চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ১২ নম্বর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাব রেজিস্ট্রার বাড়ির হাজী মোহাম্মদ ইউসুপের ছেলে মাইক্রোবাস চালক গোলাম মোস্তফা নিরু। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তার বয়স ২৬ বছর। গাড়ি চালিয়ে সংসার পরিচালনা করতেন। প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবারও তিনি মাইক্রোবাস নিয়ে গ্যারেজ থেকে বের হয়েছিলেন ভাড়া নিয়ে।
শুক্রবারের ভাড়ায় তার বাড়তি আনন্দ ছিল। কারণ তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাবে পর্যটন কেন্দ্রে। ভাড়ার সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রে ঘোরার আনন্দও উপভোগ করবে। তখন কি তিনি জানতেন আর বাড়ি এসে তার তিন বছরের ছোট সোনামণি রুহিকে দেখতে পারবেন না? তার শিশু কন্যার জন্য পর্যটনকেন্দ্র থেকে খেলনা কিনে ফেরা হবে না? ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে তার নির্মম মৃত্যু হবে?
কিন্তু অসাবধানতা আর অব্যবস্থাপনার বলী হতে হলো তিনিসহ ১১ জনকে। লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলেন নিরু।
শনিবার তার বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক। তার স্ত্রী লায়লা আকতারের গগনবিদারী আহাজারিতে এলাকায় বিষাদ নেমে আসে। নিরুর ছোট মেয়েটি মায়ের কান্না দেখে হতবাক হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না কোথায় কী হয়েছে। মায়ের কান্না দেখে নিহত নিরুর বাবা মোহাম্মদ ইউসুপ দৌড়ে এসে নাতনিকে কোলে নিয়ে নিজে ও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি শুধু চিৎকার করে বলছেন বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলে আদরের নাতনিকে কি বুঝ দেবেন।
শনিবার সকাল ১০টায় উপজেলার ১২ নম্বর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের যুগিরহাট এলাকায় ছমদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মোস্তাফা নিরু, সামিরুল ইসলাম হাসান, রিদুয়ান চৌধুরী, ইকবাল হোসেন, মারুফ ও জিয়াউল হক সজীবের জানাজা শেষে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহতদের জানাজায় ইমামতি করেন ষোলোশহর জামিয়া আহমেদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ অছি উর রহমান। এ সময় হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া উপস্থিত ছিলেন।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শাহিদুল আলম শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনায় নিহতদের দাফন কাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের জন্য নগদ ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যথা সম্ভব দ্রুত এ সহায়তার অর্থ তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, হাটহাজারী উপজেলার ১২ নম্বর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের যুগীরহাট বাজারে শেখ ফরিদ মার্কেটে আর এন জে নামে একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে। এই কোচিং সেন্টারের কয়েক জন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং ক্লাস পড়ান। কোচিং সেন্টারের শিক্ষকেরা গত শুক্রবার এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে মিরসরাই উপজেলার খইয়াছড়ার ঝরনা দেখতে যান। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে উক্তস্থানে পৌঁছালে রেল ক্রসিং অতিক্রম করার সময় মহানগর প্রভাতির ট্রেনের ধাক্কায় শিক্ষক / শিক্ষার্থী বহনকারী গাড়িটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। এ সময় গাড়িতে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও চালকসহ ১১ জন ঘটনাস্থলে নিহত হন।