বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সবাই

আমরা যে অভিশপ্ত দিনের কথা আজ স্মরণ করছি, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। আগের দিন ১৪ আগস্টও আমি শিক্ষার্থী হিসেবে কলাভবনে গিয়েছিলাম। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রুটিন ক্লাস শেষে বিকেলের দিকে আমরা কলাভবন থেকে বেরিয়ে আসছিলাম। তখন সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের করিডরে আমরা শেখ কামালকে দেখলাম। তিনি কয়েকজন সঙ্গীসহ সেখান থেকে বেরুচ্ছিলেন। গণযোগাযোগ ও সমাজবিজ্ঞান দুটো বিভাগই ছিল কলাভবনের নিচতলায়। কলাভবনের মেইন গেইটের দিকে আসতেই শেখ কামাল ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো।

পরদিন ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা ছিল। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তার পরিদর্শনের কথা। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তখন একটি নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেখানেও বঙ্গবন্ধুর আসবার কথা ছিল। শেখ কামাল ছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ধারণা করি তারা হয়তো সেই আয়োজনের কোনো দায়িত্বপালন শেষে ওই শেষ বিকেলে বিভাগ থেকে বেরুচ্ছিলেন।

সহপাঠী-বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরাও যার যার হল বা বাসায় ফিরে গেলাম। আমি তখন গ্রিন রোডে আমার পৈতৃক বাড়িতেই থাকতাম। কিন্তু আমরা সবাই পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর সফর নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুকে দেখার ও তার কথা শুনবার প্রহর গুনছিলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর আগমন নিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েই একটা সাজ সাজ রব ছিল। আগ্রহ আর উদ্দীপনা ছিল। আমরা বিকেলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও দেখলাম তদানীন্তন উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী তখনো ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সবকিছুর খোঁজখবর নিচ্ছেন।

তখন বুঝতে পারিনি কিন্তু এখন মনে পড়ে, ১৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে কয়েকটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। এখন বুঝতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর আগমন নিয়ে যে আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল তাতে ছন্দপতনের জন্য, ভীতি সঞ্চারের জন্যই হয়তো সেদিন ক্যাম্পাসে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।

আমি বাসায় ফিরেও পরদিনের এমন একটা উদ্দীপনাময় সময়ের অপেক্ষায় ক্ষণ গুনতে গুনতেই সেই রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। পনেরোই আগস্ট ভোরের দিকে আমরা গোলাগুলির শব্দ শুনে জেগে উঠি। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর থেকে গ্রিন রোড খুব বেশি দূরে নয়। আর তখন বাড়িঘর রাস্তাঘাট ছিল খুবই ফাঁকা ফাঁকা। তাই আমরা বেশ স্পষ্টভাবেই গোলাগুলির শব্দ শুনেছিলাম।

গোলাগুলির শব্দ শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসতেই দেখলাম, আরও কিছু মানুষ বিভিন্ন জায়গায় জটলা পাকানোর মতো করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই-ই উদ্বিগ্ন মুখে কী হয়েছে সেটা জানা-বোঝার চেষ্টা করছে। আমিও কাছে গিয়ে শুনতে পেলাম কেউ কেউ বলছে যে, বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। কেউ বলছে যে, শুনলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কেউ-ই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না।

এমন সময় লোকমুখেই শুনলাম একজন বলছে, ‘এই এই, রেডিওতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ঘোষণা দিচ্ছে।’ একথা শুনে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এলাম রেডিও শুনতে। রেডিওই ছিল তখন আমাদের প্রধান সংবাদমাধ্যম। টেলিভিশন তখনো অতটা সম্প্রসারিত হয়নি। টেলিভিশনে তখন সকালবেলার সম্প্রচার ছিল না। তখন চব্বিশ ঘণ্টার টেলিভিশন সম্প্রচার চিন্তাই করা যেত না। সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত টেলিভিশন চলত।

