প্রথম সিভিলিয়ান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ দেখি

বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর প্রথম সিভিলিয়ান হিসেবে তাকে প্রথম দেখি আমি। ১৫ আগস্ট আমার জীবনে বিষাদবোধে দুঃখবোধের চূড়ান্ত দিন। আমি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার। সেদিন সকালে আমি রামপুরা টেলিভিশন স্টেশনে পৌঁছালাম। কিছুক্ষণ পরই একটি ফোন এল। ফোনটি ধরতেই কর্কশ গলায় একজন বলল, মুভি ক্যামেরা নিয়ে চলে আসেন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। আমার তার কথায় সন্দেহ হলো। আমাদের ভিডিওগ্রাফার জিয়াউল হককে ডাকলাম। বললাম, যেতে হবে এক্ষুণি। ৩২ নম্বরে পৌঁছালাম। খুব থমথমে অবস্থা। নীচতলার যে ঘরে ফোন থাকত সেই ঘরে ডুকলাম। সেই ঘরে একটি দেহ পড়ে আছে। একটু যেতেই দেখি শেখ কামালের মুখ। আমি ভাবতেই পারিনি এভাবে তার মুখ দেখব। সেনাবাহিনীর লোকজন বলল, উপরে চলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দ্বিতীয় অংশে একটি দেহ। পা সিঁড়ির নিচের অংশে। মাথা উপরে। চারদিকে গুলি ছড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর দেহটা পড়ে আছে। এ দেহের পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি? ভাবা যায়? এ দেহের পাশ দিয়ে আমি উপরে উঠব? বঙ্গবন্ধুর হাত, তালু, কপাল আর শরীরে গুলি লাগার চিহ্ন। কেউ একজন বলল, এ হাত দিয়ে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিতেন। আবার বলল, উপরে যান। অসম্ভব ঘৃণা, ক্রোধ নিয়ে উপরে উঠে বড় ড্রইংরুমের দিকে গেলাম। দরজা লাগানো ছিল একটু করে। দরজা খুলতেই দেখলাম, রক্তের দোলে ভেসে যাচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে না পেরে নিচে চলে এলাম। জিয়াকে বললাম, ভিডিও করা শেষ করতে। ভিডিও শেষে তারা জানাল, বিকালে তারা অফিসে আসবে। অফিসে আমি আর একজন ছিল। যিনি ভিডিওটি প্রস্তুত করছিলেন। তখন আমরা কেউ চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারছি না। কাজ শেষে তারা সিড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। আমাদের মন তারা শূন্য করে দিয়েছে। চিরকালের জন্য একটি জাতিকে দুঃখ দিয়ে গেল। তারা নির্মম সিদ্ধান্তে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে হত্যা করল।  

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জীবনে একটি প্রাণ। তার সম্পর্কে কথা বলা এবং বিষয় নির্বাচন করা যেকোনো বাঙালির পক্ষে কঠিন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতায়, বাংলাদেশের কৃষ্টির প্রকাশের সব দিকে তার যে সজাগ দৃষ্টি এবং বাঙালির মানসে যে প্রকাশ যেকোনো মানুষকে তিনি সেই অনুপ্রেরণা দিতে পারেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। বিশেষ করে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের সময় থেকে আমার সঙ্গে পরিচয়। যেহেতু আমার বাবা কবি ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা; আমাদের বাড়িতে সাহিত্যচর্চা, সংগীতচর্চা এবং বাঙালিত্বের চর্চা ছিল নানাভাবে। আমাদের বাড়িতে বিভিন্নভাবে বাঙালিত্বের প্রকাশও ঘটেছিল। আমি যখন নারায়ণগঞ্জে স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ি, শুনলাম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনকে প্রতিহত করতে গুলি চলেছে। এ ঘটনায় গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মারা গিয়েছে।

এ ঘটনার সূত্র ধরেই নারায়ণগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হুলস্থুল করে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। মিছিল হচ্ছে একের পর এক। সেই মিছিলে আমি যোগ দিয়েছিলাম শুরু থেকেই। সে সময় ছাত্র-ছাত্রনেতা-সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পোস্টার লিখে নারায়ণগঞ্জের নানা স্থানে লাগিয়েছিল। পোস্টারে লেখাগুলো পড়ে আমি অনুভব করলাম, এসব কথার মাধ্যমে মানুষ যথার্থভাবে উদ্বুদ্ধ হবে না। ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমিও আঁকতে শুরু করলাম কার্টুন। বিষয়বস্তু ছিল এমন অনেকগুলো হাত মায়ের গলা টিপে ধরেছে। কিংবা বাংলা অক্ষরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে গিয়েছে। অথবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাংলা অক্ষরগুলোকে আঘাত করা হচ্ছে। আমার আঁকা সেসব কার্টুন আমি ও আমার বন্ধুরা মিলে দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়েছিলাম সেই সময়ে।

