পেকুয়ায় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি!

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রোগ্রাম ফর হেল্পলেস অ্যান্ড লেগড সোসাইটিস (পালস) এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিয়োগ উঠেছে।

পেকুয়া উপজেলায় কাগজে-কলমে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এনজিও পালস।এছাড়াও জেলায় কর্মরত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক আবদুল হামিদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির অভাবে এনজিও পালস পেকুয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।  
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কর্তৃক মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা) বাস্তবায়নের জন্য সরকার ১৫ থেকে ৪৫ বয়সী নিরক্ষরদের লোকদের মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে শতাধিক উপজেলায় ৬ মাস মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটি ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর পেকুয়া উপজেলায় শুরু হয়ে চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পটি শেষ হয়। সেই লক্ষ্যে এনজিও পালস পেকুয়া উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর এনজিও পালস পেকুয়া উপজেলার সবকটি ইউনিয়নে ৩০০ শিখন কেন্দ্র কাগজে-কলমে স্থাপন করে।এনজিও পালস ৬০০ শিক্ষক ও ১৫ সুপারভাইজার নিয়োগ করে। শিক্ষকদের মাসিক সম্মানি ২ হাজার ৪’শ টাকা। আর সুপারভাইজারদের মাসিক সম্মানি ২ হাজার ৫’শ টাকা। ৩০০ শিখন কেন্দ্রের মধ্যে ১৫০টি শিখন কেন্দ্র ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয় কাগজে-কলমে। এসব শিখন কেন্দ্রের ভাড়া প্রতিটি ৫’শ টাকা। প্রতিটি কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ব্যয় মাসিক ১৫০ টাকা। প্রতিটি শিখন কেন্দ্রের মাসিক জ্বালানি খরচ দেখানো হয় ৫’শ টাকা। গত মাসের জুন মাসে ৬ মাস মেয়াদি ওই প্রকল্প শেষ হয়েছে। কিন্তু এনজিও পালস পেকুয়ায় ৩০০ কেন্দ্রের ৬০০ শিক্ষকের অধিকাংশ শিক্ষককে মাসিক সম্মানির টাকা পরিশোধ করেনি। গত মার্চ মাসে শিক্ষকদের জনপ্রতি ৭ হাজার ২’শ টাকা করে বিতরণ করা হয়। সেখান থেকে আবার বিভিন্ন ইউনিয়নের সুপারভাইজাররা শিক্ষকদের কাছ থেকে ২-৩ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেন। 

জানা গেছে, এনজিও পালস ইতিমধ্যেই মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের ঢাকার প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে পেকুয়া উপজেলায় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচার দাখিল করে তিন মাসের শিখন কেন্দ্রের ঘর ভাড়া, জ্বালানি ব্যয় ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা বিলের বরাদ্দও উত্তোলন করে নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে অ্যাকাউন্ট পে-চেকের মাধ্যমে এনজিও পালসকে উক্ত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এনজিও পালস ১৫০টি শিখন কেন্দ্রের প্রতিটি ভাড়া বাবদ ৫’শ টাকা করে তিন মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ শিখন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাবদ প্রতিটি ১৫০ টাকা করে তিন মাসের ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ৩০০ শিখন কেন্দ্রের প্রতিটির জ্বালানি খরচের বিল বাবদ প্রতিটি কেন্দ্র ৫’শ টাকা তিন মাসের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করে নেন। এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এসব বিল পেয়েছে কিনা জানা যায়নি। তিন মাসের ঘরভাড়া, জ্বালানি বিল, ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা বিল পেলেও এক পয়সাও বিতরণ করা হয়নি। এরপর একইভাবে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসের বিলও উত্তোলন করে লোপাটের সমস্ত আয়োজনও সম্পন্ন করেছে এনজিও পালস।
  
পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক শিখন কেন্দ্রের শিক্ষক ও সুপারভাইজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ৬ মাস মেয়াদি প্রকল্প শেষ হয়। কিন্তু ৩০০ শিখন কেন্দ্রের শিক্ষকদের এনজিও পালস সম্মানি প্রদান করেছে মাত্র তিন মাসের। কিছু কিছু ইউনিয়নের শিক্ষকদের বেতন ৩ মাসের প্রদান করা হয়েছে। তবে ১৫০টি কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে দেখানো হলেও কোন কেন্দ্রের মালিককে কোন ভাড়ার টাকাও প্রদান করেনি এনজিও পালস। এছাড়াও জ্বালানি বাবদ প্রতিটি কেন্দ্রে মাসিক ৫’শ টাকা করে সরকারিভাবে বরাদ্দ থাকলেও এনজিও পালস কোন শিখন কেন্দ্রে জ্বালানি বিলের টাকা প্রদান করেনি। প্রতিটি শিখনকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা বিল বাবদ মাসিক ১৫০ টাকা করে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কোন কেন্দ্রেই ব্যবস্থাপনা বিল দেওয়া হয়নি। 

এছাড়া পেকুয়া উপজেলার ৩০০ শিখন কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের মাঝে নিম্নমানের শিক্ষা উপকরণও বিতরণ করা হয়েছে। নিম্নমানের অনুশীলন খাতা, বলপেন কলম, চক, ডাস্টার, ব্লাকবোর্ড, সাইনবোর্ড, নিম্নমানের মাদুর দেওয়া হয়েছিল। এসব শিক্ষা উপকরণ ক্রয় করার জন্য মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করা হলেও নিম্নমানের উপকরণ ক্রয় করে। পেকুয়ায় ৩০০ শিখন কেন্দ্রে বিতরণ করে বরাদ্দের সিংহভাগ লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় সচেতন সমাজ।
       
এভাবে পেকুয়া উপজেলায় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের লাখ লাখ টাকা নয়-ছয় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে এনজিও পালসের বিরুদ্ধে।ওই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট জেলার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালকসহ মিলেমিশে প্রকল্পের বরাদ্দ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। 

এ বিষয়ে এনজিও পালসের পেকুয়া উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রোগ্রাম অফিসার আবদুল হামিদ জানিয়েছেন, মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প বাস্তবায়নে এনজিও পালস কোন ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি করেনি। শিক্ষকদের বেতন ভাতাও যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু কিছু ইউনিয়নে সমস্যা হয়েছে। শিখন কেন্দ্রের ভাড়া, জ্বালানি বিল ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা বিল কেন প্রদান করা হয়নি, জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি।
   
পেকুয়ায় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পে এনজিও পালস কর্তৃক ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কক্সবাজার জেলার সহকারী পরিচালক মো. আবদুল হামিদ জানান, অনিমের বিষয়টি তিনি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।