এইলিন মোর বাতিঘরের অমীমাংসিত রহস্য

১৯ শতকের ডিসেম্বরের কথা। ফ্লানন আইলসের এইলিন মোর বাতিঘরের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা তিন কর্মী কোনো হদিস ছাড়াই নিখোঁজ হয়ে যান। ভবনটির কোনো কিছুতেই  গোলযোগের  প্রমাণ নেই। পরিষ্কার রয়েছে রান্নাঘর। দরজাও বন্ধ। কেবল  থমাস মার্শাল, জেমস ডুকাট ও ডোনাল্ড ম্যাকআর্থারের কোনো চিহ্নই নেই সেখানে। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে ১২২ বছর। বাতিঘরের ওই তিন কর্মীর জীবনে কী ঘটেছিল তা আজও স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

দ্বীপপুঞ্জ ফ্লানন আইলস

স্কটল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমের কয়েকটি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত ফ্লানন আইলস দ্বীপপুঞ্জ।  এরই ছোট্ট একটি দ্বীপ এইলিন মোর। যা স্কটিশ মূল ভূখ- থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত। দ্বীপটিতে ১৮৯৯ সালে এইলিন মোর বাতিঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দ্বীপের নামানুসারেই বাতিঘরটিকে ‘এইলিন মোর বাতিঘর’ নামে ডাকা হয়। সেই সময়ের একটি আধুনিক শক্তপোক্ত স্থাপনা ছিল বাতিঘরটি। যা প্রায় ৭৫ ফুট উঁচু। এইলিন মোর যেমন নীরব তেমনি নির্জনও। দ্বীপটিতে কোনো মানুষের স্থায়ী বসবাসের নজির  নেই। তবে বাতিঘর থাকায় সেটি পরিচালনার জন্য একটি দল থাকত সেখানে ।

স্কটিশ মূল ভূখ-ের আউটার হেব্রাইডের পাথুরে চিহ্ন দেওয়া সাতটি পৃথক ছোট দ্বীপ একসঙ্গে ফ্লানন দ্বীপপুঞ্জ নামে পরিচিত। সেন্ট ফ্লানন এই স্কটিশ দ্বীপপুঞ্জকে আবিষ্কার করেছিলেন। ফ্লানন আইলসের এইলিন মোর বাতিঘরটি নির্মাণ করতে প্রায় চার বছর সময় লেগেছিল। ১৮৯৯ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রথম বাতিঘরটিতে আলো জ¦ালানো হয়। এর ঠিক এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরই এটি স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বিস্ময়কর রহস্যের একটি হয়ে ওঠে। বাতিঘরটি সাদা রঙের হওয়ায় বহুদূর থেকে নাবিকদের চোখে পড়তে বাধ্য।

স্টিমার আর্কটর

২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর। আর্কটর নামের স্টিমারটি আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে ফিলাডেলফিয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছে। এগিয়ে চলেছে লেইথের দিকে। ১৫ ডিসেম্বরের রাতে সাগরের চারপাশের অন্ধকারের মধ্যে স্টিমারটির নাবিক খুঁজে ফিরছেন কাক্সিক্ষত বাতিঘরের আলো। কিন্তু আর্কটর যখন ফ্লানন আইলস দ্বীপপুঞ্জের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এইলিন মোর-এ বসানো নতুন বাতিঘরের আলো নজরে এলো না । এতে খুবই অবাক ও হতাশ হলেন তিনি। বুঝতে পারলেন কিছু একটা সমস্যা আছে নিশ্চয়। বিষয়টি নিজের লগবুকে লিখেও রাখলেন তিনি। এর তিন দিন পর ১৮ ডিসেম্বর লেইথের বন্দরে এসে পৌঁছাল আর্কটর। বন্দরে নোঙর করার পর এবার আর্কটরের নাবিক গেলেন নর্দান লাইট হাউজ বোর্ডের কাছে। তিনি ফ্লানন দ্বীপপুঞ্জের বাতিঘরে আলো দেখতে না পাওয়ার বিষয়টি জানালেন বোর্ডকে।  লাইট হাউজ বোর্ড ফ্লানন দ্বীপপুঞ্জের এইলিন মোর বাতিঘরে একটি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বাতিঘরের রহস্যময় আচরণের খবর পাওয়া যায় ১৮ ডিসেম্বর। ঠিক এর দুদিন পর অর্থাৎ ২০ ডিসেম্বরে উদ্ধারকারী দলটিকে রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়। দলটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন জেমস হার্ভি। এইলিন মোরে যাওয়ার জন্য  ‘হেস্পোরাস’ নামের একটি উদ্ধারকারী জাহাজকে ঠিক করা হয়। কিন্তু এমন সময়েই অশান্ত হয়ে ওঠে সমুদ্র। উপায় না দেখে যাত্রা পিছিয়ে দেয় উদ্ধারকারী দল। অবশেষে ২৬ ডিসেম্বর এইলিন মোর বাতিঘরে পৌঁছায় ক্যাপ্টেন হার্ভির দল।

