চবিতে যৌন নিপীড়ন: ছাত্রলীগের দিকে অভিযোগের তীর

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের দায়ী করলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তবে হাটহাজারী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শী ও যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, অভিযুক্তরা সবাই ছাত্রলীগ কর্মী। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ থেকে এখনো তাদের চেহারা শনাক্ত করা যায়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৩৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে সেগুলোর মধ্যে অর্ধেকের নাইট ভিশন আছে। সেখান থেকে পাওয়া ফুটেজ নিয়ে কাজ করছে বলে জানায় পুলিশ।

হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি। সিসিটিভি ফুটেজ অপরিষ্কার ও নিম্নমানের হওয়ায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমার টিম কাজ করছে এবং আমরা আশা করছি খুব শিগগির ফলাফল পাব।’

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেই সময় ঘটনা ঘটেছে সেই নির্দিষ্ট সময়ের প্রত্যেকটি পয়েন্টের সিসিটিভি ফুটেজ আমরা সংগ্রহ করেছি। ফুটেজের প্রত্যেক সেকেন্ড গুরুত্ব সহকারে চেক করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্তে প্রশাসন এবং পুলিশ একযোগে কাজ করছে। প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চবি প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাজিয়া আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রীকে নিপীড়নের যে ঘটনার বিচার চার ঘণ্টার মধ্যে হওয়ার কথা ছিল সে ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন কিছু করতে পারেননি। আমরা তো ক্যাম্পাসকে আমাদের বাড়ির মতো মনে করি। এখানে প্রশাসন আমাদের অভিভাবক। আমাদের বাড়িতে আমাদের আমাদের অভিভাবকরাই আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। এরকম অভিভাবক থেকেই বা কী লাভ? ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে গতকাল ঢাকায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শিমুল কুম্ভকার বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে সরকারি পেটোয়া বাহিনী- সোনার ছেলে ছাত্রলীগ যুক্ত। এ ঘটনার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতিও যুক্ত! যার কারণে প্রক্টর খুঁজে পাচ্ছেন না কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী যখন অভিযোগ দিতে যায় তখন নানাভাবে তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়; চুপ থাকতে বলা হয়।’

একই জায়গায় পৃথক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামীন মোল্লা বলেন, ‘ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের আখড়া বানিয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি করে পাঁচজন মিলে তার ভিডিও ধারণ করেছে। চবি শাখা ছাত্রলীগের নেতারা সেই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রক্টরের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে চবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল বাধা প্রদান করে।’

সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে পূর্ণ সংহতি জানাই। ছাত্রলীগের দোষী শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে।’

গত রবিবার রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হতাশার মোড় থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় নিয়ে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। পাঁচজন ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করা হয়। পরদিন প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেন ওই ছাত্রী। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে একই দিন হাটহাজারী থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাও করেন। ওই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশের নির্দেশনা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বুধবার গভীর রাত অবধি হলের বাইরে বিক্ষোভ দোষীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। পরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।