থানা হেফাজতে মৃত্যু

আদালতে ঘুরেও মামলা করতে পরেননি রুম্মনের স্ত্রী

রাজধানীর হাতিরঝিল থানা হেফাজতে মৃত্যু হওয়া সুমন শেখ ওরফে রুম্মনের (২৫) স্ত্রী জান্নাত আদালতের বারান্দায় টানা দুই দিন ঘুরে অসুস্থ হয়ে পড়লেও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেননি। রুম্মনের মৃত্যুর পর পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করলেও স্ত্রী জান্নাত পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করতে গত রবি ও সোমবার দিনভর ছিলেন আদালতে। 

রুম্মনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটি গত পাঁচ দিনেও কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কমিটির কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও নেই। ফলে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ওই রাতে থানায় ডিউটিতে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

মামলা করতে না পারার কারণ হিসেবে স্বজনেরা বলছেন, কোনো আইনজীবী পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে তাদের সহায়তা করেনি। 

জান্নাত খাতুনের বড় ভাই মো. মোশাররফ বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানায় রুম্মনের মৃত্যুর পর প্রথমে এক আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। গত রবিবার আদালতে গিয়ে তাকে ফোন করলে আর রিসিভ করেননি। পরে অন্যান্য আইনজীবীদেরও অনুরোধ করেছি মামলায় সাহায্য করার জন্য। কিন্তু সবাই পুরো ঘটনা শুনে আর কোনো সহায়তা করেনি। পরদিন সোমবারও আদালতে গিয়ে আমরা মামলা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এদিনও কোনো আইনজীবী সহায়তা করেনি। আদালতে ঘুরতে ঘুরতে রুম্মনের স্ত্রী জান্নাত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার অবস্থা একটু ভালো হলে আবার মামলার চেষ্টা করব।   

তিনি অভিযোগ করেন, গত সোমবার রুম্মনের স্ত্রীসহ আমরা যখন আদালতে তখন পুলিশ রুম্মনের বৃদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন বাবার মাধ্যমে লাশ দাফনের সব আয়োজন সম্পন্ন করে। আমরা খবর পেয়ে আজিমপুর কবরস্থানে ছুটে গিয়ে দেখি দাফন প্রায় শেষ। সেখানে পুলিশ ও স্থানীয় যুবকরা তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করেছে।

রুম্মনের স্ত্রী জান্নাতকে বুধবার সন্ধ্যায় ফোন করলে ধরেন তার বোন শাহনাজ। তিনি বলেন, জান্নাত খুবই অসুস্থ। কথা বলার মতো অবস্থা নেই তার। 

থানায় আসামির মৃত্যুর ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজ আল ফারুককে। 

কমিটি গঠনের পঞ্চম দিন অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু কমিটির কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। 

বুধবার সন্ধ্যায় এডিসি হাফিজ আল ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত চলমান আছে। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি। কাজ শেষ হলেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’ 

শুক্রবার এক চুরির মামলায় রুম্মনকে গ্রেপ্তার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ওই দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে থানা হাজতে তার মৃত্যু হয়। পরদিন শনিবার রুম্মনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে থানার সামনে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও লাকাবাসী। 

পুলিশ দাবি করে, রুম্মন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার আত্মহত্যার একটি সিসিটিভি (ক্লোজ সার্কিট) ফুটেজও গণমাধ্যমকে দেয় পুলিশ। 

রুম্মনের মরদেহ নিয়েও শুরু হয় নাটকীয়তা। স্ত্রী জান্নাতের অভিযোগ, হাসপাতাল মর্গে থেকে মরদেহ নিতে গেলে পুলিশ শর্ত দেয় রামপুরার বাসায় নেয়া যাবে না। মরদেহ সোজা গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জে নিয়ে দাফন করতে হবে। 
তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

রুম্মনের স্ত্রী মরদেহ মর্গে রেখেই আদালতে যান পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে। টানা দুই দিন মর্গে মরদেহ পরে থাকার পর পুলিশ বিকল্প উপায়ে দাফন সম্পন্ন করে। 

নিহত সুমনের বাসা পশ্চিম রামপুরার ওয়াপদা রোডে। স্ত্রী ও সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে সেখানে থাকতেন তিনি। পশ্চিম রামপুরার মেসার্স মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণনকর্মী ছিলেন। তিনি পিওরিট ব্র্যান্ডের পানির ফিল্টার বিপণনের কাজ করতেন। গত ১৩ আগস্ট রাতের কোনো এক সময় এ প্রতিষ্ঠানের ৫৩ লাখ ৫২ হাজার ৭২০ টাকা খোয়া যায়। এ চুরির ঘটনায় গত ১৫ আগস্ট হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন প্রতিষ্ঠানটির ডিসট্রিবিউশন ম্যানেজার মোসলেম উদ্দিন মাসুম। 

এ মামলায় ওই প্রতিষ্ঠানের দুজন ক্যাশিয়ার ও একজন স্টোরকিপারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সর্বশেষ গত শুক্রবার দুপুরে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করে সুমনকে। পরদিন শনিবার থানায় যাওয়ার পর পুলিশ তার স্বজনদের আদালতে যেতে বলে। তারা পরে সুমনের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন। 

পরে পুলিশ জানায় যে শুক্রবার রাতে হাজতখানায় সুমন পরনের প্যান্ট গ্রিলে বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশের দুই সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

সুমনের স্ত্রী জান্নাত সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ ৫ লাখ টাকা দাবি করে না পেয়ে থানায় নিয়ে রাতভর নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করেছে সুমনকে।