ইরাকের রাজধানী বাগদাদের গ্রিন জোনে শিয়া মুসলিমদের দুই গ্রুপের মধ্যে সহিংসতায় এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। ইরাকের চিকিৎসা বিভাগের এক সূত্রের বরাতে এমনটাই জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
সূত্রটি জানিয়েছে, ৩০ জন নিহত ছাড়াও শুধু গ্রিনজোনেই আরও ৭০০ জন আহত হয়েছেন, এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন ১১০ জন।
দেশটির শিয়া ধর্মীয় গুরু ও রাজনীতিবিদ মুকতাদা আল-সদর রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সোমবার ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া মুসলিম নেতা মুক্তাদা আল-সদর রাজনীতি ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরই তার অনুগামীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে শুরু করেন। এর জেরে ইরানপন্থী শিয়াদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়।
২০০৩ সালে মার্কিন অভিযানে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ইরানপন্থী শিয়ারা শক্তিশালী হয়ে উঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় মুকতাদা আল সদরের নেতৃত্বে ইরাকি জাতীয়তাবাদী শিয়াদের উত্থান ঘটে।
সহিংসতা বন্ধ ও শান্তির স্বার্থে রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেন এই শিয়া ধর্মগুরু। সেই সঙ্গে সারা দেশে তার দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেয়ারও ঘোষণা দেন তিনি। এরপর তিনি তার সমর্থকদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে অনশন শুরু করেছেন। তার রাজনীতি থেকে অব্যাহতির এই ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন সমর্থকরা।
তবে, সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে চলায় মঙ্গলবার সদর তার সমর্থকদেরকে বিক্ষোভ বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
সদর বলেন, ‘এই বিক্ষোভ আর কোনো বিপ্লব নয়, কারণ এটি তার শান্তিপূর্ণ চরিত্র হারিয়েছে। ইরাকিদের রক্ত ঝরানো নিষিদ্ধ’।
স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে সদর তার সমর্থকদেরকে বাগদাদের সুরক্ষিত গ্রিন জোনে তাদের বিক্ষোভ বন্ধ করার জন্য এক ঘন্টার সময়সীমা বেধে দিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছে এবং পার্লামেন্ট দখল করে রেখেছে।
সদর বলেন, ৬০ মিনিটের মধ্যে সংসদে অবস্থানসহ সদরপন্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার না করলে আমি নিজেই আন্দোলন ত্যাগ করব।
ওদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাগদাদে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত গ্রেগোরি গ্যালিগান। তুরস্ক সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বাগদাদের বাসিন্দাদের আজ সকালে ঘুম ভেঙেছে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে। স্থানীয় সময় সোমবার রাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘর্ষে সুরক্ষিত ও কূটনৈতিক এলাকা গ্রিন জোন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ এখনও একই মাত্রায় চলছে।
বিদেশিরা ছাড়ছে ইরাক
রাজধানী বাগদাদে কুয়েতের দূতাবাস সে দেশে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। রয়টার্সের বরাত দিয়ে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, যাদের ইরাকে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের এখন সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
সহিংসতার মধ্যে নাগরিকদের ইরাকে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। সেই সঙ্গে ইরাকমুখী সব ধরনের ফ্লাইট বাতিল করেছে প্রতিবেশী ইরান। ইরাকের সঙ্গে স্থলবন্দরও বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান।
ইরাকের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সংঘাতে জড়িয়ে পড়া সব দলকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত ২৮ জুলাই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রধানমন্ত্রী পদে মোহাম্মদ আল-সুদানির মনোনয়নের বিরোধিতা করে ইরাকের শিয়া ধর্মগুরু মুকতাদা আল সদরের সমর্থকরা বাগদাদের উচ্চ নিরাপত্তা এলাকা ভেঙে ইরাকের পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করে।
যখন শত শত বিক্ষোভকারী পার্লামেন্টে প্রবেশ করে, তখন সেখানে কোনো পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন না। বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করলেও পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ আটকাতে পারেনি।
গত বছর ১২ অক্টোবর ইরাকের সাধারণ নির্বাচনের ভোটগণনায় প্রাথমিকভাবে বড় ব্যবধানে এগিয়ে যান শিয়া ধর্মীয় নেতা মুকতাদা আল-সদরের দল। ইরানপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্বাচনের প্রাথমিক ফল প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল রেকর্ড নিম্ন ৪১ শতাংশ।