‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রে শালিক পাখিকে খাঁচায় বন্দী রাখাসহ পুড়িয়ে খাওয়ার অভিযোগে এর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহারও হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে ওই মামলা দায়ের করে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।
এর আগে পরিবেশবাদীদের দাবির মুখে গত ১১ আগস্ট সিনেমা হলে গিয়ে ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রটি দেখে তদন্ত দল জানায়—চলচ্চিত্রে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে।
সম্প্রতি মামলার কারণে বন বিভাগের কর্মকর্তাকে শোকজ করার কথা বলা হয়।
এর আগে মামলাটি প্রত্যাহার চেয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ২৩ বিশিষ্টজন।
তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, বন ও পরিবেশ রক্ষায় আইন বাস্তবায়নে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক নারগিস সুলতানা শোকজ খেলে আইন প্রণয়নকারী কেন শোকজ খাবেন না? এ ছাড়া একই আইনে যে প্রায় ১২৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তার কী হবে?
এর আগে আইনের একই ধারায় গ্রামীণফোনসহ কয়েকটি নাটক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট মামলা করে সফল হয়েছিল বলেও জানান তারা।
পরিবেশবাদীদের মধ্য কেউ কেউ বলছেন, পরিবেশ রক্ষায় বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে আসা কিছু পরিবেশবাদীর হঠাৎ করে আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শকে ভুলে ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা সম্পর্কের খাতিরেই তারা এ অবস্থান নিয়েছেন। ফলে কোনো কোনো সংগঠনের সভাপতি চলচ্চিত্রটির বিপক্ষে অবস্থান নিলেও সাধারণ সম্পাদক নিয়েছেন পক্ষে। এর ফলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মনোবল হারাবেন বলে মনে করেন তারা।
এ মামলায় ‘হাওয়া’কে নির্দোষ দাবি করা বিশিষ্টজনদের তালিকায় পরিবেশবাদীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি সুলতানা কামাল ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সেক্রেটারি ডা. লেলিন চৌধুরী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় মানবাধিকারকর্মী খুশি কবিরও রয়েছেন। এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সিনেমাটি নিয়ে পরিবেশবাদীদের এমন অবস্থানের কারণসহ মামলাকারী কর্মকর্তাকে ‘শোকজ’ কীভাবে দেখছেন পরিবেশবাদীরা—জানার চেষ্টা করেছেন এই প্রতিবেদক।
এ বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনের জোট ‘বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট’ (এনসিএ) এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘বন বিভাগ পরিবেশ রক্ষায় সমস্যাগুলো সুস্পষ্টভাবে সমাধান করতে পারে না। তবে চেষ্টা করে। ‘হাওয়া’ সিনেমা সংশ্লিষ্টরা জানেন এবং আইনের বিষয়ে অবগত রয়েছেন। পরিচালকও এক টিভি চ্যানেলকে বলেছেন আইন সম্পর্কে তিনি অবগত। এ ছাড়াও এনসিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিভিন্নভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। নিজেদের ভুল জানার পর সিনেমা কর্তৃপক্ষ অপরাধ ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। তাহলে সমস্যাটা এত দূর না গড়িয়ে সমাধানের পথে যেতে পারত’।
তিনি বলেন, ‘পরিচালক ভুল স্বীকার করার পর সমঝোতার মাধ্যমে মামলা তুলে নেয়ায় আমরা পরিবেশবাদীরা স্বাগত জানিয়েছি। তবে বন কর্মকর্তাকে শোকজ দেওয়া বা বিব্রত করা মোটেই কাম্য নয়। এমন একটি আলোচিত ঘটনার জন্য বন বিভাগকে যখন তিরস্কার করা হয়েছে, তখন আরো বড় বড় অপরাধের ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগ পিছু হটবে বা বারবার চিন্তা করবে। যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে না, তারা উৎসাহ পাবে’।
