হয় আবাহনী, নয়তো মোহামেডান। কখনো সখনো মুক্তিযোদ্ধা, শেখ জামাল, শেখ রাসেল জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে যাওয়া। ২০১৮-পূর্ব দেশের ঘরোয়া ফুটবলের গল্পটা ছিল এই। এরপর থেকেই যে গল্পটা নতুন করে লেখা, তার মুখ্য চরিত্রের প্রায় পুরোটা জুড়েই বসুন্ধরা কিংস। ২০১৭ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ জিতে প্রিমিয়ারে পা রাখার পর থেকেই শুরু। দুই-একবার পা হড়কালেও সাফল্যের পথেই ধেয়ে চলা ক্লাবটি গতকাল নিজেদের নাম লিখিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। শীর্ষ পর্যায়ে আবির্ভাবেই লিগ শিরোপা জয়ের হ্যাটট্রিকের রেকর্ড দেশের আর কোনো দলের নেই। আধুনিক ফুটবলে সাফল্য পেতে যা যা প্রয়োজন তার সবটাই পূরণ করে কিংস এখন আবাহনী, মোহামেডানের ঐতিহ্য ছাপিয়ে সেরার মসনদে প্রতিষ্ঠিত।
কিংসের শো-কেসের ওপরের তাকে তিনটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। এর পরেই দুটি ফেডারেশন কাপ ট্রফি ও একটি স্বাধীনতা কাপ শ্রেষ্ঠত্ব। এছাড়া নারী ফুটবল লিগের দুটি শিরোপাও ঠাঁই পেয়েছে দামি সেই শো-কেসে। এ তো গেল নিজেদের প্রাপ্তির হিসাব। কিংসের আবির্ভাবে দেশের ফুটবলের প্রাপ্তির তালিকাটাও কিন্তু সমৃদ্ধ। স্বনামধন্য শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা কিংসের মালিকানাধীন এই ক্লাব চরম অপেশাদার অবকাঠামোয় এগিয়ে চলা ঘরোয়া ফুটবলের এক উল্টোরথের যাত্রী। ক্লাবটির সবকিছুতেই রয়েছে শতভাগ পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। তারাই দেশের একমাত্র দল, যাদের রয়েছে নিজস্ব ভেন্যু। বসুন্ধরা কিংস এরেনার পাশেই গড়ে উঠছে ব্যক্তিমালিকানাধীন দেশের সর্ববৃহৎ স্পোর্টস কমপ্লেক্স। নিকট ভবিষ্যতেই ফুটবল, ক্রিকেটসহ অনেকগুলো খেলার স্থাপনায় সজ্জিত এই কমপ্লেক্স হয়ে উঠতে পারে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল।
এই ক্লাব ফুটবলারদের কাছে পরম আরাধ্য হয়ে উঠেছে নানা কারণেই। প্রথমত, দলবদলের বাজারে কিংসের প্রবেশ চোখধাঁধানো বাজেট নিয়ে। কিংসের আবির্ভাবে একঝাঁক ফুটবলার পাচ্ছেন অকল্পনীয় পারিশ্রমিক। এবং সবচেয়ে বড় কথা, চুক্তির শতভাগই তারা বুঝে নিচ্ছেন কড়ায় গণ্ডায়। এমনকি চোটের কারণে পুরো মৌসুম বেঞ্চে কাটানোরাও পাচ্ছেন চুক্তির অর্থ। এছাড়া কিংসের হয়ে খেলতে গিয়ে চোট পেলে আর ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তায় পড়ছে না। ক্লাব নিয়ে নিচ্ছে চিকিৎসার সব দায়িত্ব। দলের নির্ভরযোগ্য স্টপার ব্যাক তপু বর্মণের কথাই ধরুন। মৌসুমের শুরুর আসর স্বাধীনতা কাপে খেলতে গিয়ে চোটে পড়েছিলেন। ভারতে সেরা হাসপাতালে সেরা চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে তার। ক্লাবেই পুরোদমে চলছে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। অথচ মৌসুম শুরুতে যত টাকার চুক্তি হয়েছিল সেটা তো পেয়েছেনই, আগামী মৌসুমের জন্যও আগাম চুক্তি পেয়ে গেছেন। তপুর কথায় অন্য ক্লাবের সঙ্গে পার্থক্যটা স্পষ্ট, ‘আমি বড় অনেক ক্লাবেই খেলেছি। তবে কিংসের মতো পেশাদারিত্ব দেখিনি কোথায়ও। খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্লাবটি যেকোনো বিপদে-আপদে আমাদের পাশে থাকে সবসময়। এ কারণেই এই ক্লাবে খেলার জন্য ফুটবলারদের আগ্রহ থাকে সবার ওপরে। ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা এতটাই আমাদের প্রতি আন্তরিক, যতদিন এখানে আছি, নির্দ্বিধায় বলতে পারি মাথার ওপর বেশ কজন অভিভাবক আছেন।’
কেবল বেতন, চিকিৎসার সুবিধা নয়; থাকার জায়গা, উন্নত খাবারের পাশাপাশি উইনিং বোনাস ঘোষণা ও সেটি প্রতিশ্রুত সময়ে বুঝিয়ে দেওয়াটা নিয়মে পরিণত করেছে ক্লাবটি। জাতীয় দলের প্রায় চৌদ্দআনা ফুটবলারকে দলে ভেড়ানোর পাশাপাশি উঁচুমানের বিদেশি আনায় দারুণ ঝোক কিংসের। তাদের কল্যাণেই ঢাকার মাঠে অনেক দিন পর দেখা গেছে বিশ্বকাপ তারকা। তাদের কল্যাণেই মেসির সতীর্থের সম্মোহিত ফুটবলের সাক্ষী হতে পেরেছেন ফুটবলভক্তরা। ব্রাজিলের বড় বড় দলের তরুণ ফুটবলারদের চোখধাঁধানো চুক্তিতে দলে নেওয়ার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হতে দেখা যায় না তাদের। শুধু ছেলেদের দল নয়, অনেক পিছিয়ে থাকা মেয়েদের লিগকে ঘিরেও কিংসের আগ্রহের শেষ নেই। ছেলেদের মতোই জাতীয় দলের তারকাদের সম্মিলন ঘটানো। তাদের অকল্পনীয় বেতন, সুবিধাদি প্রমাণ করে কিংস যেন দেশের ফুটবলে এক মডেলে পরিণত হয়েছে। আর তাদের মাতৃ-প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ এ মুহূর্তে দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আওতাধীন অনেকগুলো লিগ ও টুর্নামেন্টের স্পন্সর তারা। এছাড়া তাদের মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল টি-স্পোর্টসের কল্যাণে ফুটবল এখন পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে।
তারপরও আক্ষেপের গল্প আছে কিংসের। সেটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে না পারার গল্প। দু’বার এএফসি কাপের গ্রুপপর্ব উতরাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে ফেরা। তবে যেভাবে এগুচ্ছে কিংস, ধরে নেওয়াই যায় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলো ছড়াবে দলটি।