‘শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে আমার দেখা করার কথা নীলক্ষেতের মোড়ে। এক বছর আগে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে যোগ দিয়েছি প্রভাষক হিসেবে। স্যারের নেতৃত্বে প্রায় মৃত বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি পুনরুজ্জীবনের কাজে হাত দিয়েছি। ওইদিন ইস্পাহানির কর্ণধারের কাছে যাওয়ার কথা সাহায্যের জন্য।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আসবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; হই হই রই রই ব্যাপার। যতটুকু সামর্থ্য তা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গোছগাছ করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সভায় আমরা আমন্ত্রিত। কিন্তু এর এক সপ্তাহ আগে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাপা টেনশন। অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী তখন উপাচার্য। কে বা কারা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, বাকশালে যোগ দিতে হবে। এবং বাকশালে যারা যোগ দিয়েছেন তাদের তালিকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিতে হবে। স্বাক্ষর না দিলে কি হবে? এটি কেউ বুঝতে পারছে না। সেটিই মানসিক চাপ। এক এক করে সবাই যোগ দিচ্ছেন। আমরা অনেক তরুণ তখন যোগ দিয়েছি একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের মনে প্রশ্ন, যার খুশি তিনি যোগ দেবেন বাকশালে কিন্তু বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? বাকশাল হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন লাইন করে বিভিন্ন পেশার মানুষজন যোগ দিচ্ছেন, বুঝে না বুঝে। ১৫ আগস্ট চলে আসছে। প্রতিদিন বাকশালে যোগ দেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তখন তরুণদের কাছে খুব প্রিয়। দেখা করলাম ১৪ আগস্ট তার সঙ্গে। বাকশালে যোগ দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেটি নিজের ইচ্ছায়, অদৃশ্য চাপের কাছে নয়। স্যার বললেন, ‘না, আমি যোগ দেব, ঘর সংসার আছে।’ তিনি সই করতে চলে গেলেন। সদ্য বিয়ে করেছি, থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। কী যে মনে হলো, ঠিক করলাম এভাবে যোগ দেব না। কপালে যাই থাকুক। পরবর্তীকালে দেখেছি, যারা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন তারা সবাই বাকশালের সমালোচনা করছেন। আমরা যে কজন [মাত্র ৬/৭ জন] যোগ দিইনি তারা কখনো বাকশালের সমালোচনা করিনি।

১৩ আগস্ট রাতে [১৪ আগস্ট] একটি বোমা ফুটেছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বঙ্গবন্ধু আসবেন তারপর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কারা বোমা ফাটানোর সাহস রাখে। এটি নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনশন। শাহরিয়ার কবির এ বিষয়ে জানতে এলো। আমি আর সে বিচিত্রায় কাজ করতাম। আমি চলে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শাহরিয়ার তখন বিচিত্রার সহকারী সম্পাদক। কোনো কিছুই জানা যাচ্ছে না। ১৪ আগস্ট বিকেলে বের হচ্ছি কলাভবন থেকে। দেখি শেখ কামাল ও তার সহযোগীরা কলাভবন ঘুরেফিরে দেখছেন, আয়োজন ঠিক আছে কি না। মনে হলো, কলাভবন কি আর আসব? আজ অনেকে অনেক রকম অনুভূতির কথা বলেন অবস্থা বুঝে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনুভূতিটা সে রকমই ছিল।

সিরাজ স্যারের সঙ্গে কথা ছিল, ইস্পাহানির কাজ সেরে টিএসসি আসব, বঙ্গবন্ধুর অনুষ্ঠানে। সকাল সাতটার দিকে ধানমন্ডি থেকে রিকশা করে রওনা হলাম নীলক্ষেতের দিকে। থাকতাম তখন ১৮ নম্বরে। শেষ রাতের দিকে গোলাগুলির খানিকটা শব্দ শুনেছিলাম। গা করিনি। এ রকম শব্দ কখনো না কখনো শোনা যেত ৭১ সাল থেকেই।

নীলক্ষেতে নেমে সিরাজ স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার স্যার, চারদিক সুনসান মনে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকাও। এ রকমতো হওয়ার কথা নয়।

