ভাবলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর মিথ্যা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার খবর প্রথম শুনি রেডিওতে। টাঙ্গাইলের নিজ বাড়িতে সকালের দিকে রেডিওতে এই ঘোষণা শুনি। বঙ্গবন্ধু নেই এই সংবাদ শুনতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তবুও একই ঘোষণা রেডিওতে বারবার আসছিল। বলা হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। কোনো এক সেনা কর্মকর্তা রেডিওতে এই ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু আমি ও আমার পরিবার ভাবতে থাকলাম এই সংবাদ অবিশ্বাস্য! ভাবলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর মিথ্যা।

বঙ্গবন্ধু থাকবেন না, তাকে হত্যা করা হবে এমন কোনো ঘটনা আগে আমরা টের পাইনি। ফলে সকালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ রেডিওতে শুনতে প্রস্তুত না থাকারই কথা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। বারবার রেডিওতে শুনলাম। মনে হচ্ছিল ভুল সংবাদ। অবশেষে অবিশ্বাস্য এই সংবাদ সত্যিই হলো, বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকরা পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিল। বাধ্য হলাম এটা বিশ্বাস করতে। 

হ্যাঁ, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে আমাদের বঙ্গবন্ধু আর নেই। তাকে ঘাতকরা হত্যা করেছে। নির্মম এই সত্য জেনে কী করতে হবে, কী করা প্রয়োজন ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ বাদেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনকে সায় দিলাম কিছু একটা করতেই হবে আমাদের। প্রথমেই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতে হবে। তারপর পরিস্থিতি বুঝে যা করা যায় তার সবই করব। এসব ভাবছি।

টাঙ্গাইলের অনেকেই ঘর থেকে বের হলো আমার মতো। যোগাযোগ করলাম একে অপরের সঙ্গে। যে যার মতো বেরিয়ে যাই। ভোরে রাস্তায় বেরিয়েই দেখি বিডিআরের গাড়ি টহল দিচ্ছে, বিভিন্ন এলাকায়। তাৎক্ষণিক বুঝতে পারলাম পরিস্থিতি ভিন্ন রকম। আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু প্রতিবাদ করব এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে তখনই ভেবে নিলাম আগে আমাদের সবাইকে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। নিজেদের সংগঠিত করতে হবে।

এই চিন্তা অনুযায়ী টাঙ্গাইল শহরের বাইরে খানপুর নামে একটি জায়গায় একত্রিত হই আমরা, প্রায় শ’খানেক মানুষ হবে। সবাই পরিকল্পনা গ্রহণ করি প্রতিবাদ করব, মিছিল করব। তার আগে আমাদের হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে। এরই অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করি প্রতিবাদ মিছিল করে আমরা কয়েকটি থানা অ্যাটাক করব, সেখান থেকে অস্ত্র ছিনতাই করব। নেমে পড়ব প্রতিরোধ মিশনে। 

খানপুরের নিরাপদ স্থানে বসে যখন এমন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করব তখন আমাদের মধ্যে কোনো একজনের হাতে থাকা ট্রানজিস্টারে বেজে উঠল, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবাই খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন। শপথ নিতে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। অর্থাৎ খুনি মোশতাকের সঙ্গে সবাই হাত মিলিয়েছ। এই ঘোষণা সেখানে উপস্থিত আমাদের সবাইকে হতাশ করে তুলে। সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে। সবাই ভাবতে শুরু করে প্রতিবাদে নামাটা কি আমাদের ঠিক হবে কি-না।

আমি তখন ১৯৭৩ সালের পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্য। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সব সদস্যের খুনি মুশতাকের কাছে আত্মসমর্পণের ব্যাপারটি আমাকে ভীষণ ব্যথিত করে। এরপর দেখা গেল শুধু নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শপথ নিলেন না। ফলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব এমন একটি পরিকল্পনাও গ্রহণ করি।

কিন্তু এরই মধ্যে খবর চলে আসে জাতীয় এই চার নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে মুশতাক সরকার। তখন আরও দুর্বল হয়ে পড়ি। মনে হলো আমরা পরাজিত হলাম। সবাই মুশতাকের কাছে সারেন্ডার করলাম। হেল্পলেস হয়ে পড়ি। ধরেই নিলাম আমরা পরাজিত হয়ে গেছি।

ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে বুঝে গেলাম আমরা এখন আর কিছু করতে পারব না। আমাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সরকারের কেউ নেই। অল্প যারা আছেন তাদের দিয়ে কার্যসাধন করা আামাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সবাই মুশতাকের নেতৃত্বে থাকা সরকারের সঙ্গে ভিড়েছে। অবশ্য কেউ ভয়ে, কেউ স্বার্থে মুশতাকের সঙ্গে গেছে। পরিস্থিতি আমলে নিয়ে আমি তখন আত্মগোপনে চলে যাই। প্রায় দুই বছর পালিয়ে থাকি। এই সময় আমার পরিবারের ওপর টর্চার চলে নানা রকমভাবে। আমরা অনেকেই তখন আত্মগোপনে চলে যাই।

এসময় পরিস্থিতি বুঝে আমাদের টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীও চলে যান ভারতে। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। এক পর্যায়ে তার ওপর আমাদের সন্দেহ দেখা দেয়। তার লোকজনের হাতে আমাদের কিছু লোক হত্যার শিকার হতে থাকে। এরপরই আমরা কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।

এমন একটা ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে যে দেশ আবার বেরিয়ে আসতে পারবে সেটা তখন বিশ্বাস করাই প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন এটা ভালো লাগে যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারের নেতৃত্বে এদেশের মাটিতেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে।  

লেখক : ১৯৭০ সালের গণপরিষদ এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচিত সংসদ সদস্য