আমাদের মনে হয়েছিল, সে সময় সাধারণ মানুষ সেসব কার্টুন দেখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকারের বিষয়টি আরও সহজে স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিল। এ কারণেই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। রাতে একটি বাড়িতে রেখে আমাকে রীতিমতো মারধর করেছিল। পরদিন আমাকে ঢাকার তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে আমি এক মাস কারাবন্দি ছিলাম। তখন জেলখানায় থাকাবস্থায় অনেকের কথা শুনেছিলাম। তাদের মধ্যে আমি শেখ মুুজিবুর রহমানের নামও জেনেছিলাম।

রবীন্দ্রনাথের একটি কথা আছে এ রকম পশুরা বাস করে একটি স্থানে, মানুষ বাস করে একটি দেশে, একটি সংস্কৃতির মধ্যে। এ কথাটির মধ্য দিয়ে যেটি আমি বলতে চাইছি, আমাদের দেশের ভাষা-সংস্কৃতি বাদ দিয়ে পশুর মতো একটি স্থানে রাখার ইচ্ছা ছিল তাদের। সেই স্থানটির নাম ছিল ‘পাকিস্তান’। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, বাংলা ভাষা ও তার সংস্কৃতির মৌলিক শিল্পসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আমার এখন মনে হয়, সে সময় থেকেই বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বাংলাদেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে অক্ষয় করে রাখতে তার অবদানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল।

সে সময় আমি শিশুদের জন্য একটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘ছোট ছোট বড়রা, বড় বড় ছোটরা’। এ নাম ও অনুষ্ঠানের মৌলিক অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশ বিষয়টি বড়রা বুঝতে পারছে না। কিন্তু ছোটরা বুঝতে পারছে। ছোট শিশুদের জন্য রূপকভাবে এ অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

ঘটনাচক্রে অনেক ব্যস্ততার মধ্যে অনুষ্ঠানটি দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার প্রচন্ড ব্যস্ততার মধ্যেও একজন লোক তিনি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। আমাকে জানাতে বলেছিলেন, অনুষ্ঠানটি দেখে তার খুব ভালো লেগেছে। এ রকম অনুষ্ঠান যেন আরও নির্মাণ করে প্রচার করা হয়। তখন আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম। সেই তুমুল সময়ে, স্বাধিকার আন্দোলন চলাকালে, যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপ, এত কাজের মধ্য থেকে অনুষ্ঠানটি দেখে একজনের মাধ্যমে আমার কাছে খবর পাঠালেন। এমন অভিজ্ঞতার স্মৃতি আমাকে আজও আশ্চর্য করে।

বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে গেলেন বঙ্গবন্ধু। এ খবর পাওয়ামাত্রই আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের চলতে থাকা অনুষ্ঠান দেখানো বন্ধু করলাম। ওই রামপুরা ডিআইটি রোড ও টেলিভিশন অফিসের আশপাশে থাকা মানুষদের স্টুডিওতে এনে জড়ো করলাম। সবাই তখন হাত তুলে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগানে স্টুডিওটি মুখরিত করে তুলেছিল। আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টুডিও থেকে সরাসরি এ অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করেছিলাম। দর্শকরা এ আয়োজনটি উপভোগ করেছিল।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এ রকম অনেক অনেক স্মৃতি আমার জীবনে আছে। বহুবার তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে শিল্প-সংস্কৃতি ও টেলিভিশন নিয়ে আলোচনা করেছেন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য তার একটি সাক্ষাৎকার আমাদের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার পর প্রথম কয়েক দিন প্রচ- ব্যস্ত থাকায় সেই সাক্ষাৎকারটি তিনি আমাদের দিতে পারেননি। ফেরার চতুর্থ দিনে তিনি আমাদের দুপুরবেলা সময় দিলেন। ওভি ভ্যান, ক্যামেরা এবং টেলিভিশন কর্মীদের নিয়ে তার সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করতে গেলাম।

আমি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর অফিস কক্ষ থেকে আমি তাকে নিয়ে এলাম। হাসিমুখে তিনি এলেন। টেলিভিশনকর্মীদের অভিনন্দন জানালেন। সে সময়েই তিনি হঠাৎ আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে একজন কোলাবোরেটর’। এ কথা শুনে সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। আমিও ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছি। একটু পরেই তিনি হেসে বললেন, ‘মনোয়ার আমার সঙ্গে কোলাবোরেট করেছে।’

এ রকম একটি কথা তার মুখ থেকে পাওয়া মানে একটি বিরাট পুরস্কার পাওয়ার মতো বিষয়। আজও যখন এ কথা ভাবি আমার ভীষণ ভালো লাগে। বারবার বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে।

লেখক : বরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব