বক-পানকৌড়ির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ‘বলিহরপুর’

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বলিহরপুর গ্রামটি বক ও পানকৌড়ির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও গ্রামটি তেমন কেউ চিনত না। কিন্তু বক-পানকৌড়িরা গ্রামটিকে পাখিপ্রেমী তথা সবার কাছেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বসবাসকারী মানুষজন এ গ্রামে যতটা নিরাপদ, বক আর পানকৌড়িরা বলা যায় তার চেয়েও নিরাপদ। পাঁচ-ছয় বছর ধরে এ গ্রামে অতিথি পাখি হিসেবে বক ও পানকৌড়ির আগমন ঘটে। গ্রামের মানুষজন পাখিগুলোকে নিজেদের সন্তানের মতোই আগলে রাখে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে হাজার হাজার বক ও পানকৌড়ি এ গ্রামে এসে প্রজনন মৌসুম পার করে বাচ্চা জন্ম দেয়। বাচ্চাগুলো বড় হয়ে উড়তে শিখলেই ভাদ্র মাসের শেষের দিকে আবার ফেরত চলে যায়।

দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই গ্রামটির অবস্থান। সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের মনমোহন রায়ের বাঁশবাগানে বক আর পানকৌড়ির কিচিরমিচির শব্দ। মনমোহন রায় বলেন, ‘এখানে কয়েক হাজার বক ও পানকৌড়ি আসে। আমার ক্ষতি হলেও কোনো আক্ষেপ নাই। কারণ দেশের এত বাঁশবাগান থাকতে তারা আমার বাগান পছন্দ করেছে। এতে আমি খুশি। অনেক সময় বক ও পানকৌড়ির বাচ্চা নিচে পড়ে যায়। আমাদের গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের আবার বাঁশবাগানের উপরে ওঠায় দেয়। গ্রামের কোনো মানুষ তাদের ক্ষতি করে না।’

গ্রামের বাসিন্দা ঊষা রানী বলেন, ‘বক ও পানকৌড়ি আমরা নিজেদের সন্তানের মতো দেখাশোনা করি। এই গ্রামের বাইরের কেউ আসলে তাদের আগেই সাবধান করে দেই। যাতে করে তারা বক ও পানকৌড়ির কোনো ক্ষতি না করে। আমাদের খাবার থেকে বক ও পানকৌড়িদের খেতেও দেই।’

গ্রামের আরেক বাসিন্দা সুভাষ রায় বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনে তাদের কিচিরমিচির দেখতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু অনেক সময় মা বক বাঁশবাগানে বাচ্চা রেখে খাদ্য সংগ্রহ করতে গেলে, অনেকে সেই মা বককে বিভিন্ন ফাঁদে আটকে খেয়ে ফেলে। বর্তমানে এখানে কয়েকটা মা আছে। কিন্তু বাচ্চা আছে বহু। তারা উড়তে শিখলে অন্য জায়গায় চলে যাবে। তাদের খাদ্য হিসেবে মাছের ব্যবস্থা করার জন্য আমরা উপজেলা পরিষদে জানিয়েছিলাম। তারা আগামী বছর থেকে মাছের ব্যবস্থা করবে বলে আমাদের জানিয়েছে।’

উপজেলার উত্তর শিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পাখিপ্রেমী আনোয়ার সাদাত মন্ডল বলেন, ‘আমি প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় পাখিদের মনোরম পরিবেশ দেখতে পাই। বক ও পানকৌড়ি প্রতি বছর এ সময় এখানে আবাসস্থল গড়ে তোলে। কিন্তু এখানে পাখিদের খাবারের জন্য কোনো উপযুক্ত পুকুর নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এখানে পাখিদের মাছের জন্য পুকুরের ব্যবস্থা করা হলে পাখিদের আগমন আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বক ও পানকৌড়ি শুধু আমাদের আনন্দ দেয়, তা-ই নয়। তারা কৃষিতে অনেক অবদান রাখছে। তারা ক্ষেতে গিয়ে পোকামাড়ক খেয়ে ফেলে। এতে ফসলের উৎপাদন অনেকটা বেড়ে যায়। তাই আমি এ গ্রামটি পাখিদের অভয়াশ্রম ঘোষণার দাবি জানাই।’