‘হাওয়া’য় আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার হাসান শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, ‘আইন ভঙ্গ হওয়ায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই মামলা হয়েছে। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ৩৩টি সংগঠনের একই দাবি ছিল। যার প্রেক্ষিতে অপরাধ দমন ইউনিট তদন্ত করেন’।
হাসান শাহরিয়ার বলেন, ‘সিনেমাটির পরিচালক ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন আইন জানতেন না। অন্যদিকে তথ্য মন্ত্রণালয় নিজের দোষ অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। এতে অপরাধ ইউনিটের মনোবল ভেঙে দিয়েছে’।
‘এতে সমাজে একটা অস্থিরতা দেখা দেবে। নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শোকজ করে আইন প্রয়োগে বাধা দেওয়া হয়েছে। সেন্সর বোর্ডকে পুনর্গঠন প্রয়োজন। পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন তাদের সেন্সর বোর্ডে যুক্ত করা প্রয়োজন। তখন সমস্যাগুলো সেন্সর বোর্ড থেকেই সমাধান হয়ে যাবে’ বলে মনে করেন তিনি।
পিপল অব অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের (প ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বিএনসিএ’র অন্যতম নেতা স্থপতি রাকিবুল হক এমিল বলেন, ‘বন উজাড় বা বন্যপ্রাণী ধ্বংস করার সঙ্গে জড়িতরা সাধারণ মানুষ নয়, সমাজের ভিআইপি লোক জড়িত থাকে। তখন জাতীয় স্বার্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শোকজ পেতে হয়, তাদের নিরুৎসাহিত হওয়া স্বাভাবিক। হতাশা ধরে বসবে তাদের। এখনো যে আপস হয়েছে, সেখানে আইন ভুল ছিল তা কিন্তু নয়। আইনের মধ্যে থেকেই সমঝোতা হয়েছে’।
‘পৃথিবীর সব দেশেই সিনেমায় পশুপাখি দেখানো হয়, সেখানে একটা পদ্ধতিও রয়েছে। তবে বাংলাদেশে তা নেই। আমি জানি না শোকজের জন্য শিল্পীরা পুশ করেছেন কিনা। যদি পুশ করে থাকেন তবে এটা ইগোর একটা লড়াই বলে মনে হবে’।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর যুগ্ম সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘মামলা চলমান, এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি, তার আগেই তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজের নামে হুমকি দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত অন্যায়। আমরা পরিবেশবাদীরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যই ‘হাওয়া’ সিনেমার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। এটা যে ‘হাওয়া’র জন্য বদনাম, তা নয়। এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দেশে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। এখন যে হুমকি দেওয়া হয়েছে এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে’।'
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘বন বিভাগের প্রচুর ব্যর্থতা আছে। তবে সম্প্রতি ভালো কাজের মধ্যে অন্যতম বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। কারো বাড়িতে প্রাণী বন্দী থাকলে ৯৯৯-এ কল দেওয়ার পর এ ইউনিটকে খবর পাঠানো হয়। তারা দেরি না করেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে প্রাণীটি যেন মারা না যায়, উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ইউনিটে মাত্র সাতজন কাজ করলেও তারা জেলা প্রতিনিধিদের নিয়ে কাজ করেন’।
‘হাওয়া’ ইস্যুর আগে গ্রামীণফোনসহ কয়েকটি নাটকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একজন টেলিভিশন প্রেজেন্টারের বিরুদ্ধেও তারা ব্যবস্থা নিয়েছিল। একই আইনে প্রায় ১২৫ টির মতো মামলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন জাগে, এত দিন অপরাধ হলেও আজ অপরাধ হচ্ছে না কেন? ‘হাওয়া’র পেছনে প্রযোজক কোম্পানি বড় বলে কি সমস্যা? নাকি সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষের আবেগী মন্তব্যের জন্য এ অবস্থা? নাকি বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে দেখেই এ ব্যবস্থা। তাহলে সেলিব্রেটিরা অপরাধ করলে অপরাধ বলে গণ্য হবে না?’
