ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় শাড়ি ও স্লিভলেস ব্লাউজ পরা ছবি তোলার সময় ঢাবির শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্তৃক এক মডেল ও ফটোগ্রাফার হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশের টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আসলেই কি ঢাবিতে এ রকম ঘটনা ঘটেছে, নাকি সামান্য কিছুকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে? অনেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ছবি তোলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তবে, স্লিভলেস ব্লাউজ পরে ছবি তোলাকে পর্নোগ্রাফি আইনের আওতায় বলা ঢাবি শিক্ষিকার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
জানা যায়, মডেল ও ফটোগ্রাফার দুজনই একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় ছবি তুলছিলেন।
মডেল স্লিভলেস (হাতা-কাটা) একটি ব্লাউজ আর শাড়ি পরা ছিল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এ কে এম মাহবুব হাসান তাদের দেখতে পেয়ে জানতে চান, তারা ঢাবির শিক্ষার্থী কিনা।
তারা ঢাবির শিক্ষার্থী না জানার পর ডিন একজন দারোয়ানকে ওই মডেল ও ফটোগ্রাফারকে তার রুমে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেন।
ডিনের রুমে আরও দুই শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন। তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে, তাদের একজন মডেল ও ফটোগ্রাফারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এ রকম ছবি তোলার সাহস তোমরা কি করে পেলে। তোমরা কি জানো এটা পর্নোগ্রাফি আইনের মধ্যে পড়ে!’
সেই শিক্ষিকা তাদের আমাদের গার্ডিয়ানের ফোন নম্বর লিখতে বাধ্য করেন। এরপর তিনি ফটোগ্রাফারের মাকে কল দিয়ে বলেন, ‘আপনি কি হাউস ওয়াইফ নাকি চাকরি করেন? আপনার ছেলে কোথায় কি করছে তা কি আপনি জানেন না? আপনি জানেন আপনার ছেলে কি রকম ছবি তুলছিল? আপনার ছেলে জামা কাপড় ছাড়া ড্রেসলেস ন্যুড মেয়ের ছবি তুলছিল।’
এ সময় ফটোগ্রাফার তার মডেল ড্রেসলেস ছিল না, স্লিভলেস পরে ছবি তুলছিল জানালে ওই শিক্ষিকা ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘তোমার মতো পুঁচকে ছেলের কাছ থেকে এখন আমার কোনটা কি তা বুঝতে হবে? ন্যুড আর আনন্যুড এর মাঝে কি আমরা পার্থক্য বুঝি না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কি আমরা ঘাস কেটে হয়েছি?
এ সময় ফটোগ্রাফার একাদশের কোন বিভাগে পড়েন জানতে চান ওই শিক্ষিকা। মানবিক বিভাগের ছাত্র জানার পর শিক্ষিকা বলেন, ‘এই কারণেই তো তুমি একটা গর্ধব, ব্রেইন বলতে কোন কিছু নেই। এই জন্যই আর্টসে পড়। পড়াশোনায় মন না দিয়ে এসব অশ্লীল কাজ করে বেড়াও। তোমার কি মনে হয় বাঙালি কালচার এগুলা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলা করা এলাউড? রাস্তা থেকে উঠে আসা ছেলে, তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে ঠিক-ভুল বোঝানোর?
পরে মেয়ের বাবাকে ফোন দেওয়া হয়। মেয়ের বাবাকে ফোন করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে আসতে বলা হয়।
এর মধ্যে ওই শিক্ষিকা ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত করার কথা বলেন। তারা প্রক্টরকে ডেকে আনেন। প্রক্টর বলে পরিচয় দিলেও পরবর্তীতে জানা যায় তিনি ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রক্টর।
মডেলের বাবা সেখানে পৌঁছালে ওই শিক্ষিকা তাকে বলেন, ‘আপনার মেয়ে কি রকম লেংটা হয়ে ছবি তুলে তা কি আপনারা জানেন? কিসের বাবা হয়েছেন আপনি? যদি এতটুকু শিক্ষা দিতে না পারলেন? এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোন একটা অঘটন ঘটে যেত, তার দায়িত্ব কার হতো? আর এই ছেলেটা (ফটোগ্রাফার) তো প্রচণ্ড শয়তান। আপনার মেয়ে কি সব ছেলেদের সাথে মিশে? পরে আপনার মুখ কালো করে যখন ঘরে আসবে তখন বুঝবেন।’
পরবর্তীতে মেয়ের বাবা যখন ছবি দেখতে চান, তখন তারা ছবি দেখাতে অস্বীকার করে। তারা বলে যে এসব ছবি দেখানোর অযোগ্যা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এ কে এম মাহবুব হাসান বলেছেন, আমি দেখলাম ওরা ছবি তুলছে কিন্তু ওই ছবিগুলো আমাদের ক্যাম্পাসের সাথে যায় না। আমি বললাম, তোমরা কি আমাদের ক্যাম্পাসের? বলল না। তখন বললাম তোমরা আমার সাথে আস। যেহেতু তাদের মধ্যে একজন মেয়ে ছিল, এই জন্য আমি একজন মহিলা সহকর্মীকে ডাকলাম। সেই ম্যাডামকে বললাম, ওরা কেমন ছবি তুলেছেন একটু আপনি দেখেন। তিনি ছবি দেখে অবাক হলেন। পরে ম্যাডাম তাদের পরিচয় জানতে চাচ্ছিলে, এর মধ্যে ছেলেটা বারবার ম্যাডামের সাথে তর্ক করছিল। যখন কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছিল না তখন একজন সহকারী প্রক্টরকে ফোন করে বিষয়টা জানালাম।
অধ্যাপক এ কে এম মাহবুব হাসান বলেন, পরে ওই সহকারী প্রক্টর ঘটনা শুনলেন এবং ছবি দেখলেন। পরে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, তাদের অভিভাবকদের ডেকে এনে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলি। ফোন করে তখন আমরা তাদের অভিভাবকদের আসতে বলি। অভিভাবকেরা আসলে তাদের বললাম, ওরা এখনো বয়সে ছোট ছেলেমেয়ে। এ জন্য ওদের বিষয়ে আপনাদের আরও সচেতন হলে ভালো হয়। তখন অভিভাবকেরা আমাদের খুবই প্রশংসা করে বলেছেন, স্যার আমাদের সন্তানদের বিষয়ে সচেতন করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। কিন্তু এখন জানতে পারছি বিষয়টা অন্যভাবে ছড়ানো হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
ওই ঘটনায় উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি এক ঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে যাই। তাদের অভিভাবকদের ডেকে আনা হয়। অভিভাবকদের সন্তানের লেখা-পড়ার দিকে খেয়াল রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছি আমরা। তাদেরকে চা-কফি খাওয়ার জন্যও বলেছি। আমি যাওয়ার পর তাদের সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি ।