বিসিবির গঠনতন্ত্রে আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার কার্যক্রম শুরু থেকেই ছিল। তা বিভাগীয় ক্রিকেট সংস্থার অধীনে। সবকিছুর দেখভাল বিসিবিই করে আসছে। বিভাগীয়-জেলা-উপজেলা-বয়সভিত্তিক সব খেলাই হয়ে আসছে বিসিবির অধীনে। মানে বিভাগের যেকোনো প্রতিযোগিতা শুরু করতে বিসিবির অনুমোদন লাগে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা পরিবর্তনের দাবি ছিল। আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা গঠনের ঘোষণায় সেই দাবির বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ দেখা গেল। এখন প্রশ্ন, আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা এবার স্বতন্ত্র হবে না আগের মতোই বিভাগীয় ক্রিকেটের চাবি থাকবে কেন্দ্রে (বিসিবি)। কারণ বোর্ড সভাপতি নিজেই বলে দিয়েছেন আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার রূপরেখা বিসিবিই করে দেবে।
বিসিবি সভাপতির কথা, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের নজরদারি একা বিসিবির পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য আলাদা সংস্থার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে একমত চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা করলে তা যেন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় করা হয় সেদিকে নজর দিতে বললেন অভিজ্ঞ এ সংগঠক। ঘোষণা দেওয়ার পর সব ক্ষমতা বিসিবিতে না রাখার পরামর্শ তার, ‘শুধু ক্রিকেট নয়, ৫৪টা ফেডারেশন সবই তো ঢাকাকেন্দ্রিক। এখন আমরা ক্রিকেটের এই পর্যায়ে এসে এখনো যে বাংলাদেশের ক্রিকেট পিছিয়ে থাকার কথা উঠছে তার একমাত্র কারণ আমরা ক্রিকেটটাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারিনি। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে মূল বিষয় হলো এর বাস্তবায়ন।’
বাস্তবায়নের বিষয়টা ব্যাখ্যা করে আলমগীর জানান, ‘বোর্ড থেকে বলা হল চট্টগ্রাম বিভাগীয় বয়সভিত্তিক ক্রিকেট করতে। কিন্তু ওই কাজ একজন সংগঠক কতটা সফলভাবে করছে সেটা দেখার বিষয় আছে। ধরা যাক উইকেটের ব্যাপারটা কেমন উইকেট হওয়া উচিত সেটা তো একজন সংগঠক জানবে না। তা জানবে গ্রাউন্ডসম্যান। কিন্তু বিসিবির অভিজ্ঞ গ্রাউন্ডসম্যানের পক্ষেও তো পুরো দেশের সব উইকেট দেখা সম্ভবও নয়। এছাড়া ক্রিকেটারদের নির্বাচনের বিষয় আছে। ধরেন, একজন উপজেলা পর্যায়ের একটা ভালো প্রতিভা আছে, এই ছেলেটাকে তুলে আনা... একজন নির্বাচক যেভাবে ক্রিকেটার বাছাই করবে তা একজন সংগঠকের পক্ষে তো সম্ভব নয়। এগুলো তো ক্রিকেট বোর্ডের ঢাকা থেকে করা সম্ভব নয়। এজন্য আঞ্চলিক ক্রিকেটটা যদি বিসিবি করতেই চায় তাহলে এই দিকগুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।’
আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা হবে বিভাগকেন্দ্রিক। ঢাকার অংশ ময়মনসিংহ আলাদা অঞ্চল হিসেবে সব বিভাগীয় সুবিধা পাবে। এছাড়া রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে হবে আঞ্চলিক কেন্দ্র। বড় বিভাগে ১৭ জন সদস্য ও ছোট বিভাগে ১১ সদস্য থাকবে। এই সদস্য তালিকায় কারা থাকতে পারেন সে ব্যাপারেও ধারণা দিলেন ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য আলমগীর, ‘আঞ্চলিক ক্রিকেটকে শক্তিশালী করতে হলে বিভিন্ন বিভাগীয় ক্রিকেটে যারা ক্রিকেট অন্তপ্রাণ তাদের রাখা যেতে পারে, এর সঙ্গে ক্রিকেটে অভিজ্ঞ যেমন সাবেক ক্রিকেটারদের নির্বাচক হিসেবে রাখা যায়। অর্থের সঠিক প্রয়োগের বিষয়ও আছে। সেজন্য এক বা একাধিক অর্থ কর্মকর্তা থাকতে পারেন। আর সবকিছু ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য একজন সিইও থাকতে পারেন। প্রতিটি আঞ্চলিক সংস্থায় নতুন চেয়ারম্যান আসতে পারেন। মাঠ থেকে শুরু করে দাপ্তরিক পর্যন্ত সবক্ষেত্রে এটা থাকলে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট অন্য পর্যায়ে অবশ্যই যাবে।’
জেলা ও বিভাগীয় ক্রিকেট সংস্থাকে বর্তমানে লিগ আয়োজন সাপেক্ষে বছরে ২ লাখ টাকা করে অনুদান দেয় বিসিবি। আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা বাস্তবায়ন হলে নির্দিষ্ট বাজেট হবে। প্রতি সংস্থায় বিসিবি থেকে একজন করে অর্থ কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে কমিটি গঠন করতে হলে নির্বাচনের একটা প্রশ্ন থাকেই। আলমগীর মনে করেন নির্বাচন এখনই সম্ভব নয়। তবে একটা কমিটিতে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, আম্পায়ার্স কমিটির সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সাবেক ক্রিকেটাররা থাকতে পারেন। আর আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার গাইডলাইন তৈরির সময় বিভিন্ন বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালা কমিটিতে যারা আছে, তাদের মতামত কামনা করছেন আলমগীর। এতে ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উঠবে না বলে মনে করেন তিনি।
বিসিবির জন্য উদাহরণ হতে পারে প্রতিবেশী ভারতের আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থাগুলো। ক্রিকেট বোর্ড অব বেঙ্গলের সাফল্য তো সবারই জানা। এই সংস্থার মতে মূল বোর্ড থেকে স্বতন্ত্র হতে হলে বিসিবির আরও সময় লাগবে। কারণ ভারত-পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতিটাই তো ৫০ থেকে ১০০ বছরের। বাংলাদেশ মাত্র শুরু করলেও পরিবর্তন-পরিবর্ধনে সফল আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা তৈরি সম্ভব।