রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আল-আমিন ছাত্রলীগের মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ না করেই বাড়িতে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ৩৩১ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। সেখানে তাকে তিন ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালানো হয়। এসময় ছাত্রলীগের দুই নেতা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ডেবিট কার্ড থেকে ৪৫ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু দাবি করেছেন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে কুরিয়ারের মাধ্যমে একটি লিখিত অভিযোগ পত্র আসে। এ ঘটনায় ঐদিন সন্ধ্যায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ওই শিক্ষার্থীর বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজেলায়। তার চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে। ১৭ আগস্ট ছিল প্রথম পরীক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, কুরিয়ারের মাধ্যমে একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আল-আমিন বলেছেন, তিনি ১৭ আগস্ট পরীক্ষায় অংশ নেন। বিকেল সাড়ে চারটায় পরীক্ষা শেষে বের হওয়ার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও মতিহার হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা তাকে রবীন্দ্রভবন থেকে বঙ্গবন্ধু হলের ৩৩১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে মার্কেটিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মুমিনুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ শশী, তাকি আহমেদসহ অনেকে আসেন। তাদের সাথে কয়েক মাস ফ্রিল্যান্সিং ডিজিটাল মার্কেটিং-এর কাজ করেছিলেন আল-আমিন। কিন্তু মনোমালিন্য হওয়ায় বছরখানেক আগে তিনি কাজ ছেড়ে দেন। এ কাজের জন্য তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্র ছিল না।
অভিযোগে আল-আমিন আরও বলেন, মুমিনুর তার মাথায় দুই লিটারের পানির বোতল ও লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। তিনি একপর্যায়ে অচেতন হয়ে যান। এ সময় তার মুঠোফোন থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেন তারা। জ্ঞান ফেরার পর রাত আটটার দিকে জোরপূর্বক তার ডেবিট কার্ড নিয়ে গিয়ে ৪৫ হাজার টাকা তোলেন সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও ভাস্কর সাহা। মুমিনুর ও তার অনুসারীরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। তারা জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন এবং সেটির ভিডিও ধারণ করেন।
তারা হুমকি দিয়ে বলেন, তাদের কথার বিপক্ষে কোনো কথা বললে এবং কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তাই তিনি জীবন বাঁচানোর জন্য তারা যা বলেছেন, তাই করেছেন তিনি। পরে রাত নয়টার দিকে ছাড়া পেলে জীবন বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি শরীয়তপুরে চলে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল-আমিন বলেন, ওই রাতে তিনি অনেক ভয়ে ছিলেন। এ কারণে মুখ খুলতে পারেননি। তাই বাড়িতে এসে কুরিয়ারের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠিয়েছি। আমি এমন ভার্সিটি চাই না, যেখানে নিরাপত্তা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে মুমিনুর রহমান বলেন, আল-আমিনসহ আরও কয়েকজনকে তাদের দুরবস্থার সময় তিনি চাকরি দিয়েছিলেন। এক-দেড় বছর চাকরি করার পর আল-আমিন বললেন, তিনি বিসিএস পরীক্ষা দেবেন। আল-আমিন চলে যান। কিন্তু তারা কয়েকজন গিয়ে আরেকটি কোম্পানি খোলেন। সেখানে তার কোম্পানির ক্লায়েন্টদের নিচ্ছেন তারা। এতে তার ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ নিয়ে তারা ১৭ আগস্ট বিষয়টির সুরাহার জন্য কথা বলতে বসেছিলেন তারা। তাকে কেউই মারধর করেননি।
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মুমিনুর রহমান বলেন, সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও ভাস্কর সাহা আলোচনার সময় ছিলেন। কিন্তু পরে কী হয়েছে, এটা বলতে পারবেন না তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্তকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
মতিহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা বলেছেন, তিনিসহ অনেকেই ওই দিন আলোচনার সময় উপস্থিত ছিলেন। মুমিনুর ও আল-আমিনের মধ্যে ব্যবসায়িক একটি বিষয় ছিল। তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগটি মিথ্যা। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেছেন, কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে মুমিন-শশি ও আলআমিনের মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। গত দিন এই বিষয়টা নিয়ে টুকিটাকিতে বসে সমাধান করা হয়েছে। কিন্তু আল-আমিন বাড়িতে গিয়ে কেন যে এমন করলো বুঝতে পারছি না।
ছাত্রলীগ নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ।
প্রসঙ্গত, এই ভাস্কর সাহার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সামছুল ইসলামকে মারধর করে চাঁদাবাজির অভিযোগে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তাধীন রয়েছে।