প্রাচীন মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান। ইতিহাসের অন্যতম দুর্ধর্ষ এই বিজেতা ঘোড়ায় চড়ে জয় করেছিলেন প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ বর্গমাইলের বিশাল এক অঞ্চল। ক্ষমতালিপ্সু এই শাসকের শাসনামল ছিল ধ্বংস, অপহরণ ও হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ভালোবাসায় পূর্ণ। তার শাসনের ৮শ’ বছর পরও জানা যায়নি তার সমাধিটি কোথায়? লিখেছেন নাসরিন শওকত
শেষকৃত্য ও কিংবদন্তি
চেঙ্গিস খানের মৃত্যুকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত ঘোড়ার ওপর থেকে পড়ে গিয়ে নয়তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত হওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল। তার সমাধিক্ষেত্রের রহস্যের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সম্ভবত সমাধিটিকে কেউ খুঁজে পাক তা নিজেই তিনি চাননি।
প্রচলিত আছে, তার শেষকৃত্য খুবই গোপনে করার জন্য তিনি খুবই সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তার মরদেহকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সেনাবাহিনীরও ব্যবস্থা করেছিলেন। সে সময় শোকগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার মরদেহকে তার জন্মভূমি মঙ্গোলিয়ায় নিয়ে ফিরছিল। তার মরদেহ বা সমাধির পথ যেন কেউ খুঁজে না পায়, সেজন্য তারা পথে যাকেই পাচ্ছিল তাকেই হত্যা করছিল। তাকে সমাহিত করা শেষ হলে শেষ্যকৃত্যে যোগ দেওয়া সেনা সদস্যদের প্রত্যেকই আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
চেঙ্গিস খানের কাছে মৃত্যুর পর তার সমাধির স্থান নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি উত্তর চীনে মারা গিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান খেন্তি পর্বতমালার বুরখান খালদুন চূড়ায় তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। আরও প্রচলিত আছে, এরপরে ১ হাজারটা ঘোড়া চেঙ্গিস খানের সমাধিস্থলকে পদদলিত করে সব চিহ্ন ধ্বংস করে। ইতিহাসবিদ মার্কো পোলোর মতে, সে সময় তার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়া ২ হাজার ক্রীতদাসকেও হত্যা করা হয়েছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তার মৃত্যুর ৮শ’ বছর ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গেছে! কিন্তু আজও পর্যন্ত কেউ তার সমাধিসৌধকে আবিষ্কার করতে পারেনি। এমনকি তার সমাধির এলাকাও প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য হয়েই থেকে গেছে।
খেন্তি পর্বত
কিংবদন্তিগুলো কি সত্যি? চেঙ্গিস খানের হারিয়ে যাওয়া সমাধিটি কি খেন্তি পর্বতের একটি নির্দিষ্ট চূড়ার ওপরে রয়েছে? একাধিক গবেষক ও মঙ্গোল সরকার উভয়ের মতেই প্রশ্ন হয়ে থাকা এই তত্ত্বই প্রচলিত। চেঙ্গিস খান তার অনন্ত ঘুমের স্থান হিসেবে এই পর্বতকেই বেছে নিয়েছিলেন কারণ এর সঙ্গে তার জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনার সংযোগ ছিল। আশপাশের চারটি পর্বতের মধ্যে খেন্তি পর্বতের বুরখান খালদুনই একটি পবিত্র পর্বত হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেছিলেন।
