ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর কেন উত্তেজনা সৃষ্টি করছে?

চীন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে মার্কিন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরে গেলে তারা জোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন।

প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের পর ন্যান্সি পেলোসি এখন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং তিনি এই সফরে গেলে তা হবে ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ পদের মার্কিন রাজনীতিবিদের তাইওয়ান সফর। তিনি যদি এই সফরে যান তাহলে ‘দৃঢ় এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে বলেও হুমকি দিয়েছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে এর ফলে তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়তে পারে।

 

ন্যান্সি পেলোসি কেন তাইওয়ান যেতে চান?

পেলোসি মার্কিন কংগ্রেসে তার প্রায় ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে চীনের কট্টর সমালোচক ছিলেন। পেলোসি চীনের মানবাধিকার রেকর্ডের নিন্দা জানিয়ে আসছেন, চীনা গণতন্ত্রপন্থি ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের দমনপীড়নে হতাহতদের স্মরণ করতে স্থানটি সফরও করেছেন। সেখানে তিনি নিহতদের স্মরণে একটি ব্যানারও উন্মোচন করেছিলেন।

তিনি ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীদের ওপর চীনের ক্র্যাকডাউনের বিরুদ্ধেও শক্তিশালী সমালোচক ছিলেন। এর ফলে তিনি চীনের তীব্র সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত হন।

পেলোসির প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল গত এপ্রিলেই তাইওয়ান সফর করার, কিন্তু কোভিড আক্রান্ত হওয়ায় তার ওই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

এখনও তিনি তার সম্ভাব্য তাইওয়ান সফর নিয়ে কিছু খোলাসা করছেন না। কয়েকদিন আগে কেবল বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন দেখানো’।

 

এই সফর কেন উত্তেজনা বাড়াবে?

চীন তাইওয়ানকে তার নিজস্ব এলাকা বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে তা দখল করা হবে বলেও হুমকি দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সামরিক কর্মকান্ড মূলত এই ধরনের একটি মিশনের দিকেই পরিচালিত হয়েছে।

বেইজিং তাইপেই এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সমস্ত আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ব্যাপারে আপত্তি জানায় এবং নিয়মিতভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেয়।

১৯৯৫ সালে তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লি তেং-হুই-এর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রতিক্রিয়ায় চীন সামরিক মহড়া শুরু করে এবং তাইওয়ানের কাছাকাছি সমুদ্রে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু সেসময় থেকে এখন চীনের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে।

২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালেক্স আজার যখন তাইওয়ানে গিয়েছিলেন, তখনও চীনের বিমানবাহিনীর জেটগুলো তাইওয়ান প্রণালীর মধ্যবর্তী রেখা অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, চলে এসেছিল তাইপের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়।

তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন পেলোসির বিমানকে তাইপেইতে নামতে বাধা দিতে শক্তি প্রয়োগ করবে এমন সম্ভাবনা কম। অবশ্য চীন ঠিক কী প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। তাইওয়ানের স্থল ও জলসীমায় চীনের হুমকিমূলক সামরিক মহড়া এবং যুদ্ধ জাহাজ ও বিমানের অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

 

এই সময়টা কেন সংবেদনশীল?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন চীনের সঙ্গে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই অশান্ত এবং অত্যন্ত জটিল সম্পর্কটি বজায় রাখতে আগ্রহী।

পেলোসি এপ্রিলেই তাইওয়ান সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোভিড-১৯ হওয়ার পর তা স্থগিত করেন। আগামী সপ্তাহে তিনি তাইওয়ান ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। এমন এক সময়ে তিনি তাইওয়ান সফর করছেন যখন চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক শাখা পিপলস লিবারেশন আর্মির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপিত হবে। আগামী ১ আগস্ট পিপলস লিবারেশন আর্মির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।

এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে কয়েকদিনের মধ্যেই কথা বলবেন এবং তাদের আলোচনায় তাইওয়ান ও ‘উত্তেজনার নানান ইস্যু’ স্থান পেতে পারে। শি ও বাইডেন সর্বশেষ মার্চে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

আর চলতি বছরের শেষদিকে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস হতে যাচ্ছে, তাতে দলটি নজিরবিহীনভাবে শি জিনপিংকে তৃতীয়বারের মতো দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে পারে।

এছাড়া চীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শির ক্ষমতার বিস্তৃতি এবং মহামারীতে তার কঠোর শূন্য-কোভিড নীতির প্রতিক্রিয়া দেশটিতে কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সেই অসন্তোষ কমানোর জন্য শি হয়তো তাইওয়ান ইস্যুতে চীনাদের দেশপ্রেম উস্কে দিতে পারেন।