হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলাম

প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসের জন্য তৈরি হতে হতে রেডিও ছেড়ে খবর শোনা ছিল আমার প্রতিদিনের অভ্যেস। রেডিওই ছিল সে সময়ে খবর পাওয়ার, খবর জানার দ্রুততম মাধ্যম। তখন সকালে রেডিও শুনতাম যাতে কোনো খবর থাকলে সেটা জেনে যাওয়া যায়।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন সকালেও আমি রেডিও ছেড়ে নাশতা খাচ্ছি, তৈরি হচ্ছি। এমন সময় রেডিওতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের খবর শুনে আমি চিৎকার করে উঠলাম। হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। আমার আব্বা সেদিন আমার বাসায় ছিলেন। এমনিতে রাজশাহীতে থাকলেও তখন আমার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। আমার চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে আব্বা ছুটে এলেন। বললেন, ‘কী হয়েছে মা গো! কাঁনছো কেন?’

আমি যখন আব্বাকে বললাম যে, রেডিওতে সেনাবাহিনীর লোকেরা বলছে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে। দেখলাম, আব্বার দু’চোখ বেয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়ছে। আব্বা বসে পড়ে দৃষ্টিশূন্য চোখে চোখের জল মুছছেন। আমি আব্বার কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের কারও মুখ থেকে কোনো কথা বেরুচ্ছিল না। আমরা কাঁদছিলাম। ভাবতেই পারছিলাম না যে বঙ্গবন্ধু আর নেই। বঙ্গবন্ধু কি সত্যিই মারা গেছেন? বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

এই কান্নায় সেদিন কী কী যে ছিল সেটা দু’কথায় বোঝানো সম্ভব না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু আর তাকে হারানোর বেদনা থেকে যে কান্না তা একইসঙ্গে কত ভাবনায় নিয়ে যাচ্ছিল। ষাটের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলো থেকে কত শত আন্দোলনের পথ, বঙ্গবন্ধুর কারাগারের সব দিন, ছয় দফা, ঊনসত্তর, সত্তরের নির্বাচন আর মুক্তিযুদ্ধ; কতকিছু পেরিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু নেই এটা ভাবতেই ভীষণ এক ভয় আমাকে কুঁকড়ে ফেলেছিল। মনে হচ্ছিল, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে তারা নিশ্চয়ই দেশ দখল করে নেবে। কত স্বপ্নের এই স্বাধীন বাংলাদেশ! এই দেশটা কি থাকবে? চোখের জল মুছতে মুছতে এমন কত কথাই সেদিন ভেবেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুকে সামনাসামনি প্রথম দেখার স্মৃতি মনে পড়ছিল। দিনটাও এখনো মনে আছে। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। বাংলা একাডেমির একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি। সেদিনই আমি তাকে প্রথম কাছ থেকে দেখি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তখন সারা দেশ অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে বসেছিলেন, অনুষ্ঠান চলছিল। এমন সময় কে একজন এসে মঞ্চে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কানে কানে কিছু একটা বলে চলে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর মুখ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। তাকে উত্তেজিত লাগছিল। কিন্তু তিনি তখন কিছুই  বলেননি। এরপর তিনি বক্তৃতা করলেন। একাডেমির মাঠে কয়েকশো লোক। তিনি বক্তৃতাতেও এমন কিছু বলেননি যে আমরা বুঝতে পারব তাকে কানে কানে কী বার্তা দিয়ে যাওয়া হলো।

সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হুসনা বানু খানম। তিনি শ্রোতাদের প্রথম সারিতে বসে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে ডেকে মঞ্চে তুলে নিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে গান গাইতে বললে তিনি জানতে চাইলেন কী গান করব? বঙ্গবন্ধু তাকে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার প’রে ঠেকাই মাথা’ গানটি গাইতে বললেন। বঙ্গবন্ধুসহ সবাই এই গান শুনে যেন একটা তন্ময়তার মধ্যে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম।

এরপর বঙ্গবন্ধু সভাস্থল ত্যাগ করে চলে গেলেন। পরে আমরা বাংলা একাডেমির তখনকার মহাপরিচালক কবীর চৌধুরীর কাছ থেকে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর কানে কানে যে কথা বলে যাওয়া হলো সে সম্পর্কে। আসলে অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেই সেদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিস্তানি নেতাদের একটা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জুলফিকার আলি ভুট্টো সেই বৈঠক বাতিল করে দিয়েছেন।

সেদিন আমার মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু আমার শিক্ষক। কী আশ্চর্য শান্তভাবে তিনি মঞ্চে বসে ওই বার্তা শুনলেন। সভা চালিয়ে গেলেন। বক্তৃতা করলেন। কাউকে একটুও বুঝতে দিলেন না যে, দেশের এই সংকটকালে তিনি কী সংবাদ শুনলেন। তিনি যদি সেদিন উত্তেজিত হতেন, তিনি যদি নির্দেশ দিতেন তাহলে উপস্থিত কয়েকশো মানুষই তখন মিছিলে ছুটে যেতেন। কিন্তু তিনি নিজের মধ্যেই সেসব রেখে দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে শেষ হতে দিলেন। পরে মনে হয়েছে হয়তো নিজেকেই আরও শান্ত করতে আরও দৃঢ় করতেই তিনি হুসনা বানু খানমকে ডেকে ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানটি শুনতে চেয়েছিলেন।

এরপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হয় ১৯৭৪ সালে। তার মৃত্যুর আগের বছর। সেবার বাংলা একাডেমি একটা আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন করছিল। তখন একাডেমির মহাপরিচালক মযহারুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে সেই আয়োজন উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যান। একাডেমিতে আমরা যারা লেখক ছিলাম তিন চারজন তারাও তার সঙ্গে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। সেদিনই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

পরের বছর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। এই নৃশংসতা, এই বর্বরতা দেখতে হবে সেটা কোনোদিন কল্পনাতেও ছিল না। এর পর তো বাংলাদেশটা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে চলে গেল। কেবল বঙ্গবন্ধুকেই তারা নির্বংশ করার চেষ্টা চালায়নি। একইসঙ্গে তারা জাতীয় চার নেতাকেও হত্যা করল। দেশ চলে গেল সামরিক শাসনের অধীনে।

সেটা ছিল এই জাতির জীবনের এক ভয়াবহ বিভীষিকাময় সময়। তখন থেকে একটা কথাই বারবার মনে হতো, হায় এই দেশটা কি আর কখনো মুক্তি পাবে না! আবার কি কখনো এই দেশ সত্যিকারের স্বাধীন দেশ হয়ে উঠবে না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন কি অপূর্ণই রয়ে যাবে? একই সঙ্গে মনে হতো বঙ্গবন্ধু যে গর্ব নিয়ে বলতেন, ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও আমি বলব আমি বাঙালি।’ সেই বাঙালি হয়ে কি আমরা আর কখনো পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না?

লেখক : কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমির সভাপতি