সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের মৃত্যুর কারণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের ‘শোকে’ মারা গেছেন তিনি। গর্বাচেভের এক সহকারী এমনটাই জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সোভিয়েত নেতা রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের কারণে ‘মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন’। খবর আল জাজিরার।
গত মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় মস্কোর সেন্ট্রাল ক্লিনিকাল হাসপাতালে মারা যান গর্বাচেভ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওই হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘গুরুতর ও দুরারোগ্য রোগে’ ভুগে তিরি মারা গেছেন। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এ কথাই বলা হয়েছে।
তবে ভিন্ন তথ্য সামনে নিয়ে এসেছেন পাভেল পালাঝচেঙ্কা নামে গর্বাচেভের দীর্ঘ সময়ের এক সহকারী। গর্বাচেভের সঙ্গে একটানা ৩৭ বছর কাজ করেছেন পালাঝচেঙ্কো। এমনকি তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েভ ইউনিয়নের মধ্যকার বেশ কিছু শীর্ষ বৈঠকেও তার পাশেই ছিলেন তিনি।
গর্বাচেভের মৃত্যুর পরই এক সাক্ষাৎকারে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কথা বলেছেন পালাঝচেঙ্কো। তিনি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিয়েভ-মস্কোর মধ্যকার ক্রমশ খারাপ সম্পর্কের কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন গর্বাচেভ। সবশেষ ইউক্রেন রাশিয়ার সামরিক অভিযানে তিনি ‘বিস্মিত ও মানসিকভাবে আহত’ হন।
পালাঝচেঙ্কো জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে গর্বাচেভের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন তিনি। এ সময় ইউক্রেনের ঘটনা নিয়ে গর্বাচেভের মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার বিষয়টা জানতে পারেন তিনি।
পালাঝচেঙ্কোর ভাষায়, ‘শুধুমাত্র গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে শুরু হওয়া রাশিয়ার সামরিক অভিযানই নয়, গত কয়েক বছর ধরে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের ক্রমশ অবনমন ছিল তার জন্য বড় আঘাত। এটা তাকে ভেতর থেকে মানসিকভাবে ভেঙেচুরে ফেলেছিল’।
তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার কথোপকথন থেকে আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যা ঘটছে তাতে তিনি অসন্তুষ্ট এবং হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কেবল রাশিয়ান এবং ইউক্রেনীয় জনগণের ঘনিষ্ঠতায়ই বিশ্বাস করতেন না, তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দুটি জাতি একই’।
চলতি বছরে গর্বাচেভ পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ করার সিদ্ধান্তেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন প্রকাশ্যেই।
এদিকে, মিখাইল গর্বাচেভের শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে না। সময়সূচি না মেলায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। শেষকৃত্য শেষে আগামীকাল শনিবার তাকে মস্কোর নভোদেভিচি সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হবে।
গর্বাচেভের শেষকৃত্য আয়োজনকে রাষ্ট্রীয় বলা থেকে বিরত রয়েছে ক্রেমলিন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলছেন, শেষকৃত্যে গার্ড অব অনারের মতো কিছু রাষ্ট্রীয় বিষয় থাকছে এবং এটি আয়োজনে সরকার সহযোগিতা করবে। তবে কীভাবে এটি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য থেকে আলাদা সে বিষয় তিনি বিস্তারিত বলেননি।
গর্বাচেভ ও রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। ২০ বছরেরও বেশি সময় পুতিনকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখেছেন গর্বাচেভ। এ সময়ের মধ্যে কখনো তিনি পুতিনের সমালোচনা করেছেন, আবার কখনো করেছেন প্রশংসা। বিশেষ করে স্বৈরতন্ত্র ও দুর্নীতি ইস্যুতে পুতিনের সমালোচক ছিলেন শেষ এই সোভিয়েত নেতা।
১৯৯০-র দশকের শুরুতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট শাসনের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় গর্বাচেভ পশ্চিমাদের কাছে আদর্শ। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ‘পেরেস্ত্রোইকার’ কারণে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ায় রাশিয়ায় তিনি অপ্রিয়।
রুশ ফেডারেশনের প্রথম প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেৎসিন যেভাবে রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য পেয়েছেন, গর্বাচেভের ক্ষেত্রে তেমনটি হচ্ছে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাঁর কারণে আড়ালে চলে যান গর্বাচেভ। ইয়েলেৎসিন নিজের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে পেশাদার কেজিবি গোয়েন্দা কর্মকর্তা পুতিনকে বেছে নেন।
ইয়েলেৎসিন ২০০৭ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে এক দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেন পুতিন, যা গর্বাচেভের ক্ষেত্রে হয়নি। মস্কোর ‘খ্রাইস্ট দ্য সেভিয়র’ ক্যাথেড্রালে রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি পুতিনও উপস্থিত ছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভের মৃত্যু গত শতকের ৯০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের ইতি, রাশিয়ার সেসময়কার অভ্যন্তরীণ টালমাটাল ঘটনাপ্রবাহকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
মিখাইল গর্বাচেভের মৃত্যুতে পশ্চিমের রাজনৈতিক নেতারা দলে দলে শোক প্রকাশ করছেন ও তার ভুমিকার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন।
পশ্চিমাদের কাছে তিনি ছিলেন ‘সোভিয়েতের কারাগারে বন্দি কোটি কোটি মানুষের মুক্তিদাতা’, অন্যদিকে রাশিয়ার নবীন-প্রবীণ অনেকের কাছে তিনি খলনায়ক, ‘যিনি রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন’।
প্রবাদপ্রতীম কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের গড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে পড়লে আলাদা আলাদা ১৫টি জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে, তার মধ্যে বড়টি হল আজকের রাশিয়া।