‘প্রাচীন মঙ্গোল পাঠ’ ও ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অব দ্য মঙ্গোল’-এ এই বুরখান খালদুন পর্বতকেই প্রথম মঙ্গোল বসতির স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ১৩ শতকের ইতিহাসবিদ রশিদ আল-দিনের মতে, চেঙ্গিস খান বিশেষভাবে ঘোষণা করেছিলেন, আমাদের সমাধিস্থল ও আমার বংশধরদের সমাধিস্থল এখানেই থাকবে।’ তবে এই তথ্য কখনোই যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে গ্রেট বুরখান খালদুন পর্বত ও এর আশপাশের পবিত্র ভূপ্রকৃতি (ল্যান্ডস্কেপ) ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থানের তালিকায় উঠে এসেছে। এমনকি এরও আগে ঐতিহাসিকভাবে ইখ খোরিগ (গ্রেট ট্যাবু) নামে পরিচিত এই পর্বতটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।
সম্ভাব্য অন্য অবস্থান
ঐতিহাসিক বর্ণনা ও সাম্প্রতিক আরও নতুন গবেষণায় চেঙ্গিস খানের সমাধিস্থল হিসেবে সম্ভাব্য অন্য আরও অবস্থানকে নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ইউয়ান রাজবংশের মতে ১২৭১ থেকে ১৩৬৮ সন পর্যন্ত চীন শাসন করা সব মঙ্গোল সম্রাটদেরই কিনিয়ান উপত্যকায় সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তবে এই উপত্যকা কোথায় তার কোনো রেকর্ড নেই। ১৭ শতকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মঙ্গোলীয় গ্রন্থ- এরডেনিন টোবচি ও আলতান টোবচিতে দাবি করা হয়, চেঙ্গিস খানের কফিনে এমনকি তার মরদেহও ছিল না। আরেকটি জনপ্রিয় তত্ত্ব অনুসারে, চেঙ্গিস খানের সমাধি ২০০৪ সালে আবিষ্কৃত হওয়া তার প্রাসাদের কাছেই রয়েছে। ২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফির সঙ্গে যৌথভাবে ‘ভ্যালি অব দ্য খানস’ নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করেছিল। সে সময় তারা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ করতে স্থানীয় জনসাধারণকে সমাধির সন্ধান দিতে আমন্ত্রণ জানায়। ওই প্রকল্পে তারা ৫৫টি সম্ভাব্য অবস্থানকে চিহ্নিত করেছিল।
মঙ্গোলিয়ার উলানবাটার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. দিমাজাভ এরদেনেবাত্তার সাম্প্রতি আরও একটি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি শাংনু সমাধি রীতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। মঙ্গোলদের অনেক পূর্বপুরুষই এই তত্ত্বের অনুসারী (চেঙ্গিস খান নিজেও) ছিলেন। শাংনু রীতি অনুযায়ী, রাজাদের ২০ মিটারেরও বেশি গভীর মাটির নিচে সমাহিত করা হতো। ওই সমাধিকে কেবল মাত্র একটি চারকোনা পাথর দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। যদি চেঙ্গিস খানের সমাধিক্ষেত্রটিও একই রকম হয় তবে তা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম বলে ধারণা করা হয়।
গবেষণা চ্যালেঞ্জ
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে বহুজাতিক প্রকল্প ও টেলিভিশনের অনুসন্ধান চালানোর মাধ্যমে অনেকেই চেঙ্গিস খানের হারিয়ে যাওয়া সমাধি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। এত সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ওই স্থানটি এ পর্যন্তও এক রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। আংশিকভাবে মঙ্গোলিয়ার কিছু একান্ত ব্যবহারিক বাধার কারণেই তা রহস্য হয়ে আছে। চেঙ্গিস খানের সমাধি খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশ হিসেবে মঙ্গোলিয়া নিজেই একটি বাধা। ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৯ বর্গমাইলের বিশাল আয়তনের মঙ্গোলিয়া বিশ্বের ১৮তম বৃহত্তম দেশ। খুব কম রাস্তা, স্থায়ী ভবনহীন ও অল্প জনসংখ্যার একটি অনুন্নত দেশ। এই বিরান ও বিশাল মঙ্গোলিয়ায় তার সমাধিস্থানকে খুঁজে বের করা যেন বিশাল খড়ের গাদার মধ্যে একটি সূচ অনুসন্ধান করা। এছাড়াও এই সমাধি খুঁজে পেলে সেখানে শুয়ে থাকা চেঙ্গিস খান বিরক্ত হতে পারেন মঙ্গোলদের এই জাতীয় চেতনাও এই সমাধি খুঁজে না পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব রাখছে। সাধারণত বলা হয়ে থাকে, মঙ্গোলীয়রা চায় চেঙ্গিস খানের হারিয়ে যাওয়া সমাধিটি তাদের মহান নেতার ইচ্ছে মতোই থাকুক। ১৯৯০ সালে তাদের এই মনোভাব প্রকাশ্যে আসে। সে সময় জাপান ও মঙ্গোলিয়ায় যৌথ সহযোগিতায় ‘গুরভান গোল’ নামের একটি সমাধিক্ষেত্রকে শনাক্ত করার প্রচেষ্টা বিক্ষোভের কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