একজনকে পাওয়া গেল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?’ তিনি বললেন, নির্বিকারভাবে, ‘শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে।’ সিরাজ স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন শেখ সাহেব?’ ‘কেন শেখ মুজিব।’ বলে তিনি হাঁটা শুরু করলেন। সমস্বরে দুজনে বললাম, ‘বলে কী?’ সত্যি বলতে কি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সিরাজ স্যার বললেন, ‘বাসায় যাও। আমিও যাচ্ছি। দেখো কী হয়?’ স্যারের বাসা পাশেই। আমি খানিকটা হাঁটার পর রিকশা পেলাম। রিকশাচালকও জানেন না। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে জানালাম। তারপর বেরিয়ে তাকওয়া মসজিদে এলাম। এর উল্টোদিকে দেখলাম নির্জন। ফিরে এলাম। রেডিওতে কর্কশ স্বরে ঘোষণা হচ্ছে যে শেখ মুজিব নিহত।

আসলে কী হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এখন অনেকে বলেন, অনেক জায়গায় প্রতিবাদ হয়েছে, অনেকে অনেক কিছু করেছেন, ভেবেছেন। আসলে তেমন কিছুই হয়নি।

আস্তে আস্তে জানালাম কী হয়েছে বা হয়েছিল। পরিকল্পনা করা হয়েছিল সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করা হবে। মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন ১২টি ট্রাকে করে সৈন্য নিয়ে সেখানে যান। মেজর ডালিম যান সেরনিয়াবতের বাসায়। শেখ মণির বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব পান রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। খুব ভোরে মহিউদ্দিন ও মেজর বজলুল হুদা ও মেজর নূর যায় ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে মেজর হুদা ও নূর। বাকিদের গুলি করে মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। এক হাবিলদার গুলি করে শেখ রাসেলকে। সেদিন ঢাকা ছিল নিথর।

আজকাল অনেকে নানা কথা বলেন, কেউ বলেন না কারা মন্ত্রিসভায় গিয়েছিলেন মোশতাক ও পরবর্তীকালে জিয়ার সময়। পেছন ফিরে মনে হয়, সবাই ভয়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন। সপরিবারে যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায় এবং তারপর জেলে গিয়ে চার নেতাকে হত্যা করা যায় তাহলে অন্যদের অবস্থা কী? এই ভয়ের কথা আমরা ভুলে যাই।

আজ মনে হয়, বঙ্গবন্ধু নিয়ে ১৯৬৯ সাল থেকে এত মাতামাতি করলাম, কিন্তু তার নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের পর কেউ তেমন মাতম করল না কেন? তাহলে কি বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মনে নানা বিষয়ে ক্ষোভ ছিল। হয়তো, এক দিন ঐতিহাসিকরা তা বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু ১৯৭৫ এরপর থেকে ২০০৫ পর্যন্ত [মাঝে শেখ হাসিনার সময়টুকু ছাড়া] বঙ্গবন্ধুর কথা তো তেমনভাবে আসেনি। এমনকি তার পরও কি তার জন্য তেমন প্রতিরোধ হয়েছে? হয়নি। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনা সংগ্রাম করে গেছেন তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। শুধু তাই নয়, বিএনপি দীর্ঘদিন ১৫ আগস্টকে খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে পালন করেছে। কই কতজন বলেছে যে, এটি অন্যায়। এটি দুর্বৃত্তায়ন। যে মুক্তিযোদ্ধারা শেখ হাসিনার সময় যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তারাও তো তখন কোনো মাতম করেননি। জিয়া-এরশাদ-খালেদাকে সমর্থন করেছেন। সেজন্য মাঝে মাঝে মনে হয়, বঙ্গবন্ধু এক অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক, কোনো ১৫ আগস্ট হলো? ইতিহাসে দেখি, অনেক রাষ্ট্রনায়ক, সফল বিপ্লবী নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকেও তো হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে তার পার্থক্য আছে। সপরিবারে কাউকে এমনভাবে হত্যা করা হয়নি। মহিলা, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা কেউ রেহাই পায়নি। তার আত্মীয়দেরও হত্যা করা হয়েছে। মনে হচ্ছিল প্রবল প্রতিহিংসা কাজ করেছে। জেলহত্যায় মুক্তিযুদ্ধের চার নেতা নিহত হওয়ার পর এটি স্পষ্ট হলো বিষয়টি অত সরল নয়। আসলে তারা বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান ভেঙেছেন এটি যারা হত্যা করেছে তারা ভোলেনি।

পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র শুধু নয়, এটি একটি প্রত্যয়। এই প্রত্যয়ের অন্তর্গত পদানত সিভিল সমাজ, সেনাবাহিনীকে অগ্রাধিকার, বৈষম্য, রাজনীতিতে ধর্মের প্রবল ব্যবহার, জঙ্গিদের প্রশ্রয়দান, প্রবল দুর্নীতি ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের সংগ্রাম ছিল এই পাকিস্তান প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রত্যয়ের প্রতিষ্ঠা। তিনি ও তার সাথীরা সেটি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশও শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, একটি প্রত্যয়ও, যার অন্তর্গত গণতন্ত্র, বৈষম্য নিরসন, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার না করা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সিভিল সমাজকে অগ্রাধিকার এবং সিভিল কর্তৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান প্রত্যয়ে যারা বিশ্বাসী তারা এটি মেনে নিতে পারেনি।

অন্যদিকে, সংবিধানে চার মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা ও তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রগুলো মেনে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ সমাজতন্ত্র নিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্লকে যাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেওয়া ছিল কষ্টকর। সৌদি আরবসহ অন্য কট্টরপন্থি দেশগুলোরও ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল। গণহত্যা সমর্থন করেছিল চীন, আমেরিকা ও সৌদি আরব। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর চীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এরা বঙ্গবন্ধুকে কখনো মানতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে এভাবে যুক্ত হয়েছিল বহিঃষড়যন্ত্র।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সব মৌলিক অর্জন নস্যাৎ করেছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ জাতিকে বিভক্ত করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের মতো এত ক্ষতি বাংলাদেশের আর কেউ করেনি। শেখ হাসিনা গত ১৮ বছরে সেসব ক্ষতি কিছুটা পূরণ করেছেন বটে কিন্তু ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে অলিখিত সমঝোতা সেসব অর্জন বিনষ্টে বিন্দুমাত্র সময় নেবে না। 

আজ বঙ্গবন্ধু স্মরিত হচ্ছেন। শেখ হাসিনা সেই পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয়, কঠিন বিএনপি ছাড়া সবাই বঙ্গবন্ধুভক্ত। চারদিকে বঙ্গবন্ধু স্লোগান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কি প্রোথিত হয়েছে মনে? মনে হয় না। চার মূলনীতির কথাই ধরা যাক। আপনার কি মনে হয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে? জাতীয়তাবাদ দ্বিখন্ডিত। সমাজতন্ত্র দূরে থাকুক, বৈষম্য বেড়েছে। উন্নয়নের সঙ্গে বৈষম্যের তুলনামূলক হার বেশি। ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকে কীভাবে? বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে ধর্ম নিষিদ্ধ করেছিলেন। এখন ধর্মের জয় জয়কার। দুর্নীতি পেয়েছে অগ্রাধিকার। বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরে যা করতে পেরেছিলেন তার ভিত্তি ছিল আদর্শ। এখন আদর্শ কিন্তু সেøাগান। এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রোথিত করার জন্য মানস জগৎ পরিবর্তনের যে প্রচেষ্টা নেওয়া উচিত ছিল তাও সরকার বা আওয়ামী লীগ করতে পারেনি।

১৫ আগস্ট কাঙালিভোজ, মাইক বাজিয়ে দোয়া মাহফিল বা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর চেয়ে তার আদর্শ যা ছিল বাংলাদেশের মৌলিক অর্জন তা ফিরিয়ে আনা অগ্রাধিকার পেলে হয়তো জাতীয় শোক দিবস পালন যথার্থ হবে।

জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