আবিষ্কার

২৬ ডিসেম্বর বাতিঘরকে সহায়তাকারী জাহাজ হেস্পোরাস এইলিন মোর দ্বীপে পৌঁছেছিল। তবে তীরে পৌঁছার সময় থেকেই জাহাজটির উদ্ধারকারী দলের কাছে গোলমেলে কিছু ঘটেছে বলে সন্দেহ হতে থাকে। কারণ তারা বাতিঘরকে অন্ধকার অবস্থায় দেখতে পান। এমনকি সে সময় কোনো পতাকাও উড়ছিল না। ডকের আশপাশেও কোনো ধরনের চিহ্ন নেই যা থেকে বোঝা যেতে পারে যে তাদের আসার জন্যই ডক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন হার্ভি ও তার দল দ্বীপের কাছে পৌঁছে তাদের কাজ শুরু করে দেন। তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল বাতিঘরটির তিন পরিচালক থমাস মার্শাল, জেমস ডুকাট ও ডোনাল্ড ম্যাকআর্থারকে খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে জানার চেষ্টা করা কী কারণে বাতিঘরে আলো জ্বালানো বন্ধ রাখা হয়েছে। তারা বাতিঘরের কর্মীদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রথমেই তাদের নিজেদের উপস্থিতি জানাতে জাহাজ হেস্পোরাসের চারদিক থেকে কয়েক দফায় হর্ন বাজিয়ে শব্দ করেন। শব্দটাকে আরও জোরালো করতে সে সময় আকাশে রকেটও ছুড়েছিলেন। তা সত্ত্বেও বাতিঘর থেকে কোনো জবাবই পাওয়া গেল না। এবার দলের নেতা ও হেস্পোরাসের ক্যাপ্টেন হার্ভে প্রথম উদ্ধারকারী হিসেবে জোসেপ মুরকে দ্বীপে পাঠান।

বাতিঘরের নিখোঁজ কর্মী

সে সময় বাতিঘর পরিচালনায় প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ৪৩ বছর বয়সী জেমস ডুকাট। তার সঙ্গে দ্বিতীয় সহকারী হিসেবে ছিলেন ৪০ বছরের থমাস মার্শাল এবং বিশেষ প্রয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন ২৮ বছর বয়সী ডোনাল্ড ম্যাকআর্থার। তবে ম্যাকআর্থার প্রথম সহকারী উইলিয়াম রোজের পরিবর্তে কাজ করছিলেন। উইলিয়াম সে সময় অসুস্থ থাকায় ছুটিতে ছিলেন। মুর ছোট নৌকায় করে এইলিন মোরে এসে পৌঁছান। তিনি দেখতে পান, দ্বীপে জাহাজ বা নৌকা নোঙরের দুটি বন্দরের একটি অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। পূর্ব পাশের এই বন্দরেই উদ্ধারকারী দলটি নেমেছিল। তবে অপর পাশের পশ্চিমের বন্দরে ঝড়ের তা-বের বেশ কিছু লক্ষণ দেখতে পান তিনি। লোহার তৈরি রেলপথ ঢালাই থেকে উপড়ে এসেছে। রেলিংগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলোর কিছু আবার নিচে পাথরের ওপর ছড়িয়েও আছে।