পরিবেশ বিষয়ক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঞ্জিল মোরশেদ বলেন, ‘আইনে বলা আছে বন্যপ্রাণী রক্ষায় কখন কী করা প্রয়োজন। কেউ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি অবহেলা করেন, তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় হয়তো সে কারণেই শোকজ করেছেন। শোকজের জবাবে—যদি আইন অনুযায়ী কাজ করে থাকেন, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। প্রতিটি বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে কাজ করা দরকার। মানুষ প্রতিদিন হাজার হাজার পাখি শিকার করছে। সিনেমার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া অতটা সমীচীন হয়নি’।
এর আগে একই আইনে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামীণফোন একটা কমার্শিয়াল এরিয়া কিন্তু ‘হাওয়া’ ইনক্রিয়েশন এরিয়া। আইনে বলা আছে প্রাণী নিধন করা যাবে না। এটা স্বাভাবিক সময়ের জন্য। ওখানে বলা হয়নি সিনেমার মধ্যে করলে অপরাধ হবে।
প্রয়োজনে আইনকে নাটক-সিনেমার আওতামুক্ত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশবাদী আদনান আজাদ আরিফ বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তাকে হেয় করার জন্যই শোকজ করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় যে অপরাধ বাড়বে, তা তো উদ্বেগের। তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। অনেকেই মনে করেছে, ‘হাওয়া’ সিনেমায় শালিক বন্দী করায় ২০ কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টা এমন নয় যে এ টাকা খেয়ে ফেলবেন। এ টাকায় সচেতনতার প্রচারণা চালাতেন। এ মামলার মাধ্যমে মানুষ জেনেছে বন্যপ্রাণী আটক রাখা অপরাধ, কিন্তু শোকজের মাধ্যমে মানুষ জানবে, এটা অপরাধ না’।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সাবেক পরিচালক এ এস এম জহির আকন বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায়, প্রকৃতি রক্ষায় সরকারের অনেক বিভাগ রয়েছে। যেখানে শৃঙ্খলা বাস্তবায়নে আইন লিপিবদ্ধ রয়েছে। আমি দেড় মাস আগে ওখানে ছিলাম, সে কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। বক্তব্য দেওয়ার মতো কিছু নেই। আমরা যেহেতু সরকারের কাজ করি, এটা নিয়ে অনেক কিছু হয়ে গেলেও সব কথা বলা যায় না। সাবেক হিসাবেও কিছু বলতে পারব না। কারণ, এটা বর্তমানে জাতীয় একটি ইস্যু। আগে হলে বলতে পারতাম, এখন আর বলতে পারছি না’।
সাবেক বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শোকজের ফলে এ ইউনিটের কাজের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। যেহেতু আইন আছে, অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে কতটা প্রভাব পড়বে তা বলা কঠিন। ‘হওয়া’র যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবে এটা সবার জন্য একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে’।
সিনেমাকে আইনের বাইরে রাখা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিনেমা আইনের বাইরে রাখা যৌক্তিক নয়। তবে সিনেমায় বন্যপ্রাণী দেখানোর ক্ষেত্রে ডিসক্লেইমার দেওয়া যেতে পারে। বলে দিতে হবে—এখানে বন্যপ্রাণীর কোনো ক্ষতি হয়নি। বন্যপ্রাণী নিয়ে কোনো নেতিবাচক দৃশ্য দেখানো যাবে না‘।
এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘সত্যিই যদি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করা হয়ে থাকে তবে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। এমন আয়োজনের (ছবি) মধ্য দিয়ে উৎসাহিত করা মোটেই উচিত হবে না’।
এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে এ বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। সংগঠনের কেউ যদি পক্ষে অবস্থান নেন, তা তার ব্যক্তিগত অবস্থান, ব্যক্তিগত মন্তব্য। কেউ যদি কিছু বলেও থাকেন, তা নিয়ে আমার মন্তব্য নেই। কেউ জেনে-শুনে বিপক্ষে অবস্থান নিলে পরিবেশ আন্দোলনকারী হিসাবে নৈতিকতার প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ যদি বক্তব্য দিয়ে থাকেন, কিছু বলে থাকেন, তা তার ব্যক্তিগত মন্তব্য’।