বাড়িতে এসে রেডিও অন করার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পেলাম একটা ঘোষণা বাজছে। সেটা বারবার বাজানো হচ্ছিল। শুনলাম যে, মেজর ডালিম নামের একজনের কণ্ঠে ঘোষণা করা হলো যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘোষণা শুনতে শুনতেই আমরা সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। তখন আমরা পরিবারের যে কজন ছিলাম কারুর মুখ থেকেই যেন কোনো কথা বেরুচ্ছিল না। পরিবারের সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছি কিন্তু কেউই কথা বলতে পারছি না। আবার এই ঘোষণা সত্যি না মিথ্যা সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না। বারবার ভাবছি এটা কী শুনলাম! এও কি সম্ভব! বঙ্গবন্ধুকে কেউ হত্যা করে ফেলতে পারে এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। 

একটা সময় আমরা যেমন নিজেদের মধ্যে এসব নিয়ে কথা বলছিলাম তেমনি বাড়ির সামনের রাস্তায় লোকজনকেও শুনলাম পরস্পরের সঙ্গে এই বিষয় নিয়েই কথা বলছে। কেউই ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। এটাও ভাবছিলাম যে, এটা কি অপপ্রচার চালানো হচ্ছে? কোনো গুজব রটানো হচ্ছে? এভাবেই কিছুটা সময় কেটে গেল। তারপর একটা সময়ে শুনলাম রেডিওতে বারবারই যেমন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা রেডিওতে হাজির হয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। একটা সময়ে এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারলাম আসলেই বঙ্গবন্ধু আর নেই। তাকে সত্যিই হত্যা করা হয়েছে।

এরকম একটা ভীতিকর ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে পনেরোই আগস্ট দিনটা কেটে গেল। যখন সূর্যাস্ত হলো, অন্ধকার নেমে এলো, তখন মনে হলো পুরো বাংলাদেশই যেন অন্ধকারে ডুবে গেল। কোথাও আর কোনো আলো নেই, আশা নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতাকে এভাবে হারাতে হবে এটা ছিল আমাদের কল্পনারও অতীত।

কিন্তু তখনো আমরা অনেক কিছুই জানতাম না। তখনো আমরা বুঝতে পারিনি এই ঘাতকচক্র কতটা নৃশংসতা ঘটিয়েছে। রেডিওতে বারবার কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথাই বলা হচ্ছিল। কিন্তু পরে আমরা জানতে পারি, একা বঙ্গবন্ধু নন, তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলকেও ঘাতকরা হত্যা করেছে। তার পুত্রবধূদেরও হত্যা করা হয়েছে। সেদিনই মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং শেখ ফজলুল হক মণির বাসায়ও সেনা সদস্যরা আক্রমণ চালায় এবং তারাও পরিবারের সদস্যসহ হত্যাকান্ডের শিকার হন। ব্রিগেডিয়ার জামিল, যিনি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনিও হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এভাবে আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান তাকেও হত্যা করা হয়।

এভাবে আস্তে আস্তে আমরা একেকজনের নাম শুনতে থাকলাম। এভাবে যতই হত্যাকান্ডের খবর আসতে থাকল ততই আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে থাকলাম যে বাংলাদেশ কী এক ভয়াল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেল। এরপর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতার হত্যাকা-সহ আরও অনেক হত্যাকান্ড দেশে ঘটতে লাগল। আমাদের তখন মনে হচ্ছিল দেশ যেন এক চিরস্থায়ী অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। হয়েছিলও তাই। বহু বহু বছর ধরে সেই অন্ধকার যুগ চলতে থাকল। দীর্ঘ একুশ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ এই ঘাতকচক্রের কাছেই বন্দি হয়ে পড়েছিল।    

আজও মনে হয়, পনেরোই আগস্ট উনিশ শ’ পঁচাত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অভিশপ্ত একটি দিন। সেদিন প্রত্যুষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও যারা হত্যাকান্ডের শিকার হলেন তাদের সবার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক : শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চেয়ারম্যান