ব্রিটিশ রাজনীতিতে ভারতীয়দের উত্থান

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য লড়াই চলছে লিজ ট্রাস ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাকের মধ্যে। অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি ঋষির রাজনৈতিক পূর্বসূরিদের আমলে কেমন ছিল যুক্তরাজ্যে ভারতীয়দের অবস্থান? কেন তাদের ব্রিটিশ রাজনীতির মাঠে নামতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া  

পটভূমি

ভারতের রাজনীতি প্রায় দুইশো বছর যুক্তরাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। বলাই বাহুল্য, এই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশদের হাতে। একসময় প্রবল দাপটের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। গত শতাব্দীতে এই সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায়। এরপর যুক্তরাজ্যের রাজনীতির ধরনে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ঋষি সুনাকের যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকা। তিনি একসময় যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। চলতি মাসে চাপে পড়ে পদত্যাগে বাধ্য হন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তার উত্তরসূরি হতে হাড্ডাহাড্ডি লড়ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাক। 

২০১১ সালের এক আদমশুমারিতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ১৪ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক বাস করে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ২.৫ শতাংশ। দেশ ছেড়ে ভারতীয়রা বিলেতে পাড়ি দেয় কয়েক শতাব্দী ধরে। তবে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয়দের স্বাধীনতা অর্জনের পর। সে সময় দুবার যুক্তরাজ্যে বড় ধরনের অভিবাসনের ঢেউ ওঠে। প্রথম ঢেউ দেখা যায় চল্লিশের দশকের শেষে ও পঞ্চাশের দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে চল্লিশের দশকে যুক্তরাজ্যে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা যায়। ঘাটতি পূরণে ভারত থেকে তখন অনেক শ্রমিককে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়। এরপরের ঢেউ দেখা যায় ষাট ও সত্তরের দশকে। ওই সময় ভারতীয়দের উগান্ডা, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয় বা উৎসাহ দেওয়া হয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি সুশীল প্যাটেল, সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক ও অ্যাটর্নি জেনারেল সুয়েলা ব্রেভারম্যানের পরিবারের সদস্যরা ওই দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ই যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেন। এ নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ভারতীয়রা যুক্তরাজ্যে থাকা শুরু করলেও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ানদের যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে প্রবেশ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এত দেরিতে যুক্তরাজ্যের রাজনীতির মাঠে নামার কারণ একদিকে ভারতীয়দের দেশটিতে সামাজিক মর্যাদার ঘাটতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রচার-কর্মকাণ্ড চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব। 

প্রথম পর্যায়ের অভিবাসন

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ব্রিটিশদের সংস্পর্শে আসে ভারতীয়রা। শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর হওয়া ভারতীয়দের বেশির ভাগই ছিলেন অসচ্ছল নাবিক ও শ্রমিক। ভিন দেশে তারা শোষণ-নিপীড়নের শিকার ছিলেন, দরিদ্র জীবনযাপন করতেন। পরবর্তী সময়ে ভারতের বণিকরা যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হিসেবে থাকতে শুরু করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বণিকরা দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ভারত ও বৃহত্তর ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ করা ব্রিটিশদের অর্থনীতির চাকা অনেক বেশি গতিশীল হয় এই বণিক শ্রেণির কারণে। শুরুতে গুজরাটি, বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) শহরের পার্সি ও দক্ষিণ ভারতের চেত্তিয়াররা ছিলেন এই বণিক শ্রেণির প্রতিভূ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাজার হাজার ভারতীয় সেনাদের ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। লক্ষ্য, মিত্র বাহিনীর সঙ্গে মিলে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে সে সময় প্রচুর শিখ সম্প্রদায়ের মানুষদের নেওয়া হতো কারণ ব্রিটিশরা তাদের উঁচু জাতের মানুষ হিসেবে দেখত। ওই সেনাবাহিনীতে তখন শিখদের হার ছিল ২০ শতাংশ। যুদ্ধের পর তাদের অনেকে ইংল্যান্ডেই থেকে যান। এক ইতিহাসবিদের মতে, ১৯৩৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের প্রায় সব বড় শহরে শিখরা ছড়িয়ে পড়েন। শুরুর দিকে যেসব ভারতীয় যুক্তরাজ্যে অস্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেন, তাদের একটি অংশ সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই প্রবণতার বড় কারণ ব্রিটিশ রাজনীতিক টমাস ম্যাকোলের বিখ্যাত এক বক্তৃতা। ১৮৩৫ সালের ওই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ভারতীয়দের তাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া উচিত, অন্য দেশে নয়। তবে তারা যদি ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হন, সেক্ষেত্রে তারা ইংল্যান্ডের প্রশাসনিক দপ্তরে চাকরি করতে পারেন।      