তার সমাধি অনুসন্ধানে বিদেশি অভিযানগুলো ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে পরিচালিত হয়েছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’স ‘ভ্যালি অব দ্য খানস’ প্রকল্পের গবেষকরা তার সমাধি খুঁজে পেতে স্থল ও আকাশজুড়ে বিস্তৃত অভিযান চালিয়েছে। সে সময় তারা স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত ছবির মাধ্যমে ওই সমাধিস্থলের গণঅনুসন্ধান চালান। তবে বাস্তবতায় দেখা গেছে, সমাধিস্থলটি খুঁজে বের করা কেবল বিদেশিদেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকে গেছে, মঙ্গোলীয়রা তা খুঁজেই পেতে চায় না। এর মানে এই নয় যে, নিজের মাতৃভূমিতে চেঙ্গিস খান তেমন উল্লেখযোগ্য নন। বরং বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত। তার মৃত্যুর পর তিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে, বর্তমান মঙ্গোলীয় মুদ্রা এমনকি পানীয় ভদকার বোতলেও তিনি ছবি হয়ে আছেন। তাই তার সমাধিকে খুঁজে বের করা কেন ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে, তা কোনো বিদেশির পক্ষেই বুঝে ওঠা খুবই কষ্টকর।
মঙ্গোলীয়দের এমন অনিচ্ছাকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচলিত অভিশাপের মোড়কে প্রচার করে আরও বেশি রোমান্টিক করে তুলেছে। ওই বিশ্বাস মতে, চেঙ্গিস খানের সমাধিকে উন্মুক্ত করা হলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এই প্রচারণা আরও মজবুত হয় ১৯৪২ সালে। সে সময় রাশিয়ার একদল প্রতœতাত্ত্বিক ১৪ শতকের তুর্কি-মঙ্গোলীয় রাজা তৈমুর লংয়ের সমাধি খুঁড়ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই সমাধিতে অস্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। দ্বিতীয় বশ্বেযুদ্ধের ওই সময়ে নাৎসি সেনারা সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে বসে। তারা পূর্ব রণাঙ্গনে নৃশংস রক্তপাত চালায়। কুসংস্কারে বিশ্বাসীরা তৈমুর লংয়ের সমাধির ওই অস্বাভাবিক বিশৃঙ্খলাকে নাৎসিদের হত্যাযজ্ঞের প্রভাবে ঘটেছিল বলে বিশ্বাস করে থাকেন।
অন্যসব কিংবদন্তি
চেঙ্গিস খানের সমাধিকে ঘিরে অনেক কিংবদন্তি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় কিংবদন্তিটি হলো, যদি কখনো এই সমাধি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে তখনই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। তৈমুর সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তৈমুর লংয়ের সমাধি সম্পর্কেও একই ধরনের অভিশাপের ধারণা প্রচলিত আছে। চেঙ্গিস খানের সমাধির ভেতরে কী রয়েছে তা ঘিরেই অন্য কিংবদন্তিগুলো রয়েছে। জানা যায়, মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সর্বত্র প্রচুর ধনসম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। আরও প্রচলিত আছে, চেঙ্গিস খান তার ছোট ছেলে তোলুই, তোলুইয়ের স্ত্রী ও তাদের ছেলেদের সঙ্গে তার সমাধি ভাগ করে নিয়েছিলেন। তারা হলেন তলুইয়ের ছেলে মংকে খান, আরিগ বোকে ও চীনের ইউয়ান রাজবংশের শাসক কুবলাই খান। এক্ষেত্রে কিছু কিংবদন্তি অন্য কিংবদন্তিগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। প্রচলিত আছে, দারখাদ নামের উরিয়ানখাই গোত্র চেঙ্গিস খানের সমাধি রক্ষা করে আসছে। চেঙ্গিস খানের সমাধিকে যারা চিনত তাদের সবাইকে হত্যা করার যে কিংবদন্তি রয়েছে, তার সঙ্গে এই ধারণা সাংঘর্ষিক।