উদ্ধারকারী দলের তদন্ত

এবার বাতিঘরের দিকে এগিয়ে যান মুর।  বাইরে থেকে কোনো সমস্যা নজরে এলো না তার। ভেতরে ঢুকেই যেন এক বিরান বাতিঘরে গিয়ে পড়লেন মুর। যেখানে তিন কর্মীর কারোরই কোনো চিহ্নই নেই। তবে মুরের কাছে চারপাশটা বেশ পরিপাটি বলেই মনে হলো। দরজা-জানালাগুলো বেশ সাবধানতার সঙ্গে বন্ধ করে রাখা। বাতিগুলোও বেশ পরিষ্কার । পাশাপাশি জানালার খড়খড়ি ও ভা-ারগুলোও ছিল পূর্ণ । মুর শোবার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখতে পান বিছানাগুলো অগোছালো পড়ে আছে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাতিঘরের ঘড়িগুলোও থেমে আছে।

বাতিঘরের পরিচালকদের গায়েব হওয়ার সঙ্গে আলো দেখতে না পাওয়ার যে স্পষ্ট একটা সংযোগ আছে তা বেশ বুঝতে পারেন মুর। তাই এবার শোবার ঘর ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যান তিনি। সেখানে টেবিলের ওপর মাংস, আলু ও আচারের থালা রাখা আছে। খাবারগুলো এমনভাবে সাজিয়ে রাখা যেন একটু পরেই কেউ এসে খেতে বসবে সেখানে। একটা চেয়ার কেবলমাত্র উল্টে পড়ে আছে সেখানে এই একটি অসংগতি ছাড়া আর কোনো অসামঞ্জস্যই চোখে ধরা পড়ল না মুরের। আরও একটু ঘুরে তিনি বাতিঘরের মূল বাতি জ্বালবার জন্য প্রস্তুত অবস্থায় দেখতে পান। দরজা ও গেইটগুলো দেখতে গিয়ে মুর কেবল রান্নাঘরের একটা দরজা খোলা পেলেন। এবার বাতিঘরের কর্মীদের নাম ধরে ডাকলেন মুর। কিন্তু  সাড়া পেলেন না কারও।

বাতিঘরের ভেতরের অনুসন্ধান শেষে বাকি দলের কাছে ফিরে আসেন মুর। ক্যাপ্টেন হার্ভে ও দলের বাকিরা দ্বীপের সম্ভাব্য সব জায়গায় বাতিঘরের কর্মীদের খোঁজ করেন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ওই তিনজনের কোনো খোঁজ না মেলায় ততক্ষণে তারা সবাই নিশ্চিত হন, বাতিঘরে অবস্থান করা তিনকর্মীর সঙ্গে ভয়ংকর খারাপ কিছুই ঘটেছে। এ কারণেই ক্যাপ্টেন হার্ভে যত দ্রুত সম্ভব এই ঘোলাটে পরিস্থিতি সম্পর্কে লাইট হাউজ কর্তৃপক্ষকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাছের দ্বীপের টেলিগ্রাফ অফিসে ছুটে যান টেলিগ্রাম করতে। এদিকে দলের বাকি সদস্যরা অর্থাৎ মুর, ম্যাক ডোনাল্ড, বয়া মাস্টার ও দুজন নাবিক সেই রাতে দ্বীপেই থেকে যান।

২৮ ডিসেম্বর মুর তার তদন্তের উপসংহারে সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘আমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি সেখানে গুরুতর কিছু ঘটেছিল।’ এরপর তিনি  হেস্পোরাসে ফিরে যান। উদ্ধারকারী দলের তিনজন ক্রুকে সঙ্গে নিয়ে আবার বাতিঘরে ফিরে আসেন। ওই তিন ক্রু মুরের পর্যবেক্ষণকে ফের নিশ্চিত করলেন। বাতিঘরের কর্মীদের বেলায় কী ঘটেছিল তার ওপরই এই তদন্তটি হয়েছিল।

মুরসহ ওই তিন ক্রু এবার বাতিঘরের পুরো ভবন ও দ্বীপটিতে পুঙ্খানুপঙ্খভাবে অনুসন্ধান চালান। তারপরই ২৯ ডিসেম্বর নর্দান লাইট হাউজের সুপারিনটেন্ডেন্ট রবার্ট মুয়ারহেড এইলিন বাতিঘর পরিদর্শনে আসেন। তিনি তার তদন্ত প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন ১৯০১ সালের ৮ জানুয়ারি ।

