আমদানি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

বর্ধমান আমদানি-ব্যয় বাংলাদেশের তেজি অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিশ্বমন্দা অনেক দেশের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিলেও বলতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েনি। তবে করোনা মহামারী-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও ধাক্কা খেয়েছে। বর্ধমান আমদানি-ব্যয় এবং আমদানি-ব্যয়ের আড়ালে অর্থ পাচারের অনুমিত বিষয়টি এর কারণ বলে খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এমনটাই মনে করছেন।

দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানির পুরোটা যথাযথ নয়। ভুয়া আমদানিও আছে। আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে টাকা পাচার হয়ে থাকতে পারে। আমদানি ব্যয়ে কড়া নজর না রাখলে ভুয়া আমদানি ঘটতেই থাকবে। তাতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে। এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।

গত অর্থবছরের (২০২১-২২) মে পর্যন্ত ১১ মাসে দেশের আমদানি-ব্যয় ছিল ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। একই সময়ে রপ্তানি-আয় ছিল রেকর্ড ৪ হাজার ৪৫৮ কোটি ডলার। ১১ মাসে রপ্তানি-ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৮২ কোটি ডলার। 

ডলার সংকটে ভুগতে থাকা দেশের ব্যাংকগুলোর আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ওপর সম্প্রতি কড়াকড়ি আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৮ জুলাই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডলারের বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ঋণপত্র আটকে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকগুলোকে ৫০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের ঋণপত্র খোলার বিষয়ে তথ্য ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এর আগে ঋণপত্র আটকে দেওয়ার ঘটনার কথা শোনা যায়নি।

এলসির মাধ্যমে বছরে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার : গত ৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার বা ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। গড়ে প্রতি বছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সালেই পাচার হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। এলসির মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হয়েছে। গত বছর বৈদেশিক বাণিজ্যের ১৮ শতাংশ ছিল ভুয়া। গত ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

জিএফআই বলেছে, দুটি প্রক্রিয়ায় এ অর্থ পাচার হয়েছে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)। অর্থ পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ১৮ শতাংশই কোনো না কোনো ভাবে পাচার হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বাইরে বিদেশে স্বতন্ত্র কোম্পানি নিবন্ধন করে। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানি খোলা হয় কর-অবকাশ পাওয়া দেশে। বাংলাদেশ থেকে যখন কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি করে তখন ওই প্রতিষ্ঠানের বিদেশে খোলা কোম্পানিতে ওভার ভয়েসিং (প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখানোর) এলসি দেয়। বিদেশে থাকা কোম্পানিটি মূল কোম্পানি বা যার কাছ থেকে পণ্যটি কেনা হবে তার কাছে এলসি দেয় প্রকৃত মূল্যে। বাড়তি অর্থ আমদানিকারকের নিজের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাবে থেকে যায়। এ অর্থ বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলেই যায়। একই রকম প্রক্রিয়া রপ্তানির সময়ও অবলম্বন করা হয়ে থাকে।

জিএফআইর মতে, বাংলাদেশের ১৮ শতাংশ অর্থ আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়। গত অর্থবছরের ১১ মাসে প্রায় সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যা দেশি মুদ্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে পণ্য-সংকট দেখা দিলে পণ্য আমদানি বা মজুদের জন্য ব্যবসায়ীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সঠিক তথ্যের অভাবে কোন ধরনের পণ্য কতটা আমদানি বা মজুদের প্রয়োজন তা বুঝে উঠতে না পারার কারণে এমনটা ঘটে থাকে। কিছু পণ্যের আমদানি বা মজুদ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদারকি করতে পারলেও সামগ্রিক পণ্যবাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সংকটময় মুহূর্তে বাজারের এ অস্থিরতা বাড়তে থাকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ার কারণে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিলাসী পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কম প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য আগাম জমার মার্জিন বাড়ানো হয়েছে। এরপরও কমছে না আমদানি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। যোগদানের দিনই তিনি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, কয়েক ধরনের পণ্য আমদানির প্রবৃদ্ধি আমদানি খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। সে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে।

বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ৫-৬ ধরনের পণ্য আমদানিতে ১০০ থেকে ৫০০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত ১১ মাসে চাল আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৯৮ শতাংশ। এ সময়ে চাল আমদানিতে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে চাল আমদানিতে ২৮ কোটি ৮২ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়।

ওষুধ আমদানির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৫১৭ শতাংশ। আলোচিত ১১ মাসে ওষুধ-আমদানিতে ৫৭ কোটি ৭২ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল।

গার্মেন্ট খাতের কাঁচামাল কটন ও সিনথেটিক এবং মিশ্র ইয়ার্ন আমদানিতে ৪২০ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ২৮৫ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল। গার্মেন্ট খাতের কাঁচামালের আমদানি বেড়েছে ১০৬ শতাংশ।

একই সময়ে টেক্সটাইল ফেব্রিক ও গার্মেন্ট এক্সেসরিজ আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৬ শতাংশ। রাসায়নিক সার আমদানিতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১২১ শতাংশ, জ্বালানি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪১ শতাংশ, কয়লা আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০৯ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৫ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২ শতাংশ, ভোজ্য তেল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২ শতাংশ। এ খাতগুলোতে আলোচিত ১১ মাসে মোট আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ২৪৬ কোটি ডলার।

বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে গম আমদানির পেছনে ১৭৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়। ওই সময় পর্যন্ত ডলারের গড় দর ৯০ টাকা ধরে দেখা যায়, গম আমদানি হয়েছে ১৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার। আরও ১০৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের গম আমদানির এলসি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। এ খাতে নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি ৩২ শতাংশ। অনিষ্পন্ন এলসি নিষ্পন্ন হলে এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে।

সব মিলিয়ে বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি বেড়েছে ৪৮ শতাংশ। অর্থবছরের পুরো সময়ের তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ধারণা করা হচ্ছে, ওই অর্থবছরে আমদানি-ব্যয় ৯ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

এ আমদানির কতটুকু যথাযথ খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম। গত রবিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক সংলাপে তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে অর্থ পাচার হয় মূলত আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সরকার বা রাজস্ব বোর্ডকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি।’

মীর্জ্জা আজিজুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়লে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ এসব খাত থেকে পরবর্তী সময়ে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্য আমদানি কমাতে হবে।’

করোনা মহামারীর প্রকোপ কমে আসতে শুরু করলেও গত অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে রেমিট্যান্স আসা কমতে থাকে। বিদায়ী অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে ১৫ শতাংশ। এদিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম। বর্ধিত আমদানি-ব্যয় মেটাতে দেশে ডলারের সংকট দেখা দিলে গত অর্থবছর ৭৬২ কোটি ডলার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরও ডলারের দর ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এখন আমদানি পর্যায়ে ডলার ৯৪ দশমিক ৫০ টাকায় বিক্রি করছে ব্যাংক। নগদ ডলার প্রায় ১০০ টাকা ছুঁই ছুঁই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো ডলারের জোগান দিচ্ছি। জুলাই মাসের প্রথম ১৮ দিনে আমরা প্রায় ৬৮ কোটি ডলার ব্যাংকগুলোকে দিয়েছি। তাছাড়া আমরা আমদানি নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়াতে অনেক ধরনের শর্ত শিথিল করা হয়েছে।’