জনশুমারি কী বার্তা দিচ্ছে

দেশের ষষ্ঠ জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো বুধবার। এর কদিন আগে ১১ জুলাই দেশে দেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এবার বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে করা প্রাক্কলনে বলা হয়েছে চলতি বছরের নভেম্বরেই বিশে^র মোট জনসংখ্যা ৮০০ কোটিতে পৌঁছে যাবে। জনসংখ্যাকে জনশক্তি বিবেচনা করে বলা যায়, ৮০০ কোটি জনসংখ্যা মানে ৮০০ কোটি শক্তি বড় সংখ্যা, বড় চ্যালেঞ্জ ও বড় সম্ভাবনা। আবার অন্যদিকে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ মৌলিক মানবাধিকারগুলো রক্ষার চ্যালেঞ্জের দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খেয়াল করা দরকার, বিশ্বের এই মোট জনসংখ্যায় আমাদের হিস্যা কিন্তু কম বড় নয়, প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের। অনুপাত ও সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। যে দেশের জনঘনত্ব পৃথিবীতে সর্বাধিক। এবারের জনশুমারি ও খানা জরিপে বয়স, বাসস্থান, পেশা, লিঙ্গ, ধর্ম, পরিবারের আকারসহ মোট ৩৫টির মতো প্রশ্ন ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তরে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তথা জনশুমারির সার্বিক ফল বিশ্লেষণ শুধু ভবিষ্যতের জন্য জনসংখ্যা নীতিই নয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, আবাসন ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের বিকেন্দ্রীকরণসহ বহু জরুরি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। আমরা আশা করব সরকার সেসব বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ দেবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ও প্রকাশিত ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪, নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে দেশে পুরুষের সংখ্যা ৯৮ জন। আর গত এক দশকে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯১৯ জন। ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যায় দেখা গেছে, দেশে মুসলমান ৯১ শতাংশ। সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে যা ছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। যা আগের শুমারিতে ছিল শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। এছাড়া এ জনশুমারিতে সামাজিক অগ্রগতির নানা চিত্রও উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুসারে দেশে এখন জনসংখ্যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২। ২০১১ সালের জনশুমারিতে গড় জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৩৭। অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হার শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমে এসেছে। ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়।

জনশুমারির তথ্য বলছে, দেশে এখন সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ঢাকা জেলায়। আর রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৩৪ হাজারে উন্নীত হয়েছে। এখন রাজধানীতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করছে ১০ হাজার ৬৭ জন। তবে ঢাকায় পরিবারের আকার কমেছে। এখন ঢাকায় একটি পরিবারের আকার ৩ দশমিক ৬৫ জন। যা আগে ছিল ৪ দশমিক ৩২ জনে। অন্যদিকে দেশে সর্বোচ্চ জনসংখ্যার পাঁচ জেলা হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল। আর দেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া যা মূলত বেশ কিছু জৈবিক ও সামাজিক কার্যকারণের ওপর নির্ভর করে। অনেক দেশের মতোই আমাদের দেশেও মেয়েদের গড় আয়ু ছেলেদের চেয়ে বেশি। এছাড়া জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমার পেছনে তাদের কম জন্মহার এবং দেশান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

জনশুমারি ও গৃহগণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু অতিসম্প্রতিও দেখা গেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রাক্কলন করে যাচ্ছে। যেমন সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে সংখ্যা বলা হয়েছে দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি। আবার পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালকের এক চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের ১ জুলাই দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৭ জন। আর এখন বিবিএস-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেল জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। সংগত কারণেই এ জনশুমারির ফল নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আমলে নেওয়া দরকার। প্রথমত এটা বিবিএসের প্রাথমিক প্রতিবেদন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস এ শুমারি-পরবর্তী যাচাই জরিপ পরিচালনা করবে। তারপর আগামী তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়, এবার যে আধুনিক প্রযুুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, জনগণনাকারীরা সেসব যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন কি না। এছাড়া জনশুমারিতে ৩৫টির মতো প্রশ্ন ছিল, সেগুলোর কতটির উত্তর নেওয়া হয়েছে সেটিও দেখার বিষয়।