রহস্যের সূত্র লগবুক

ফ্লানন আইলস রহস্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সূত্রগুলোর একটি হলো লগবই। মুর কাজের ঘরে গিয়ে খুঁজে পান বাতিঘরের সেই লগবই। যার লেখাগুলো বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কার তো করেই না বরং আরও ঘোলাটে করে তোলে। যদিও শেষ লিখিত নোট ছিল ১৩ ডিসেম্বর থেকে। সেখানে ১৫ ডিসেম্বর আলো নিভে যাওয়ার সময় পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ বিস্তারিত লেখা ছিল। সেই সঙ্গে বিভিন্ন যান্ত্রিক পাঠের বিবরণও ছিল। এইসব লেখার সঙ্গে রান্নাঘরে প্রস্তুত থাকা খাবার সবকিছু এক সঙ্গে মিলিয়ে এই উপসংহার দাঁড়ায়, ওই তিন পুরুষকর্মী ১৫ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত বাতিঘরে ছিলেন। লগবুকের বিবরণে যে দৃশ্যের কথা বলা হয়েছে তাতে, ঘটনাস্থলে বেশ কিছু অসংগতিও পাওয়া গেছে। ঘড়ির কাঁটা থেমে গিয়েছিল।

তাছাড়ও তিনজন কর্মীর জন্য তিনটি অয়েল স্কিন কোট (রেইন কোট জাতীয় পোশাক) সংরক্ষিত ছিল। তারা যখন বাইরে যেতেন সেগুলো গায়ে দিয়েই তবে বের হতেন। কিন্তু দেখা যায়, তিনটি কোটের মধ্যে একটি তখনো ঝোলানো অবস্থাতেই রয়েছে। তার মানে বাতিঘরে যাই ঘটে থাকুক না কেন সেজন্য ওই তিন কর্মীর কেউই আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ারও সময় পাননি। তারা যখন ভবন ছেড়ে বেরিয়েছিলেন তখন তাদের মধ্যে দুজন ডুকাট ও মার্শাল বন্দরে যাওয়ার জন্য ওই কোট পরেছিলেন। কিন্তু ম্যাকআর্থারই একমাত্র জন যিনি তার কোট না পরেই চলে গিয়েছিলেন। যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ছিল। তাছাড়া লাইট হাউজ বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী, ন্যূনতম একজন কর্মীকে সবসময় অবশ্যই বাতিঘরে অবস্থান করতে হবে। তাহলে কী এমন ঘটেছিল যে সেখানে নিয়মের তোয়াক্কা না করে তিনজনই একসঙ্গে বের হয়ে গিয়েছিলেন?

এদিকে উদ্ধারকারী দলের প্রাথমিক তদন্তে ফলাফল পাওয়া গেলেও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এজন্য তাদের বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এবার নতুন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে তারা লগবুকের লেখাগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা শুরু করেন। ডিসেম্বরের ১২ তারিখের লেখায় বাতিঘরের কর্মী মার্শাল উল্লেখ করেন, প্রচ- বাতাস বইছে, এমন বাতাস যা বিগত বিশ বছরেও কখনো দেখিনি। মার্শাল আরও লেখেন, ডুকাট একেবারে চুপচাপ হয়ে পড়েছে আর ম্যাকআর্থার কাঁদছে! এই বিষয়টি খুবই অদ্ভুত লাগল সবার কাছে।

ডিসেম্বরের ১৩ তারিখে মার্শালের লেখায় ঝড়ের আরও বিবরণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা তিনজন বাতিঘরে প্রার্থনায় বসেছেন। কিন্তু সমুদ্র বিষয়ে অভিজ্ঞ তিনজন মানুষের প্রার্থনায় মশগুল হওয়ার মতো ঝড়ের বিষয়টি কেমন রহস্যময় মনে হয় তাদের কাছে। পরে তদন্ত কমিটি খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই অঞ্চলে ডিসেম্বরের ১২, ১৩ ও ১৪ তারিখে কোনো রকম ঝড়ের নজির নেই। ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ পর্যন্ত সমুদ্র শান্ত অবস্থায় ছিল । লগবুকে শেষ লেখাটি পাওয়া যায় ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে। সংক্ষিপ্ত সেই লেখায় বলা হয়, ঝড় থেমে গেছে, সমুদ্র শান্ত, সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান। আর্চটর স্টিমারের নাবিকরা সেদিন থেকেই বাতিঘরে আর আলো জ্বলতে দেখেননি ।

রহস্য কি তবে দুর্ঘটনা?

