নির্লোভ, পেশাদার সাংবাদিকতার অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশ রূপান্তরের সম্পাদক অমিত হাবিব চলে গেলেন মাত্র ৫৯ বছরে। তার হাত ধরে বাংলাদেশে অনেক পেশাদার সাংবাদিক গড়ে উঠেছেন। আধুনিক, মননশীল, নির্মোহ পেশাদারির এবং নতুন যুগের সাংবাদিকতায় তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। বেঁচে থাকলে দেশের গণমাধ্যমকে আরও অনেক কিছু দিতে পারতেন। তার এই অকাল প্রয়াণ দেশের গণমাধ্যম শিল্পের বড় ক্ষতি। অমিত সম্ভাবনা ও দ্যুতি ছড়ানোর সুযোগ বন্ধ করে অমিত হাবিব চিরবিদায় নিলেন।
শুক্রবার দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিবের জানাজায় অংশ নিতে আসা সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা এসব মন্তব্য করেন।
আড়ালে থাকা সাংবাদিক গড়ার কারিগর অমিত হাবিবের ৩৬ বছরের কলম থেমে গেল গত বৃহস্পতিবার রাতে। রাত ১১টায় রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
তার সহকর্মীরা বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে কিন্তু নিজেকে আড়ালে রাখা, প্রচারবিমুখ মানুষ সত্যিই বিরল। এই বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন অমিত হাবিব। নিজের ছবি পর্যন্ত তুলতে চাইতেন না, প্রচার তো দূরের বিষয়। তার হাতে শত শত প্রদীপ জ্বলেছে, সেই ব্যক্তিরা আজ গণমাধ্যমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে নিজেকে লুকিয়ে রাখা অমিত হাবিবের চিরবিদায় নীরবে হয়নি। অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী, বর্তমান ও সাবেক শুভানুধ্যায়ীদের ফুলেল অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়ে চীর আড়ালে চলে গেলেন তিনি।
শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীর বাংলামোটরে দেশ রূপান্তর প্রাঙ্গণে ভিড় জমায় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ পেশাজীবীরা।
অমিত হাবিবকে শেষবারের জন্য এক নজর দেখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। তখন বিষণ্ন এক শোকাবহ মেঘে গোটা এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
টিভি ক্যামেরা, আলোকচিত্রীর মুহুর্মুহু ফ্লাশে চিরশায়িত অমিত হাবিবের ঠোঁটের নিচে চিরচেনা এক চিলতে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে।
রাজধানীর বাংলামোটরে দেশ রূপান্তর প্রাঙ্গণে অমিত হাবিবের প্রথম জানাজা শেষে রূপায়ণ গ্রুপ ও তার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল, রূপায়ণ গ্রুপের উপদেষ্টা আব্দুল গাফফার ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।
এ ছাড়া জানাজায় অংশ নেন দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক, বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসির প্রধান সম্পাদক ও সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, রূপায়ণ গ্রুপের পরিচালক-কর্মকর্তা, দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অমিত হাবিবের জানাজায় আগে রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল বলেন, অমিত হাবিব সাহসী সম্পাদক ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশ রূপান্তরকে পাঠকপ্রিয় পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, আমরা যারা অমিত হাবিবের সঙ্গে কাজ করেছি তারা তাকে জানি। এমন কী যারা কাজ করেননি তারাও অনেকে অমিত হাবিবের কাজ সম্পর্কে জানতেন। এ রকম একজন সম্পাদক যিনি নেপথ্যে থেকে অসংখ্য সংবাদকর্মী তৈরি করেছেন। দেশ রূপান্তর পরিবারের পক্ষ থেকে শোক ও শ্রদ্ধা জানাই।
সকাল ১১টার দিকে তার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রেসক্লাব চত্বরে পৌঁছায়। ১১টা ৪০ মিনিটে সেখানে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা। জানাজা শেষে বিভিন্ন সাংবাদিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তার কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দ্বিতীয় জানাজার আগে প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মাইনুল আলমের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ করেন রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল।
তিনি বলেন, ‘অমিত হাবিবের মৃত্যুতে রূপায়ণ গ্রুপ ও দেশ রূপান্তর পরিবার শোকাহত। তিনি আমাদের মাঝে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আমরা তার রুহের মাগফিরাত ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, ‘অমিত হাবিব ছিলেন একজন সাহসী সাংবাদিক। জাতি একজন মেধাবী সাংবাদিক হারাল।’
অমিত হাবিবের ভাই ফয়জুল রহমান রাঙা পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের কাছে দোয়া চান।
দেশ রূপান্তরের সম্পাদক অমিত হাবিবের কফিনে জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষে সিনিয়র সহসভাপতি হাসান হাফিজ, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান; আওয়ামী লীগের পক্ষে সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান।
সম্পাদক পরিষদের পক্ষে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন; ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি; দেশ রূপান্তর পরিবার; ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমিতির পক্ষে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ও গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী শোক ও শ্রদ্ধা জানান।
অমিত হাবিবের মরদেহে যুগান্তর পরিবারের পক্ষে শোক শ্রদ্ধা জানায়, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম দৈনিক যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু ও উপসম্পাদক আহমেদ দীপু।
সমকাল পরিবারের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান ও বার্তা সম্পাদক খায়রুল বাশার শামীম।
শোক ও শ্রদ্ধা জানান প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম হাসিব, সাংবাদিক সাজ্জাদ আলম তপু প্রমুখ।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, রাজনৈতিক নেতা এবং তার সহকর্মীরা জানাজায় অংশ নেন।
জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের মসজিদের ইমাম মাওলানা জসিম উদ্দিন।
জাতীয় প্রেসক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা সাড়ে ১২টায় অমিত হাবিবকে বহনকারী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় কাজির বেড় গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।