প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির শহর ক্রিভি রিহকে লক্ষ্য করে রুশ বাহিনী হামলা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের সরকারি সূত্র। সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি যত ঘনিয়ে আসছে ততই ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন তীব্র হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রিভি রিহ শহরের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে হামলা বাড়িয়েছে রুশ বাহিনী। ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপসহ ব্যারেল এবং রকেট হামলা চলছে অহরহ।
দোনেৎস্ক অঞ্চলের গভর্নর পাভলো কিরিলেনকো জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘন্টায় বাখমুত, মেরিঙ্কা এবং শেভচেঙ্কোতে তিনজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে এবং পাঁচজন আহত হয়েছে।
মাইকোলাইভ, খারকিভ, ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলের গভর্নররা জানিয়েছেন, তাদের অঞ্চলেও রাতাভর গোলাবর্ষণ করা হয়েছে এবং বেসামরিক অবকাঠামো, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ওলেকসি আরেস্তোভিচ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খারকিভ, দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কে আমাদের উপর সামরিক চাপ সৃষ্টি করাই এখন রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্য’।
এর আগে, ইউক্রেন বলেছিল যে, রাশিয়া ক্রিভি রিহের দিকে একটি স্ট্রাইক গ্রুপ তৈরি করা শুরু করেছে এবং এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ইউক্রেনে নতুন আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
ক্রিভি রিহ একটি ইস্পাত উৎপাদনকারী শহর। জেলেনস্কি এই শহরেই বড় হয়েছেন। শহরটি ইউক্রেনের দক্ষিণের ফ্রন্টলাইন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এর মধ্যেই বুধবার (৩ আগস্ট) একইসঙ্গে মার্কিন সিনেট এবং ইতালির পার্লামেন্টে ন্যাটোর নতুন সদস্য হিসেবে ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের অন্তর্ভুক্তি অনুমোদন পেয়েছে।
এদিকে, সিনেটে ন্যাটোর সদস্য বাড়ানোর প্রস্তাবে রিপাবলিকান-ডেমোক্রেট ঐকমত্যকে এক বিরল নজির হিসবে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
ওদিকে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়া বারবার ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনকে ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে সতর্ক কর আসছে।
যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা চান জেলেনস্কি, নীরব চীন
হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, তার দেশে রুশ আগ্রাসন বন্ধের ব্যাপারে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান।
এই যুদ্ধ বন্ধে শি জিনপিং-ই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন জেলেনস্কি। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র চীন। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ‘ভেটো’ ক্ষমতা নিয়ে তারা যুদ্ধ বন্ধে কৌশলগত দিক থেকেও সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
তবে, প্রায় ছয় মাস আগে রাশিয়া যখন বিশেষ সামরিক অভিযানের নামে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় তখনই ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চীন এখনো কোনো সাড়া দেয়নি।
ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা একে অযাচিত আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করলেও চীন বলে আসছিল, ইউরোপে ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণসহ নানামুখী উস্কানিতে রাশিয়া এই হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছে।
এর আগে, জুন মাসে এক সম্মেলনে অংশ নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনে চলমান সহিংসতাকে বিশ্ব মানবতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করলেও যুদ্ধ বন্ধের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেননি।
তবে, চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া বলছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপকালে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিরাপত্তা অটুট রাখতে চীনা সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শি জিন পিং। পাশাপাশি, ইউক্রেনের সংকট নিরসনে সবপক্ষের অংশগ্রহণে যথাযথ উপায় খুঁজে বের করতে হবে এবং এক্ষেত্রে চীন তার করণীয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শি জি পিং।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন আক্রমণের শুরু থেকে অন্তত পাঁচ হাজার ৩৫২ জন বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। উদ্বাস্তু হয়েছেন এক কোটি ২০ লাখ মানুষ। ‘পৃথিবীর রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে খ্যাত ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন, সংগ্রহ, সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, যে কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক খাদ্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
ওদিকে, প্রাক্তন জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার বলেছিলেন রাশিয়া আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের একটি সমাধান চায়। কিন্তু ইউক্রেন সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছে রাশিয়া যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং সৈন্য প্রত্যাহার করলেই শুধু আলোচনা সম্ভব।