সাদা বলে এতদিন চিন্তা ছিল এক পথ নিয়ে। এবার যোগ হলো আরেকটি। রব ছিল টি-টোয়েন্টিতে পারে না দল। এই ফরম্যাটে যত দ্রুত সম্ভব উন্নতি করতে হবে। তার জন্য নানা পরিকল্পনা শেষে ঠিক হলো পাওয়ার ক্রিকেটে যাওয়া যাবে না, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মধ্যে নেই। তাই স্মার্ট ক্রিকেটে ওভারপ্রতি বেশি রান তোলায় মনোযোগী হতে হবে। ওয়ানডেটা ঠিকঠাক ছিল, টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের সাফল্যে তৃপ্তির ঢেঁকুর অনেক। কিন্তু হুট করে গুবলেট সব। জিম্বাবুয়ের মতো দলের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হেরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পুরোপুরি বিপদে বাংলাদেশ। এখন নতুন করে ভেঙে-গড়ে সব শুরু করতে হবে। টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে, মানে সাদা বলে এখন উভয় পথে উভয় সংকটে বাংলাদেশ ক্রিকেট।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল ব্যাটিং। পুরো আসরে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ক্লিক করতে পারেননি। অথচ তার আগে দুটি সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে মিরপুরের স্পিন ঘূর্ণিতে হারায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে দুবাই-শারজাহ-আবুধাবিতে সব স্পোর্টিং পিচে গিয়ে অনভ্যস্ততায় পড়তে হয়েছিল। ফলাফল চূড়ান্ত ব্যর্থতা। ভালো উইকেটে নিজেদের দুর্বলতা বুঝতে পারে বাংলাদেশ। আসরের শেষদিকে নির্বাচক হাবিবুল বাশার দেশে ভালো উইকেটে খেলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সেই অভ্যস্ততা না থাকায় বড় টুর্নামেন্টে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে দল। ঠিক একই অবস্থা এবারের জিম্বাবুয়ে সফরে।
জিম্বাবুয়ে এবার দারুণ পরিকল্পনা করেছে। স্পিন সহায়ক উইকেট বানানোর পথে হাঁটেনি। বরং ব্যাটিং উইকেট করে বাংলাদেশকে আটকাতে চেয়েছে। ভাগ্যও সঙ্গ দিয়েছে তাদের। দুটো ম্যাচেই টস জিতে পরে ব্যাট করেছে জিম্বাবুয়ে। ব্যাটিং উইকেটগুলোতে সময়ের সঙ্গে ব্যাট করা অনেকটাই সহজ হয়। তার ওপর প্রথম ম্যাচে ১৯২ রানের অবিশ্বাস্য জুটিতে জয় দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। ঠিক সেখান থেকে উজ্জীবিত হয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেও ইনিংসের মাঝে ২০১ রানের জুটি উপহার দিল তারা। বাংলাদেশ ঠিক এই জায়গাতেই ব্যর্থ।
ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো উইকেটে খেলার যে কথা হাবিবুল বাশার বলেছিলেন তার চেষ্টা বিসিবি করেছে। বিশ্বকাপের পর গত আফগানিস্তান সিরিজ চট্টগ্রামে আয়োজন করেছে। দেশে একমাত্র চট্টগ্রামেই ব্যাটিং সহায়ক উইকেট। তবুও তিন ওয়ানডের মাত্র এক ম্যাচে তিনশো ছাড়ানো স্কোর করে বাংলাদেশ। অপর ম্যাচে ২১৯ রানের লক্ষ্য পেয়েও হারতে বসেছিল। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সেঞ্চুরিয়নে তিনশো ছাড়ানো স্কোর আরেকবার করেছিল বাংলাদেশ। এর বাইরে গত ৫ সিরিজ ধরেই বোলিং শক্তির ওপর নির্ভর করেই জিততে হচ্ছে তামিমদের।
