বিমানের একটি উড়োজাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কলকাতা বিমানবন্দরে চার ঘণ্টার সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। তবে এ জন্য কলকাতা বিমানবন্দরকে দায়ী করছে বিমান কর্তৃপক্ষ।
পরে নিরাপদে ঢাকায় ফেরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজটি। ঢাকায় আসার পর বিমানের নিজস্ব হ্যাঙ্গারে গিয়ারের ত্রুটি সায়ে তা মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম যায়।
বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, কলকাতায় ওই ফ্লাইটের যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর সময় যদি যাত্রীদের অফলোড করে এয়ারপোর্টে এনে রাখার সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে এত ভোগান্তি দেখা দিত না।
এ বিষয়ে বিমানের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক খন্দকার তাহের জানিয়েছেন, আসলে এখানে বিমানের কিছুই করার ছিল না। যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক। এ ধরনের ত্রুটি যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে। মূলত ল্যান্ডিং গিয়ারের সামান্য ত্রুটির জন্য ককপিটে রেড সিগন্যাল আসায় পাইলট সেটা মেরামত করার সময় দুই দফা সময় নেয়ায় ঘণ্টা চারেক সময় অতিরিক্ত লেগেছে। এ সময়টুকু যাত্রীদের ভোগান্তি হয়েছে।
বিমান জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে কলকাতা থেকে বিমানের ফ্লাইটটির ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে ফ্লাইট ছাড়ার আগ মুহূর্তে কারিগরি ত্রুটির কথা জানানো হয় এবং বিলম্বে ছাড়বে বলা হয়। ঘণ্টাখানেক পর প্রথম দফা যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে ফ্লাইটটি আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তবে রানওয়েতে গিয়ে ফ্লাইটটি আবার কারিগরি ত্রুটির কথা বলে উড্ডয়ন বাতিল করে বোর্ডিংয়ের কাছে ফিরে আসে। ফ্লাইটটিতে প্রায় দেড় শতাধিক যাত্রী ছিলেন। এ সময় প্রচণ্ড গরমে একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বিমান আরো জানিয়েছে, সাধারণত এ ধরনের ত্রুটি মেরামত করার সময় ফ্লাইটের পাওয়ার অফ করে দিতে হয়। এ কারণে উড়োজাহাজের ভেতরে থাকা যাত্রীরা এসির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় প্রচণ্ড গরমের শিকার হন। যদিও বিমানের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের বাইরে বের হয়ে আসার অনুমতি দেয়নি। ফলে যাত্রীদের বাধ্য হয়েই ওই ফ্লাইটের ভেতরে বসে থাকতে হয়।
কয়েকজন যাত্রী জানান, তখন অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপরও তাদের নামতে দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে যাত্রী শওকত হোসেন জানান, গ্রাউন্ড ইলেকট্রিসিটি না থাকায় এসি চলেনি, তাদের নামতে দেওয়া হয়নি।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্টেশন ম্যানেজার সাংবাদিকদের জানান, ফ্লাইটটি কারিগরি ত্রুটির কারণে ঠিক সময়ে ছাড়তে পারেনি। একজন অসুস্থ হন বলে আমরা জানতে পারি। সংবাদ পেয়ে প্লেনের সামনে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক ঢুকে ওই রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। শেষ পর্যন্ত সোমবার মধ্যরাত ১টা ৪১ মিনিটে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে ফ্লাইটটি।
এদিকে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ফ্লাইটে আটকে পড়া যাত্রীরা ফেসবুকে তাদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। উল্কা হোসেন নামে এক যাত্রী তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, কলকাতা থেকে দেশে আসার উদ্দেশে বিমান বাংলাদেশের প্লেনে ওঠার পাঁচ মিনিটের মাথায় ক্যাপ্টেন বললেন যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বিলম্ব হবে! ওই অবস্থায় এসি কাজ করছিল না। লাইট অফ হয়ে যাচ্ছিল বারবার। গরমে আধমরা অবস্থা আমাদের সবার। এভাবে আমরা চার ঘণ্টা আটকে ছিলাম। এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার তিনবার এসে ঠিকঠাক করে দেওয়ার পর ক্যাপ্টেন অতি দক্ষতার সঙ্গে বিমানের ১৮০ যাত্রী নিয়ে ঢাকা অবতরণ করলেন।
যান্ত্রিক ত্রুটি বলতে বিমানের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজটিতে কী হয়েছিল তা জানতে চাইলে মঙ্গলবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার বলেন, উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের আগ মুহূর্তে পেছনে ল্যান্ডিং গিয়ারে ইন্ডিকেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। তখন উড়োজাহাজটি রানওয়ের কাছে রেখে ত্রুটি খুঁজতে থাকেন কলকাতা বিমানবন্দরের প্রকৌশলীরা। এ কাজের জন্য বিমানের এসিসহ অন্যান্য ইঞ্জিন বন্ধ রাখা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর ত্রুটি কাটিয়ে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেয় উড়োজাহাজটি। সেই মুহূর্তে আবার একই ত্রুটি ধরা পড়ে এয়ারলাইনসটির। কিন্তু এ ত্রুটি ঠিক করতে কত সময় লাগবে, তা বলতে পারেননি প্রকৌশলীরা। এতে গরমে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কোনো উড়োজাহাজ বিমানবন্দর থেকে বের হলে রানওয়েতে যাত্রী নামানো বা ওঠানোর সুযোগ নেই। আইনে এমনটাই বলা আছে। আর প্রকৌশলীরাও ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না ত্রুটি সারতে ঠিক কত সময় লাগবে।
এ সম্পর্কে বিমানের প্রকৌশল শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, কলকাতায় বিমানের প্রকৌশল সহযোগিতা দিয়ে থাকে এয়ার ইন্ডিয়ার স্টাফরা। এখানেও তারা এসেছিল। কিন্তু তারা বিষয়টি ধরতে পারেনি। যে কারণে ওই ত্রুটি রেখেই ঢাকায় নিয়ে আসা হয় ফ্লাইটটি। কারণ এটা তেমন কোন বড় ত্রুটি ছিল না। ল্যান্ডিং গিয়ারে একটি কেবল ইন্টারমিট হওয়ায় ককপিটে রেড সিগনাল যাচ্ছিল। ঢাকায় আসার পর মাত্র আধা ঘণ্টায় সেই ত্রুটি সেরে মঙ্গলবার বিকেলেই সেটা চট্টগ্রাম চলে গেছে যাত্রী নিয়ে।