২৩ বিশিষ্টজনের মধ্যে আবু নাসেরের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন এর (পবা) সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী ‘হাওয়া’ সিনেমার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. লেলিন বলেন, ‘সিনেমার মৃত্যু আর মানুষ হত্যা করা তো এক নয়। সিনেমায় পাখি হত্যা করার দৃশ্য দেখানো আর বাস্তবে পাখি হত্যা করা কি এক? বন বিভাগের চারজন কর্মকর্তা গিয়েছেন ছবিটি দেখার জন্য। তারা দেখে মনে করলেন—এটা আইনবিরোধী। এসব কর্মকর্তার ট্রেনিং তো সিনেমা দেখা বা চিত্রাঙ্কনের জন্য হয়নি। ওদের ট্রেনিং হয়েছে বন্যপ্রাণীকে দেখাশোনা করার জন্য’।
‘হাওয়া আইনসম্মত কিনা, সামাজিক রুচিসম্মত কিনা, এসব দেখার জন্য রয়েছে সেন্সর বোর্ড। সেখানে নানা জায়গার (প্রফেশনের) মানুষ রয়েছে, ডাক্তারও রয়েছে। যদি বন বিভাগ মনে করে মামলা করা দরকার, তবে সেন্সর বোর্ডের বিরুদ্ধে করা দরকার। কারণ, তারা ছাড়পত্র দেওয়ার পরই ছবিটা এসেছে। এখানে সেন্সর বোর্ড দায়ী’ বলে জানান ডা. লেলিন চৌধুরী।
'হাওয়া' সিনেমার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানোদের মধ্যে 'বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন' এর (বাপা) সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের নামও রয়েছে। একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাপা’র সাংগঠনিক অবস্থান জানতে চাইলে নির্বাহী সহসভাপতি ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘পাখি নিয়ে আমাদের খুব একটা কাজ নেই। পরিবেশ বিষয়ই তো অনেক। সেসবে টাকা-পয়সার বিষয় থাকে, আমরা যাই না’।
‘হাওয়া’ সিনেমায় আইন লঙ্ঘন নিয়ে বাপার এই নির্বাহী সহসভাপতি বলেন, ‘আমার মতে এখানে আইনের ব্যত্যয় হয়েছে নিশ্চয়ই। আমি পত্রিকায়ও দেখেছি। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে আমারও ধারণা ছিল আইনের লঙ্ঘন হয়নি। পরবর্তীতে অবশ্য দেখা গেল আইন লঙ্ঘন হয়েছে। এটা নিয়ে আমাদের সংগঠনেও তেমন আলোচনা হয়নি। বাপা সাংগঠনিকভাবেও কোনো কিছু জানায়নি। কে কী বলেছেন সেটা সংগঠনের বক্তব্য না। আমাদের কাজ সচেতনতা তৈরি’।
বাপা সভাপতির বন্যপ্রাণীর অধিকারের বিপক্ষে অবস্থান কেন, এমন প্রশ্নে ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমাদের সভাপতি তো লন্ডনে ছিলেন। আসছেন মাত্র তিন-চার দিন আগে। তিনি কী বলেছেন, তা জানা নেই। এটা নিয়ে আমাদের সংগঠনে কোনোপ্রকার আলোচনাও হয়নি’।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আইন লঙ্ঘন করলে অবশ্যই আইনের আওতায় আসা দরকার। আইনের কথায় আসলে বন বিভাগ যে দুর্নীতি করেছে, সে বিষয়ে আমরা অবগত, তার মানে বন বিভাগের কথা কেউই শুনবে না এমনটা নয়। বিশ্বের বহু দেশেই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীকে যেন হত্যায় উৎসাহিত করা না হয় তার আইন রয়েছে। অবশ্যই সেন্সর বোর্ডকে স্পষ্ট করে বলে দিতে হবে এটা যে দেশের আইনবিরোধী’।
ভবিষ্যতে এমন বিষয় দেখার ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ডকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘হাওয়া’ সিনেমায় গালাগালি ব্যবহারের পর কেন সিনেমাটিকে ইউ ১৮ প্লাস (U 18 +) গ্রেডিং দেওয়া হলো না এবং পাখির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সেন্সর বোর্ড সদস্য মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘অনেকে আমাকে এই অভিযোগটি করেছেন। সেন্সর বোর্ডে সিনেমাটির যে কপি জমা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে অতিরিক্ত গালি ছিল না। অল্প কিছু গালি ছিল। সাধারণত চলতে-ফিরতে আমরা যে ধরনের গালি দিয়ে থাকি। সেসব গালি আমাদের কাছে আপত্তিজনক মনে হয়নি। স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাই সেন্সর দিয়েছি। তবে সিনেমা হলে সেন্সর কপি চালানো হয়েছে কি না, সেটা বলতে পারছি না’।
