্য হয়েই বগুড়া ছেড়ে ভারতে চলে যেতে  হয়েছিল।  সে সময় উত্তর কলকাতার এক ভাড়াবাড়িতে তার পরিবারের এক নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। বগুড়া থেকেই তরুণ মজুমদার ম্যাট্রিকুলেশনে (বর্তমানে মাধ্যমিক) সপ্তম স্থান অধিকার করেন। তিনি কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হন। এ কলেজে থাকা অবস্থায়ই তিনি মার্কসবাদী বামপন্থি আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। যে আদর্শ থেকে মৃত্যুও তাকে আলাদা করতে পারেনি।

মৃদুভাষী ও বিচক্ষণ তরুণ মজুমদার ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ পরিচালক  হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যে সময়ে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহা ও অজয় করের মতো বাঘা পরিচালকরা বাংলা চলচ্চিত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, সে সময়েই তরুণ মজুমদার একের পর এক জনপ্রিয় ও সফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে এই অমর কথাকারদের মধ্যে কেবল নিজের অবস্থানই তৈরি করেননি, বাঙালি দর্শকের হৃদয়ও জয় করেন। তপন সিনহার মতো তরুণ মজুমদারও ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে সফল নির্মাতাদের একজন ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার তৈরি মোট ৩৯টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৯০ শতাংশই  (তথ্যচিত্র  ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত নয়) বক্স অফিসে বড় ধরনের সাফলতা পেয়েছিল। তবে ছয় দশকের দীর্ঘ এই পথে হাঁটতে গিয়ে নানা বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। প্রথম বাধাই আসে পরিবার থেকে। এ প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদারের জ্যাঠাত বোন মালবাজারের বাসিন্দা বৈশালী জানান, তাদের পরিবারের পদবি খাসনবিশ। মজুমদার তাদের পাওয়া পদবি। বৈশালীর বড় কাকা (জ্যাঠামশায়) বীরেন্দ্রনাথ খাসনবিশ (তরুণ মজুমদারের বাবা) তার চলচ্চিত্র জগতে যাওয়ায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি প্রথম দিকে ছেলে তরুণের কাজও মেনে নিতে পারেননি। এ কারণেই চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজ করার সময় থেকে তার দাদা তরুণ ‘মজুমদার’ পদবি ব্যবহার করতে শুরু করেন।

রুপালি জগতের সঙ্গে সখ্য

রসায়নের ছাত্র হলেও চলচ্চিত্র নির্মাণের তীব্র আকর্ষণ তাকে এ জগতে টেনে আনে। তবে সে সময়ের রক্ষণশীল সমাজে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকাকে খুব ভালো চোখে দেখা হতো না। কিন্তু তার চলচ্চিত্র সাংবাদিক মামা এই শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তাকে পার্ক সার্কাসের রূপশ্রী স্টুডিওতে নিয়ে যান। তবে সেখানে অল্প দিন কাজ শেষ করে জনপ্রিয় প্রচারক বাগীশ্বর ঝা’র সহকারী হিসেবে কাজ শুরু তার। এরপর কাননদেবীর প্রযোজনা সংস্থায় শিক্ষানবিশ পদে চাকরিসূত্রে  দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ মজুমদারের।

সেই থেকেই রুপালি পর্দার সঙ্গে সখ্য তরুণ মজুমদারের। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ‘যাত্রিক’-এর সঙ্গেই চলচ্চিত্র পরিচালনা করে গেছেন তিনি। ১৯৬২ সালে যাত্রিকের পরিচালনাতে দিলীপ মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘কাঁচের স্বর্গ’ মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য  প্রথমবারের মতো জাতীয় পুরস্কার পান তরুণ মজুমদার। ১৯৬৩ সালে যাত্রিক-এর শেষ চলচ্চিত্র ছিল ‘পলাতক’। এরপর যাত্রিক-এর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে পরিচালক ও প্রযোজক তরুণ মজুমদার যুগের শুরু। সেই সময়ে উত্তম-সুচিত্রার  জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। এরই মধ্যে স্বতন্ত্রধারার তরুণ মজুমদার দৃপ্ত পায়ে নির্মাণ করে গেছেন একের পর এক শিল্পসম্মত, মননশীল, ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। ছয় দশকের পেশাজীবনে তার সেলুলয়েডে গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের নয়তো মধ্যবিত্তের গল্পে পাওয়া না পাওয়া,  প্রেম-ভালোবাসা, পরিবার-সম্পর্ক ও জীবন উপজীব্য হয়ে উঠেছে। সে সময়ের দিকেই ‘একটুকু বাসা’, ‘আলোর পিপাসা’, ‘বালিকা বধূ’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘পলাতক’, ‘ফুলেশ্বরী’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে অমরতা পেয়েছেন তরুণ মজুমদার।