ম্যাকোলের এই পরামর্শ ভারতের স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। ভারতের অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের প্রথম দিকের সদস্যরা যুক্তরাজ্যেই পড়াশোনা করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম, ফিরোজশাহ মেহতা, দাদাভাই নওরোজি, মহাত্মা গান্ধী, জওয়াহেরলাল নেহরু ও সুভাষ চন্দ্র বোস। ভারতের স্বাধীনতার আগে দেশটির মানুষ ইংল্যান্ডে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করলেও তাদের সংখ্যা ধরতে গেলে বেশ নগণ্যই ছিল। ১৮৩০ থেকে ১৯৩০ সালÑ এই ১০০ বছরে ভারতীয়রা যেসব দেশে অভিবাসনের জন্য আবেদন করেছিল, সেই শীর্ষ ১৬ দেশের তালিকায় যুক্তরাজ্যের নাম নেই। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের পর এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে।

স্বাধীনতাপরবর্তী অভিবাসন

১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যে বাস করা ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের একটু বেশি। এই সংখ্যা এক দশক পর ১৯৬১ সালে আড়াই লাখে গিয়ে ঠেকে। এরও এক দশক পর যুক্তরাজ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮৩ হাজারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে শিখ সম্প্রদায়ের অনেকে কর্মরত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তারা দেশে ফেরেননি। এ ছাড়া ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যেসব পাঞ্জাবি ও শিখ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন, তাদেরও একটি বড় অংশ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে যারা আগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বা পুলিশ বাহিনীতে কাজ করেছিলেন, তাদের অভিবাসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বেশি। এই অভিবাসীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যে যে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়, তার অনেকটাই পূরণ করেন। দেশটির কল-কারখানা, টেক্সটাইল ও বিমান শিল্পে তাদের উপস্থিতি ছিল বেশি।

যুক্তরাজ্যে ভারতীয় অভিবাসীদের পরবর্তী ঢেউ দেখা যায় ১৯৭২ সালে। সে সময় উগান্ডার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন দেশ থেকে ভারতীয়সহ সব এশীয়কে তাড়িয়ে দেন। আমিনের ওই পদক্ষেপে শঙ্কিত হয়ে পড়েন পূর্ব আফ্রিকার অন্য দেশে বাস করা ভারতীয় অভিবাসীরা। তাদের ভয় হয়, উগান্ডার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকারও দেশ ছাড়তে বলবে। তারা তখন ভারতে না ফিরে লন্ডন শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও লেস্টার শহরে পাড়ি দেন। পূর্ব আফ্রিকা থেকে আসা এই অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে ধনী ছিলেন। তারা লন্ডন ও লেস্টারে মন্দির নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে শহর দুটিতে ভারতীয় রেস্তোরাঁ খোলার পাশাপাশি ব্রিটিশদের কাছে বলিউড সিনেমা নিয়ে যান। তাদের এসব কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্যে অবস্থান করা ভারতীয় শ্রমিকদের আকৃষ্ট করে, যাদের বেশির ভাগই পরে লন্ডনে যান।