কবর বনাম সমাধি
সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, চেঙ্গিস খানের সমাধি নামে একটি স্থান রয়েছে। তবে মঙ্গোলিয়ার ভেতরে অবস্থিত ওই স্থানটি চেঙ্গিস খানের আনুষ্ঠানিক কোনো সমাধিক্ষেত্র নয়। বরং ওই সমাধিটি তাকে উৎসর্গ করা একটি মন্দির। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর কয়েক শতাব্দী ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। তারপরও তার সমাধিস্থলটি গোপন রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। এই গোপনীয়তাই আজও তার ইচ্ছাকে পূর্ণতা দিচ্ছে। ইউনেস্কো তার ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়ে সম্ভাব্য ওই সমাধিটিকে যেকোনো খনন থেকে রক্ষা করে আসছে। চেঙ্গিস খানের হারিয়ে যাওয়া সমাধির অবস্থানটি আপাতত এভাবে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
চেঙ্গিস খান
ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এক বিজেতার নাম চেঙ্গিস খান। তিনি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও মঙ্গোলদের জাতির পিতা। এই সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র এই শাসকের ৬৫ বছরের শাসনামল গোপনীয়তা ও কিংবদন্তির কারণে এখনো অস্পষ্ট।
সিক্রেট হিস্ট্রির তথ্য মতে, চেঙ্গিস খানের পারিবারিক নাম ছিল তেমুজিন। ১২০৬ সালে অনেক যুদ্ধ ও রক্তপাতের পর তেমুজিন সমগ্র মঙ্গোলিয়ার স্তেপের একক অধিপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। তখন তাকে ‘চেঙ্গিস খান’ উপাধি দেওয়া হয়। তেমুজিনের মায়ের নাম ছিল হোয়েলুন। আর বাবা ইয়েসুগেই। তিনি তার মায়ের প্রথম ছেলে ছিলেন। হোয়েলুন ছিলেন তার বাবা ইয়েসুগেইর দ্বিতীয় স্ত্রী। তেমুজিনের বাবা ইয়েসুগেই ছিলেন যাযাবর খামাগ মঙ্গোল বোরজিগিন বংশের প্রধান। ইতিহাসের অপরাজিত এই সেনাপতি এই বংশে জন্ম নেন। রণকুশলতা ও নেতৃত্বগুণে এক সাধারণ গোত্রপতি থেকে বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন।
তেমুজিনের জন্ম হয়েছিল মঙ্গোলিয়ার স্তেপ বা তৃণভূমিতে। তার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তেমুজিনের জন্মস্থান ছিল উত্তর মঙ্গোলিয়ার খেনতি পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত বুরখান খালদুন পর্বতের খুব কাছে দেলুন বলদাখ নামের এক জায়গায়। আরব ইতিহাসবিদ রশিদ আল-দিনের মতে, চেঙ্গিস খান ১১৫৫ সনে জন্মেছিলেন। তবে আধুনিক ইতিহাসের গবেষণা ও চীনা ইতিহাসের সবচেয়ে বাস্তবধর্মী তথ্য অনুসারে, খুব সম্ভবত ১১৬২ সালেই তেমুজিনের জন্ম। বলা হয়ে থাকে, ওনন নদীর পাড়ের তৃণভূমিতেই তার বেড়ে ওঠা তেমুজিনের শৈশব কেটেছে ঘোড়া চালনা শিখে। মাত্র ছয় বছর বয়সে নিজ গোত্রের সঙ্গে শিকারে যাওয়ার অনুমতি পান তিনি। ৯ বছর বয়সে তার বাবা ইয়েসুগেইকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়। সে সময় তার গোত্রের সদস্যরা তার পুরো পরিবারকে ছেড়ে চলে যায়। মায়ের নির্দেশেই তিনি পরিবারের রক্ষকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। মাত্র তের বছর বয়সে তিনি নিজের সৎভাইকে হত্যা করেন। সে সময়ের ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের কয়েক লাখ বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত তৃণভূমিতে বিভিন্ন