ব্যাটিং সহায়ক বা স্পোর্টিং উইকেট না খেলায় নিজেদের বুঝল বাংলাদেশ এই সিরিজ দিয়ে। অনভ্যস্ততার কারণে বড় জুটি তৈরি করা যাচ্ছে না প্রয়োজনের সময়। স্পিন সহায়ক উইকেটে বড় শট না খেলার ভয় কাজ করছে ব্যাটারদের মধ্যে। তাই জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাররা দারুণ সাহসের সঙ্গে ছক্কা-চার মারছেন। অথচ বাংলাদেশ ব্যাটাররা আটকে যাচ্ছেন। সবশেষ ম্যাচে ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ৮৪ রান করা রেজিস চাকাভা ৭৫ বলে ১০২ করে দেশের দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান হয়ে গেলেন। আবার ওভারপ্রতি রান নেওয়ার দিকেও পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। করোনার আগে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে শুরুর ৩৫ ওভারে দ্রুত দুইশোতে পৌঁছে শেষ ১০ ওভার নিয়ে চিন্তায় ছিল। এখন মাঝ ওভারগুলোতেও পিছিয়ে পড়ছে দল। গত ম্যাচে জিম্বাবুয়ের ২৮ থেকে ৩৩ ওভারে রান উঠেছে ৫৩। একই সময়ে বাংলাদেশ করতে পেরেছে মাত্র ১৪।
ভালো উইকেটে কীভাবে খেলতে হয় তা এবার জিম্বাবুয়ের কাছ থেকে শিখল বাংলাদেশ। দলের কোচ রাসেল ডমিঙ্গো তো স্বীকার করে নিলেন এভাবে, ‘জিম্বাবুয়ে চারটা সেঞ্চুরি করেছে আমরা একটাও করিনি। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য ভালো একটা শিক্ষা এটা। আমাদের কোচদের জন্য ক্রিকেটারদের জন্যও। বিশ্বকাপ এখনো দেড় বছর দূরে আছে। ভাগ্য ভালো এই সিরিজটায় কোনো পয়েন্ট নেই। এটা আমাদের সবার জন্যই বড় শিক্ষার।’
এমন উইকেটে বাংলাদেশ বোলারদেরও সমস্যা হচ্ছে। ব্যাটারদের মতো অভ্যস্ততা না থাকায় চাপ নিতে পারছেন না তারা। রাসেল ডমিঙ্গো বোলারদের বিষয়টি টেনে বলেন, ‘বিষয়টা চাপ সামলাতে না পারার। ওরা ইয়র্কার বল করতে পারে। যখন ৫০ রানে ৩ উইকেট থাকে তখন করে। কিন্তু যখন ১৮০ রানে ৩ উইকেট থাকে তখন পারছে না। চাপে পড়ে যাচ্ছে। সঠিক সময়ে সঠিক বলটা করার আত্মবিশ্বাস আনতে হবে। এখন ওরা ভুল বল ভুল সময়ে করছে। ওরা লং অন-অফ তুলে নিয়ে সেøা বল করছে। আবার থার্ড ম্যান সামনে এনে শর্ট পিচ বল করছে। এটা তো বোলারদের বুঝতে হবে। চাপের সময়ে কী করতে হবে তা জানা উচিত।’
উভয়সংকটটা এখানেই। আগস্টের শেষে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপ আরব আমিরাত। এক মাস পর এই ফরম্যাটের বিশ্বকাপ। টি-টোয়েন্টিতে উন্নতির পরিকল্পনা নিয়ে এতদিন মাথা ঘামালেই হচ্ছিল। এবার ২০২৩ বিশ্বকাপের জন্যও আলাদা করে ভাবতে হচ্ছে বাংলাদেশের ‘প্রিয়’ ওয়ানডে ফরম্যাট নিয়ে। সেই পরিকল্পনা আগামী ২০ আগস্ট হবে কোচদের সঙ্গে। কাল ক্রিকেট অপারেশন্স প্রধান জালাল ইউনুস জানালেন সফর শেষে কোচদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দলের সঙ্গেই দেশে ফিরবেন তারা। ২০ তারিখ কোচদের নিয়ে এশিয়া-বিশ্বকাপসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বসবে বোর্ড। তাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘উভয় সংকট’ মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ আসে সেটাই দেখার।