অমিত আলোর অবেলায় অস্ত

শোক-শ্রদ্ধায় দেশ রূপান্তর সম্পাদককে শেষ বিদায়

নির্লোভ ও পেশাদার সাংবাদিকতার অনন্য ব্যক্তিত্ব দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিব চলে গেলেন মাত্র ৫৯ বছর বয়সে। তার হাত ধরে বাংলাদেশে শত শত পেশাদার সাংবাদিক তৈরি হয়েছেন। আধুনিক, মননশীল ও নতুন যুগের সাংবাদিকতায় তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। বেঁচে থাকলে দেশের গণমাধ্যমকে আরও অনেক কিছু দিতে পারতেন। তার এ অকাল প্রয়াণ দেশের গণমাধ্যম শিল্পের বড় ক্ষতি। সেই অমিত সম্ভাবনা ও দ্যুতি ছড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেল অমিত হাবিবের চিরবিদায়ে।

সবসময় আড়ালে থাকা সাংবাদিক গড়ার কারিগর অমিত হাবিবের ৩৬ বছরের কলম থেমে যায় গত বৃহস্পতিবার রাতে। রাত ১১টায় রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল শুক্রবার অমিত হাবিবকে শেষ বিদায় জানান তার সহকর্মী ও সুহৃদ সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনরা। তার জন্মস্থান ঝিনাইদহের গ্রামে শেষ শয্যায় শায়িত করা হয় তাকে।

এক নিভৃতচারীর ফুলে ফুলে অশ্রুশিক্ত বিদায় : ১৯৮৬ সালে খবর গ্রুপের সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন অমিত হাবিব। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় অমিত হাবিব লেখালেখি করেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিটল ম্যাগাজিনে। সে সময় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার সাপ্তাহিক সাময়িকীগুলোতে তিনি নিয়মিত লিখতেন। এরপর একে একে দৈনিক আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, যায়যায়দিন, সমকাল ও কালের কণ্ঠের মতো পাঠকনন্দিত পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন অমিত হাবিব। সবশেষে ২০১৮ সালে তার নেতৃত্বে প্রকাশিত হয় দেশ রূপান্তর। সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য পত্রিকাটি ইতিমধ্যে পাঠকের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন কিন্তু নিজেকে আড়ালে রাখেন, প্রচারবিমুখ এমন মানুষ সত্যিই বিরল। এই বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন অমিত হাবিব। নিজের ছবি পর্যন্ত তুলতে চাইতেন না, প্রচার তো দূরের কথা। তিনি শত শত প্রদীপ জ্বেলেছেন, যারা আজ গণমাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখা অমিত হাবিবের চিরবিদায় নীরবে হয়নি। অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী, বর্তমান ও সাবেক শুভানুধ্যায়ীদের ফুলেল শ্রদ্ধা অশ্রুসিক্ত চোখের মায়া নিয়ে চির আড়ালে চলে গেলেন অমিত হাবিব।

 গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর বাংলা মোটরে দেশ রূপান্তর কার্যালয় প্রাঙ্গণে ভিড় জমান দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। অমিত হাবিবকে শেষবারের জন্য একনজর দেখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। সে সময় এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়, বিষন্নতায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। টিভি ক্যামেরা, আলোকচিত্রীর মুহুর্মুহু ফ্ল্যাশে যেন অমিত হাবিবের ঠোঁটে চিরচেনা সেই এক চিলতে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে। সারা জীবন সাফল্য দাবি না করা, নিজেকে প্রকাশ করা মানুষটি যেন মৃত্যুর পরে সবার সামনে স্বমহিমায় প্রকাশিত হলেন।

অমিত হাবিবের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতারা, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, সাংবাদিক নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

প্রিয় কর্মস্থলে শেষ বিদায় ও প্রথম জানাজা : রাজধানীর বাংলা মোটরে দেশ রূপান্তর কার্যালয় প্রাঙ্গণে অমিত হাবিবের প্রথম জানাজা হয়। এরপর রূপায়ণ গ্রুপ ও তার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল, কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল, উপদেষ্টা আব্দুল গাফফার ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।

জানাজায় অংশ নেন দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক, বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসির প্রধান সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, রূপায়ণ গ্রুপের পরিচালক-কর্মকর্তা, দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অমিত হাবিবের জানাজার আগে রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল বলেন, ‘অমিত হাবিব সাহসী সম্পাদক ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশ রূপান্তরকে পাঠকপ্রিয় পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।’

দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, ‘আমরা যারা অমিত হাবিবের সঙ্গে কাজ করেছি তারা তাকে জানি। এমনকি যারা কাজ করেননি তারাও অনেকে অমিত হাবিবের কাজ সম্পর্কে জানতেন। এরকম একজন সম্পাদক যিনি নেপথ্যে থেকে অসংখ্য সংবাদকর্মী তৈরি করেছেন। দেশ রূপান্তর পরিবারের পক্ষ থেকে শোক ও শ্রদ্ধা জানাই।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা : বেলা ১১টার দিকে অমিত হাবিবের মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যান প্রেস ক্লাবে পৌঁছায়। ১১টা ৪০ মিনিটে প্রেস ক্লাব চত্বরে তার দ্বিতীয় জানাজা হয়। জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা। জানাজা শেষে সাংবাদিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এর আগে প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মাইনুল আলমের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ করেন রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল। তিনি বলেন, ‘অমিত হাবিবের মৃত্যুতে রূপায়ণ গ্রুপ ও দেশ রূপান্তর পরিবার শোকাহত। তিনি আমাদের মাঝে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আমরা তার রুহের মাগফিরাত ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, ‘অমিত হাবিব ছিলেন একজন সাহসী সাংবাদিক। জাতি একজন মেধাবী সাংবাদিক হারাল।’ অমিত হাবিবের ভাই ফয়জুল হাবিব পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে দোয়া চান।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেশ রূপান্তরের সম্পাদক অমিত হাবিবের কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের পক্ষে সিনিয়র সহসভাপতি হাসান হাফিজ, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান; আওয়ামী লীগের পক্ষে সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান।

সম্পাদক পরিষদের পক্ষে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন; ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি; দেশ রূপান্তর পরিবার; ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমিতির পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

অমিত হাবিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। যুগান্তর পরিবারের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান পত্রিকাটির সম্পাদক সাইফুল আলম, উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু ও আহমেদ দীপু। আরও যারা শ্রদ্ধা জানান তাদের মধ্যে ছিলেন সমকাল পরিবারের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান ও বার্তা সম্পাদক খায়রুল বাশার শামীম, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম হাসিব, সাংবাদিক সাজ্জাদ আলম তপু প্রমুখ।

অমিত হাবিবের জানাজায় আরও অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, রাজনৈতিক নেতা এবং তার সহকর্মীরা।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর সাড়ে ১২টায় অমিত হাবিবকে বহনকারী ফ্রিজার ভ্যান ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাজিরবেড় গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়।

তৃতীয় জানাজা ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবে : আমাদের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিবের তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাব চত্বরে। তার জানাজায় অংশ নেন ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সেলিম রেজা, ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবের সভাপতি এম রায়হান, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান টিপু, ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল মাহমুদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজাম জোয়ারদার বাবলু, ঝিনাইদহ থানার ওসি শেখ মো. সোহেল রানা ও ঝিনাইদহের স্থানীয় সাংবাদিকরা। এছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এরপর তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিকেল ৫টার পরে অমিত হাবিবের মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যান তার নিজের গ্রাম কাজিরবেড়ের উদ্দেশে রওনা দেয়।

চতুর্থ জানাজা ও দাফন : দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিবের চতুর্থ জানাজা রাত ৮টায় কাজিরবেড় গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের কৃতী এ সন্তানের জানাজায় অংশ নেয় হাজারো মানুষ।

এর আগে বক্তব্য রাখেন ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল আযম খান চঞ্চল। এ সময় তিনি অমিত হাবিবের নামে তার গ্রামের একটি সড়কের নামকরণের ঘোষণা দেন।

এছাড়া বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ ও সাধারণ সম্পাদক মীর সুলতানুজ্জামান লিটন, অমিত হাবিবের ভাই ফয়জুল হাবিব, বাল্যবন্ধু প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম ও ঝিনাইদহ সাংবাদিক ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা কিরণ, রূপায়ণ গ্রুপের কো-অর্ডিনেটর মেহেদী হাসান।

জানাজায় ইমামতি করেন অমিত হাবিবের চাচা খন্দকার আনারুল হক। সঞ্চালনা করেন মীর সুলতানুজ্জামান লিটন। পরে রাত সাড়ে ৮টায় বাবা-মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় অমিত হাবিবকে।

গুণী সাংবাদিক অমিত হাবিব ১৯৬৩ সালের ২৩ অক্টোবর ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাজিরবেড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খন্দকার ওয়াহেদুল হক। মায়ের নাম শামসুন নাহার বকুল। দুজনই প্রয়াত হয়েছেন। তার বাবা মহেশপুর উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওয়াহেদুল হকের তিন সন্তানের মধ্যে অমিত হাবিব ছিলেন সবার বড়। তার দুই ভাই ফয়জুল হাবিব ও মেহেদি হাসান।