তাতার, টার্কিক ও মোঙ্গল গোত্র বসবাস করত। তার বাবার ঘোর শত্রু ছিল স্তেপ তৃণভূমিতে আধিপত্য বিস্তার করা তাতাররা। মঙ্গোল রীতি অনুসারে, বার বছর বয়সেই বোর্তে নামের এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় তেমুজিনকে। ৩০ বছর বয়সে তিনি প্রথম সন্তানের বাবা হন। কিছুদিনের মধ্যেই শত্রুপক্ষ অতর্কিত হামলা চালিয়ে বোর্তেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে পিতৃবন্ধু তুঘরুল খানের সহায়তায় বোর্তেকে উদ্ধার করেন তেমুজিন। তেমুজিন ধীরে ধীরে রক্তের ভাই জমুখা ও তুঘরুলের সহযোগিতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তবে উচ্চাভিলাষী তেমুজিনের বড় সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার পথে চরম শত্রু হয়ে দাঁড়ান জমুখা। ১২০৬ সালে তেমুজিনের বয়স ৩৫। সে সময় মঙ্গোলিয়ার স্তেপ অঞ্চলের একদিকের নেতৃত্বে চেঙ্গিস অন্যদিকে জমুখা। তাদের দুজনের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধও হয়েছিল। পরের কয়েকটি যুদ্ধে তেমুজিনের হাতে জমুখা পরাজিত হন। জমুখাকে পরাজিত করার পর মঙ্গোলিয়ার বাকি গোত্রগুলোও একে একে চেঙ্গিসের বশ্যতা মেনে নিতে থাকে।
চেঙ্গিস খান উত্তর-পূর্ব এশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চলের বেশ কিছু যাযাবর গোত্রকে একত্রিত মঙ্গোল রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেন। তার মৃত্যুর পর মঙ্গোল সাম্রাজ্য ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাম্্রাজ্যে পরিণত হয়। ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের সময় তিনি মঙ্গোল জাতির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বজয়ে বের হন। চীন থেকে তিনি যুদ্ধবিদ্যা ও কূটনীতির মৌলিক শিক্ষা লাভ করে প্রথমেই জিন রাজবংশকে পরাজিত করেন। ‘চেঙ্গিস খান’ হওয়ার পর তেমুজিন আরও ২১ বছর বেঁচে ছিলেন। তার শাসনের সেই স্বর্ণযুগে তিনি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ বর্গমাইলের বিশাল এক সাম্রাজ্য গড়েছিলেন।
১৩ ও ১৪ শতকে প্রতিষ্ঠিত মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক হিসেবে অভিযান চালিয়ে তিনি ইউরেশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চলে তার সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। তার পদাতিক বাহিনী পশ্চিমের লিংগাটিকা থেকে পোল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণের গাজা পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে তা অধিকার করেছিল। চেঙ্গিস খান তার শাসনামলে কারা খিতাই, খারেজমিয়া ও পশ্চিমের জিয়া ও জিন রাজবংশের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন। তার সেনবাহিনী মধ্যযুগের জর্জিয়া, সিরকাসিয়া, কেইভানরাস এবং ভলগার তীরবর্তী বুলগেরিয়া পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়েছিল। চেঙ্গিস খান এক বিশাল বংশধর রেখে গেছেন। গবেষণায় দেখা যায়, মঙ্গোলের ২শ জন মানুষের মধ্যে একজন তার বংশধর। মঙ্গোলীয়দের হৃদয়ে চির জাগরূক বীর সেনা চেঙ্গিস খান কেবল বিশ্বই জয় করেননি গড়েছেন সভ্যতাও।
মহানায়ক চেঙ্গিস খান ১২২৭ সনের ১৮ মতান্তরে ২৫ আগস্টে মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে ও প্রপৌত্ররা প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে মঙ্গোল সাম্রাজ্যে রাজত্ব করে। তবে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রথম মহান এই খানের সমাধিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্য অজানাই রয়ে গেছে।