১৯৭৪ সালে তরুণ মজুমদার বিখ্যাত বাঙালি অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়কে প্রধান চরিত্রে রেখে ফুলেশ্বরী পরিচালনা করেন। গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল চরিত্রে মিষ্টি হাসির সন্ধ্যাকে মানাতোও বেশ। তাই তার পরবর্তী চারটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সন্ধ্যা রায়। এগুলো হলো শহর থেকে দূরে (১৯৮১), মেঘমুক্তি (১৯৮২), খেলার পুতুল (১৯৮৩) ও অমর গীতি (১৯৮৪)। শেষ দুটি চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সফলতা না পাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এই পরিচালক-নায়িকা জুটি। এভাবেই একাধিক চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করা পরিচালক-নায়িকার প্রেম চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে তরুণ মজুমদার তার সহকর্মী ও অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় সাতপাকে বাঁধা পড়েন। তবে তাদের সুখের সংসারও একসময় সেলুলয়েডের কাহিনীর মতোই বিচ্ছেদে রূপ নেয়। এমন গুঞ্জন রয়েছে, সে সময় স্ত্রী বিচ্ছেদে অভিমানী হয়ে পড়েছিলেন তুখোড় পরিচালক তরুণ মজুমদার। ফলে ধীরে ধীরে সংখ্যা কমে আসে তার চলচ্চিত্রের। সে সময় নতুন গল্পের জোয়ার ভাসা টলিউডের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না একাধিক জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই পরিচালক। ১৯৯৮ সালে তরুণ মজুমদার তার শেষ চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসার বাড়ি’  পরিচালনা করেন। এর পর থেকেই নিজেকে চলচ্চিত্র থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

সম্মাননা

তিনি কেবল টলিউডের বাংলা চলচ্চিত্রই পরিচালনা করেননি, বলিউডেও দুটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে একটি ‘রাহগির’ (১৯৬৯) আর অপরটি ‘বালিকা বধূ’ (১৯৭৬)। তার পরিচালিত প্রথম জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘কাঁচের স্বর্গ’ (১৯৬২)। তার হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণযুগের একাধিক গুণী ও জনপ্রিয় শিল্পী তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে সন্ধ্যা রায়, মাধবী চক্রবর্তী, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী প্রমুখ রয়েছেন। তরুণ মজুমদারের হাতেখড়ি পেয়ে বিনোদন জগতে বিখ্যাত হয়ে ওঠা এ প্রজন্মের শিল্পীরা হলেন তাপস পাল, দেবশ্রী রায়,  প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা। প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় পরিচালক তরুণ মজুমদার মোট চারটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। আরও পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাতটি বিএফজেএ ও পাঁচটি ফিল্মফেয়ার ও একটি আনন্দলোক পুরস্কার। ১৯৯০ সালে তিনি ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পান।

লেখক তরুণ মজুমদার ৯০০ পৃষ্ঠার দুই খন্ডের বই ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ লিখেছেন। বইয়ের প্রথমে লেখক তরুণ মজুমদার তার অনুভূতির কথা জানিয়েছেন এভাবে ‘আমার এই ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবনের সত্যিকারের সঞ্চয় বলতে এই সামান্য অভিজ্ঞতাগুলো ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই। এর কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়। কিছু কিছু হয়তো কৃষ্ণপক্ষের আকাশপটে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, আবার এমনও আছে, অগণিত, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ দূরবর্তী আবছা ছায়াপথে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি কিছুই।’

সেই ৬০-এর দশকে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ বাণিজ্যিক পথে হাঁটতে শুরু করে।   সে সময় থেকে শহুরে উচ্চমধ্যবিত্ত ও তথাকথিত প্রগতিশীল চলচ্চিত্র জগৎ হলিউড ও ইউরোপীয় প্রভাবে গা ভাসায়। এমন নবজাগরণে স্বাধীনতা-সংগ্রামী বাবার মতাদর্শ ও কমিউনিস্ট পার্টির পূরণ চাঁদ জোশী বা বন্ধু সুনীল মৈত্রের ভাবনায় উজ্জীবিত হন তরুণ মজুমদার। সে সময় থেকে তার জীবদ্দশায় খাঁটি বাঙালির আত্মাকে বাঁচানোর চেষ্টায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন তিনি। চলচ্চিত্রের মূল্যবোধের অবক্ষয় তাকে ভারাক্রান্ত করলেও ‘সৃষ্টিশীল মানুষের’ প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন অটল। নিভৃতচারী ও স্বল্পভাষী এই প্রবাদপুরুষ তার অনন্য সব সৃষ্টির মধ্য দিয়েই যেন তার না বলা কথাগুলো বলে গেলেন সবাইকে।

শেষ বিদায়

৪ জুলাই প্রয়াত হন পরিচালক তরুণ মজুমদার। তার প্রয়াণের চার দিন পর ১৪ জুলাই তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। নিঃসন্তান তরুণ মজুমদারের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, দক্ষিণ কলকাতার কালীমন্দিরে গিয়ে পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন তার মানসকন্যা অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়।  সারা জীবন অনাড়ম্বর জীবন কাটানো বাম ঘরানার এই বুদ্ধিজীবীর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তার দেহ সৎকার না করে গবেষণার জন্য দান করা হয়। একজন শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা কতখানি তা যেন নিজের দেহদানের মধ্য দিয়ে জানিয়ে গেলেন। এর আগে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রিয় এনটি-ওয়ান (ন্যাশনাল থিয়েটার-ওয়ান) স্টুডিওতে। সেখান থেকে দেহদানের জন্য আবারও এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তরুণ মজুমদারকে। সে সময় হাসপাতালের মর্গেই দেহ গ্রহণ করেন চিকিৎসকরা। পরে তার  চোখও দান করা হয়েছিল। সে সময় মার্কসের আদর্শের একনিষ্ঠ এই অনুরাগীরকে শেষ যাত্রায় কাস্তে-হাতুড়িতে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মরদেহের সাদা কাপড়ের ওপর জড়ানো হয় লাল পতাকা। আর বুকের ওপর রাখা ছিল গীতাঞ্জলি।