‘ফ্লাননে একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটেছে।’ ২৬ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন হার্ভির লেখা একটি টেলিগ্রামে এই কথাগুলো লেখা ছিল। ১৯০১-এর ৮ জানুয়ারি সুপারিনটেন্ডেন্ট রবার্ট মুয়ারহেড তার প্রতিবেদনেও একই অনুভূতির কথা জানিয়েছিলেন। এই সব লেখা থেকে তখন একটি বিশ^াসের জন্ম হয়েছিল , ১৫ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে বাতিঘরের তিন কর্মী পশ্চিম বন্দরে ফুঁসে ওঠা বিশালাকারের জলোচ্ছ্বাস থেকে কিছু একটা রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়ে পানির তোড়ে ভেসে যান।

জল্পনা ও প্রচলিত তত্ত্ব

ফ্লানন আইলস বাতিঘরের ওই তিন কর্মীর নিখোঁজ হওয়ার কয়েক বছর পরে একটি লগবুক প্রকাশিত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, ওই তিন পরিচালক মিলেই লগবুকটি লিখেছিলেন। যেখানে ১২ ও ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বেশ কিছু অদ্ভুত নোট দেখানো হয়েছে। ওই বিবরণে বড় ধরনের ঝড়ের কথা যেমন বলা আছে, তেমনি তিন কর্মীর ক্ষেত্রেই বেশ কিছু অস্বাভাবিক আচরণেরও উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লেখা বিবরণই বাতিঘরের কর্মীদের জীবনে ঘটা ঘটনার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখতে পাওয়া গেলেও এটাই সব নয়। কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায়, ‘লগবুকটি’ মিথ্যা ছিল।

যাইহোক, কালের ধারায় লগবুকটি ফ্লানন আইলস রহস্যকে ঘিরে তীব্র জল্পনা ও কুসংস্কারকে বাড়িয়ে তুলেছে। সেই সঙ্গে উদ্ধারকারী দলের তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ পায়। যা থেকে শুরু হয় নানা জল্পনা। তবে কি সে সময় অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটেছিল দ্বীপটিতে? নাকি ভুতুড়ে জাহাজ বা সমুদ্র থেকে উঠে আসা কোনো ভয়াল দানব ধরে নিয়ে গেছে বাতিঘরের কর্মীদের?

কেউ কেউ আবার ভিনগ্রহের প্রাণীর কথাও চিন্তা করেন। এই সবকিছুকেই বাতিঘর কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনের সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কল্পনাপ্রবণ যুক্তিবাদীদের প্রশ্ন, বাতিঘরের কর্মীরা কি বাতিঘরে একা একা বাস করে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন? এরপর হয়তো তারা একে অপরকে খুন করেন। লগবুকের অসংলগ্ন নোটগুলোও তো তারই আভাস দেয়। কিন্তু এমন চিন্তা আবার তাদের মধ্যে আরেক প্রশ্নের জন্ম দেয় তেমনই যদি হতো তাহলে ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন কোথাও পাওয়া গেল না কেন? আবার অনেকের মতে, একসঙ্গে তিনকর্মীর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে সরকারের কিংবা বিদেশি গোয়েন্দার হাত রয়েছে! তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় সন্দেহের শিকার হয়েছিলেন উইলিয়াম ম্যাকআর্থার। কারণ সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তার অতীত ইতিহাস ছিল। লগবুক ছাড়া প্রকৃত ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সে সময় পশ্চিম বন্দরে ওই তিনজনের মধ্যে একটি লড়াই হয়েছিল, যার পরিণতি হিসেবে তারা সাগরে পড়ে যান। অথবা ঘটনাটি হত্যাকা-ও হতে পারে বা আত্মহত্যা। যদিও এই সম্ভাবনাগুলোকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তেমন জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গত ১২২ বছর ধরে এসব প্রশ্ন রহস্যপ্রেমীদের তাড়া করে ফিরছে। যদিও নতুন কর্মীদের পদচারণায় বাতিঘরটি তার গতি পেয়েছে। তারপরও ফ্লানন দ্বীপপুঞ্জ বাতিঘরের এই রহস্য আজও তদন্ত, জল্পনা ও গুজবের কাহিনী হয়েই রয়ে গেছে।