'তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য-সহ্য একটু কম থাকে'

বিএনপির কর্মসূচিতে হামলা ও তাদের নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনায় উল্টো দলটিকে দায়ী করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা সত্ত্বেও ঢাকার বাইরে বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। যদিও ঢাকায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করছে নির্বিঘ্নে।

আধিপত্য ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে নামার কারণে এসব ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগ বলছে, হামলা-সংঘর্ষের জন্য বিএনপির উসকানি ও দায়িত্বহীনতা দায়ী।

তবে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে বিএনপিকে একচেটিয়া মাঠে থাকার সুযোগ দেবে না আওয়ামী লীগ। মুখে যাই বলা হোক না কেন ভেতরে ভেতরে তারা এ ব্যাপারে কঠোর। এটি তাদের আরেকটি কৌশল। তারই অংশ হিসেবে বিএনপির কর্মসূচি একেবারে বিনা বাধায় যেতে দিতে চায় না তারা।

এর কারণ জানিয়ে ওই নেতারা বলেছেন, বিনা বাধায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করতে থাকলে ভয়ডরহীন হয়ে পড়বে বিএনপি। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। মাঠ দখলে নিয়ে গেলে বিএনপির ভেতরে আত্মবিশ্বাস জেঁকে বসবে। চাঙ্গা হয়ে উঠবে মনোবল। তাতে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। তাই বিএনপিকে কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে, আবার মাঠ পুরো দখলে নিতে পারে এমন সুযোগ দিতে দেওয়া হবে না।

ঢাকায় বিএনপি বিনা বাধায় কর্মসূচি পালন করতে পারবে-এটাও ক্ষমতাসীনদের কৌশলেরই অংশ। সারা দেশে বাধার মুখে কর্মসূচি পালন করতে হবে। তা ছাড়া এক্ষেত্রে আরেকটি কৌশল বাস্তবায়ন করা সহজ হবে আওয়ামী লীগের পক্ষে। তা হলো সারা দেশে কর্মসূচি পালন করতে গেলে ঢাকায় বিএনপির অবস্থান দুর্বল করা যাবে। সুতরাং ঢাকায় সুযোগ  দেওয়া হলেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তেমন ঘটবে না বলে মনে করে ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগ আগস্ট মাস শোক দিবসের নানা কর্মসূচি পালন শেষে সেপ্টেম্বরে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল। অবশ্য বিএনপিকে ঠেকাতে তার আগেই তারা মাঠে নেমে পড়েছে।

লোডশেডিং, জ¦ালানি অব্যবস্থাপনা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপি গত ২২ আগস্ট থেকে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছে। দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের এই কর্মসূচির প্রথম দিন থেকেই বাধা দেওয়া, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এমনকি বিএনপির কেন্দ্রীয় কয়েক নেতার বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার পেছনে দুটি কারণ আছে বলে দাবি করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলছেন, একদিকে বিএনপি কর্মীদের উসকানি, অন্যদিকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্বহীনতাই সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার যে নির্দেশনা দলীয় সভাপতি দিয়েছেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন দাবি করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা সৃষ্টি করার ঘটনা কি আছে? শান্তিপূর্ণ কোনো কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে সরকারপ্রধান নির্দেশনা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, বিএনপির শীর্ষ সারির নেতারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে নেতাকর্মীদের কর্মসূচি পালন করার নির্দেশনা দিলে তাতে বাধা সৃষ্টি করার কথা নয়। বিএনপির কর্মসূচিগুলোতে উসকানি দিয়ে স্লোগান দেওয়া হয় ও বেফাঁস কথা বলা হয়। জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যখন বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যান, তখনই উসকানিমূলক আচরণ করেন তারা। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য-সহ্য একটু কম থাকে। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও প্রতিবাদমুখর হয়। ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেন, বিএনপির কর্মসূচি পালনের সময় উসকানিমূলক আচরণ ও বেফাঁস কথাবার্তা পরিহার করলে হামলার ঘটনা ঘটার কথা নয়।

বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে দলটির শীর্ষ একাধিক নেতা আরও বলেন, জেলা-উপজেলায় সংঘাত কেন হচ্ছে, এখানে ভিন্ন কোনো কারণ আছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত।

বিএনপি নেতাদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তারা দাবি করেন, বাড়িঘরে হামলার ঘটনা রাজনৈতিক নাও হতে পারে। এখানে সামাজিক, পারিবারিক বিরোধ থাকতে পারে। এসব বিরোধে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করা ঠিক হবে না।

ওই নেতারা আরও দাবি করেন, যশোরে রাতের অন্ধকারে বিএনপির এক নেতার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় তারাই জানিয়েছে রাতের অন্ধকারে হয়েছে। তাহলে কে হামলা করেছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে তা তো দেখা যায়নি। ফলে এ ঘটনায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করা কতখানি যুক্তিযুক্ত?

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। আমরা তা-ই মেনে চলছি।’ তিনি বলেন, ‘সারা দেশে কমপক্ষে এক হাজার ছোট শহর আছে। কোথাও সহাবস্থান আছে কোথাও আবার তা নেই। ওইসব শহরে কখন কী ঘটল সব তো জানাও সম্ভব নয়। এসব হামলায় বিএনপিও সম্পৃক্ত নেই তাও কি নিশ্চিত করে বলা যাবে? এগুলোও খতিয়ে দেখা উচিত।’ জাফরউল্যাহ আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে এসব হামলা কাক্সিক্ষত নয়।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় কর্মসূচিতে হামলা হয় না, জেলা-উপজেলায় বিএনপির কর্মসূচিতে হামলার কারণ তারা নিজেরাই।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের সব দলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য-সহ্য একটু কম। বিবেচনাবোধও কম থাকে। ফলে কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।’

এসব ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত দাবি করে হানিফ বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা উসকানিমূলক আচরণ যাতে না করে, দলের শীর্ষ নেতাদের এ ব্যাপারে তাই কর্মীদের নিষেধ করা উচিত। বিএনপির শীর্ষ নেতারা মানা করে দিলে ছোটখাটো এসব হামলা পরিহার করা সম্ভব হবে। আমরা মানা করলাম আর বিএনপি উসকানি দিল তাহলে এগুলো বন্ধ করা কঠিন হবে।’

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া যাবে না বলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন একই রকম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে কোথাও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মারমুখী নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও থাকে নীরব। শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির বিনষ্ট বা জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন প্রয়োগ করছে বা করবে।’