গোপালগঞ্জে নির্মিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত গণপূর্তের প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু দায়মুক্তি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্রোপলিটান জোন) প্রদীপ কুমার বসু অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যান। সরকারি চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্তে তার নামে থাকা বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি জুটিয়ে নেন তিনি।
বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের এ প্রকৌশলী গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়মে জড়িত হন বলে অভিযোগ ওঠে। এরমধ্যে দরপত্র আহ্বানে বিদ্যমান রেট সিডিউল (দর তফসিল) এড়িয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে সরকারের ১ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৫ টাকা লোকসানের অভিযোগ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর মায়ের নামে নির্মিত এ হাসপাতালের বাউন্ডারি ওয়াল, মাটি ভরাট, ভবনের ছাদ নির্মাণ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রিজার্ভ ট্যাংকের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ঠিকাদারকে বিল মিটিয়ে দেওয়ার অভিযোগও ছিল। হাসপাতালের সোলার প্যানেল স্থাপনেও ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে খোদ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্তে। এসব অনিয়মের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি। শেষ পর্যন্ত সব অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি নিয়ে অবসরে গেলেন তিনি।
নথিপত্রে দেখা যায়, গত ৬ জুন প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসুকে দায়মুক্তি দিয়ে অফিস আদেশ জারি করে পূর্ত মন্ত্রণালয়। বলা হয়, প্রদীপ কুমার বসু ২০১১ সালের ৫ মে থেকে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। সে সময়ে তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন।
প্রকল্পের দরপত্রের মূল্যায়ন বিষয়ে অডিট আপত্তিতে বলা হয়, পিএ কমিটির ১২তম সভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিবেচনায় চুক্তি সম্পাদনে ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৫ টাকা। পিএ কমিটির সভাপতির মতানুসারে সে সময় টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ না করে। এ অভিযোগের পর সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ৩-এর উপবিধি (খ) অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগে (মামলা নং ০১/২০২২) বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এরপর প্রদীপ কুমার বসুকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে তার বিষয়ে গণশুনানিও করা হয়। বিভাগীয় মামলার তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মমতাজ উদ্দিনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে দরপত্রের কার্যক্রমে সন্দেহাতীতভাবে সংশ্লিষ্ট বিধির (আইটিটি) ব্যত্যয় হয়েছে তা প্রমাণিত হয়নি বলে মত দেওয়া হয়। তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১২তম সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেসা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের আওতায় ৪ তলা ১৬ ইউনিটের ৮০০ বর্গফুট কোয়ার্টার নির্মাণকাজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অন্যান্য রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২য় দরপত্রদাতাকে নন-রেসপনসিভ করা হয়। প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার মূল্য ছিল ৮ কোটি ৬৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪২ টাকা। গাণিতিক বিবেচনার শুদ্ধতার পর মূল্য ৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫৬৪ টাকায় উন্নীত করা হয়। দরপত্র আহ্বানের সময় গণপূর্ত দর তফসিল ২০০৮ অনুসরণ করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়নের সময় দর তফসিল ২০১১ অনুসরণ করায় আবার ১০ দশমিক ৪ ভাগ বেশি দর ধরে মোডিফিকেশন করে মূল্য ধরা হয় ১০ কোটি ৬৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭ টাকা, যা বিধিসম্মত নয়। পিএ কমিটির ১২তম সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, চুক্তি সম্পাদনে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৫ টাকা।
এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা সরেজমিনে পরির্দশন করে নানা অনিয়মের চিত্র দেখতে পান। ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির মাধ্যমে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে প্রদীপ কুমার বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২০১৬ সালের ২৩ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখা হয়। পরে ‘ম্যানেজ মাস্টার খ্যাত’ প্রকৌশলী প্রদীপ সব কিছু ধামাচাপা দিয়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি নিয়ে গণপূর্তের সবচেয়ে ‘দামি’ চেয়ার মেট্রোপলিটান জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেন। এর মধ্যেই তিনি বিভাগীয় মামলা থেকে দায়মুক্তি পান এবং গত ২৮ সেপ্টেম্বর অবসরে যান।