যুক্তরাজ্যে ভারতীয়দের অবস্থা

যুক্তরাজ্যে বাস করা ভারতীয়দের দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একদল বৈধ ও আরেক দল অবৈধ অভিবাসী। দেশটিতে ভারতীয়রা কেমন আছেন, তা বুঝতে গেলে এই দুই দলকে আলাদা করা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এক লাখ ভারতীয় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, যাদের বেশির ভাগই অদক্ষ বা সামান্য দক্ষ তরুণ। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের মধ্যে যুক্তরাজ্যে তারা দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে বৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো। আফ্রিকান বা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের চেয়ে ভারতীয়দের ব্রিটিশরা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে বলে মনে করেন মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড টি শেফার। তার ভাষ্য, ব্রিটিশরা মনে করে, ভারতীয় অভিবাসীদের শিক্ষিত ও সভ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব, যা আফ্রিকান, ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানসহ অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কঠিন। এ ছাড়া ভারতীয়দের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে বলেও মনে করেন ব্রিটিশরা।  

যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের (ওএনএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে শ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় গড়ে ৩.৮ শতাংশ কম আয় করেন জাতিগত সংখ্যালঘুরা। অবশ্য এই চিত্র ভারতীয় ও চীনাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আয়সংক্রান্ত এক ডেটায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে প্রতি ঘণ্টায় ভারতীয়রা গড়ে আয় করেন ১৩.৪ পাউন্ড এবং তাদের কর্মসংস্থানের হার ৭৫.৯ শতাংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়া জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভারতীয়দের আয় ও কর্মসংস্থানের হার সবচেয়ে বেশি। এই ডেটা আমাদের তিনটি বাস্তবতা জানায়। প্রথমত, যুক্তরাজ্যের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছেন বেশি। দ্বিতীয়ত, দেশটিতে ভারতীয়দের সম্পত্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে; প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেন। তৃতীয়ত, যুক্তরাজ্যে ভারতীয়রা সফল কারণ তাদের অনুগত এবং অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করেন না ব্রিটিশরা। এই তিন বাস্তবতার ছেদবিন্দুতে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি ঋষি সুনাক। তৃতীয় প্রজন্মের ভারতীয়দের প্রতিনিধি ঋষি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি সেই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান গোত্রের যারা যুক্তরাজ্যে নানা ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তবে ঋষির সফলতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার পূর্বসূরিদের ব্রিটিশ রাজনীতিতে অবদান নিয়েও আলোচনা জরুরি। আর এক্ষেত্রে অবধারিতভাবেই নাম আসবে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ছাপ ফেলা প্রথম ভারতীয় দাদাভাই নওরোজির।   

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ভারতীয়রা

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্স ও উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মাত্র একজন ভারতীয় দেশটির পার্লামেন্টে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। তিনি হলেন দাদাভাই নওরোজি। পার্সি পরিবারের সদস্য তিনি। দাদাভাই কেবল প্রথম ভারতীয় নন, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম এশীয় এমপি। ১৮৯২ সালে সেন্ট্রাল ফিন্সবেরি থেকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন লিবারেল পার্টির নেতা দাদাভাই। মানচেরজি ভৌনাগ্রি নামে আরেক ভারতীয় পার্সি কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে পরে ১৮৯৫ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ী হয়েছিলেন। দুজনই ভারতের স্বার্থের পক্ষে কথা বললেও দাদাভাই চেয়েছিলেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা, অন্যদিকে মানচেরজি বিশ্বাস করতেন, ভারত শাসনের জন্য ব্রিটিশরাই সবচেয়ে উপযুক্ত। এ কারণে দাদাভাই ভারতে অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন এবং যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশরা তাকে সন্দেহ ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখত। দাদাভাই সম্পর্কে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোচিত নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক বলেছিলেন, ‘২৮ কোটি ভারতীয়কে যদি বলা হতো, তোমাদের মধ্য থেকে মাত্র একজনকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠাও, তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে দাদাভাই নওরোজিকেই নির্বাচন করতাম।’ তিন বছর পর ১৮৯৫ সালে পুনর্নির্বাচনে দাদাভাই হেরে গেলেও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে কথা বলা থামাননি তিনি। যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছাড়াও রাজনৈতিক অন্যান্য ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ভারতীয় অভিবাসীরা। এদের মধ্যে ছিলেন লাল মোহন ঘোষ। ভারতে ব্রিটিশদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালান তিনি। এ ছাড়া ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ছিলেন বামপন্থি ভিকাজি কামা। ১৯০৭ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ভারত থেকে ব্রিটিশদের সরে যাওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ানরা যেভাবে যুক্তরাজ্য-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে ভাবত, তেমনটা পরবর্তী সময়ে দেখা যায়নি। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভারতীয়দের ভোট এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভারতীয় ভোটারের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ১৫ হাজার। এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়,  নির্বাচনে ভারতীয়রা সবচেয়ে বড় সুইং ভোটার (নির্দিষ্ট কোনো দলের ভোটার নয়)। নির্বাচনের ফলাফলে বরাবরই এই সুইং ভোটাররা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এ কারণে ভারতীয় ভোটারদের গুরুত্ব দিতে বাধ্য যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলো। এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থি দল ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি শিখ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে দলভুক্ত করার লক্ষ্যে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে। এছাড়া একসময় দাদাভাই নওরোজির প্রার্থিতার বিরোধিতা করা কনজারভেটিভ পার্টি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে তাদের প্রার্থী ডেভিড ক্যামেরনের পক্ষে হিন্দি ভাষায় একটি প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছিল। 

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ানরা নির্বাচনে কোন প্রার্থীকে ভোট দেবে, তা নির্ভর করে কয়েকটি ক্ষেত্রে তাদের হিসাব-নিকাশের ওপর। ২০২১ সালের এক জরিপে দেখা যায়, নির্বাচনের সময় অর্থনীতিকে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, এর হার ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও ভারতের সম্পর্কের গুরুত্বের হার মাত্র তিন শতাংশ। এ ছাড়া মাত্র ১২ শতাংশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মনে করেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পার্লামেন্টে একজন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এমপি থাকা খুব দরকার। ৩৩ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মনে করেন, পার্লামেন্টে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এমপি থাকা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় আর ২১ শতাংশ মনে করেন, পার্লামেন্টে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এমপি থাকার দরকারই নেই। এসব পরিসংখ্যান ধর্মের দিক থেকে আরও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। লেবার পার্টি কাশ্মীরে স্বাধীন পর্যবেক্ষকের দাবি জানালে তার বিরোধিতা করেন ৩৯ শতাংশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান হিন্দু। মাত্র তিন শতাংশ মুসলমান ও ১৫ শতাংশ খ্রিস্টান ওই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান হিন্দুরা বর্তমানে ভারতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী নীতির কড়া সমর্থক। যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান হিন্দুদের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের বিভাজন সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে পড়ে লেবার ও কনজারভেটিভ এই দুই দলের মধ্যে সমর্থন প্রশ্নে।  

শুরু থেকেই ভারতীয় অভিবাসীরা রাজনৈতিক দল লেবার পার্টির কট্টর সমর্থক। অবশ্য এই দল একপর্যায়ে অনেক বেশি বহুসংস্কৃতির আধার হয়ে উঠলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান হিন্দুরা কনজারভেটিভ পার্টির দিকে ঝোঁকেন। তা সত্ত্বেও ভারতীয়দের অনেকে এখনো লেবার পার্টির সমর্থক। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ২৪ শতাংশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান লেবার নেতা কিয়ের স্টারমারকে যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। অন্যদিকে ২১ শতাংশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মনে করেন, ঋষি সুনাকই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার।

অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় যুক্তরাজ্যে ভারতীয়রা এখন অনেক বেশি সচ্ছল। তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে তাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাবা-মা বা দাদা-দাদির চেয়ে উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি ঋষি সুনাকেরই মিল বেশি। ঋষির জন্ম বিত্তশালী পরিবারে। পড়াশোনা করেছেন বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় আইভি লিগে। অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি বলে ঋষিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েন না লেবার পার্টির নেতারা। সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণিগত স্বার্থের কারণে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে আজ একেবারে সামনের সারিতে ঋষির অবস্থান।