কয়েকজন পরিবেশবাদীর সেন্সর বোর্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রসঙ্গে বোর্ডের অপর সদস্য অরুনা বিশ্বাস বলেন, ‘এসব নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। এসবের দায়িত্ব নিতে চাই না। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সচিবসহ যারা আছেন, তারাই দায়িত্ব নেবেন। সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসাবে সিনেমাটি দেখার পর আমরা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই। তারপর তারাই (সচিবসহ অন্যরা) সিদ্ধান্ত নেন’।
অরুনা বিশ্বাস বলেন, ‘যেদিন সেন্সর বোর্ডে ছবিটা প্রদর্শন করা হয়েছিল, সেদিন আমি অসুস্থ ছিলাম। পুরো ছবিটা আমি দেখিনি। ছবিটা হলে দেখেছি। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে চাই না, এর আগেও এমন কথা বলে বিতর্ক হয়েছে। অনেকে এসব নিয়ে বিতর্ক তোলেন। সাংবাদিকদের আমরা হেল্প করতে চাই, কিন্তু অনেক সময় তারা এর দায় আমাদেরই দিয়ে দেন।’
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে করা মামলা প্রত্যাহার ছাড়াও শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো ২৩ বিশিষ্টজন হলেন—বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রামেন্দু মজুমদার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সদস্যসচিব ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, মহিলা পরিষদ সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি এস এম এ সবুর, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধ্যাপক এম এম আকাশ, রোবায়েত ফেরদৌস, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট পারভেজ হাসেম, জাতীয় শ্রমিক জোটের কার্যকরী সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী ড. সেলু বাসিত, সংস্কৃতি কর্মী এ কে আজাদ, উঠোন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অলক দাসগুপ্ত, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি আবদুল মোতালেব জুয়েল এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বিসিএল) সাধারণ সম্পাদক গৌতম শীল।
উল্লেখ্য, বন্যপ্রাণী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ‘হাওয়া’ সিনেমার ছাড়পত্র বাতিল করে দেশে ও দেশের বাইরে প্রচার, সম্প্রচার ও প্রদর্শন সম্পূর্ণরূপে বন্ধের জন্য লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে ইউনিটের সদস্য, আইনজীবী ও পরিবেশবিদদের সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সাত দিনের সময়ও দেওয়া হয়। পাশাপাশি নোটিশে ভবিষ্যতে কোনো সিনেমার ছাড়পত্র প্রদানের আগে চলচ্চিত্রটিতে যেন সহিংসতাপূর্ণ খুনের দৃশ্য, অশ্লীল গালি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ এর কোনো ধারার লঙ্ঘন না হয়, সে ব্যাপারে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে বলা হয়।
গত ২২ আগস্ট রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মকবুল হোসেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মুহ. সাইফুল্লাহকে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে মেজবাউর রহমান সুমন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্রে ফিকশন করতে গিয়ে বন্যপ্রাণী দেখানো হয়, সেগুলোকে হত্যা করার মতো দৃশ্য থাকে। তাই বলে সত্যি সত্যি তো প্রাণী হত্যা করা হয় না। এটা তো একটা চলচ্চিত্র, কোনো ডকুমেন্টারি নয়। সেখানে একজন জেলে কীভাবে জীবনযাপন করে, তারই অংশ হিসাবে ওই পাখি দেখানো হয়েছে।
পাখি হত্যা করে খাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরকম কোনো কিছুর তো প্রশ্নই ওঠে না। সেখানে আসলে মুরগি খাওয়ানো হয়েছে। এখানে পজিটিভভাবে চরিত্রটা দেখানো হয়নি। একটি নেতিবাচক চরিত্রের, খারাপ মানুষের দৃশ্যায়নের অংশ হিসাবে পুরো ঘটনাটি দেখানো হয়েছে। ফলে সেটা দেখে কেউ এ ধরনের কাজে উৎসাহিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, সবচেয়ে বেশি বন্যপ্রাণী আটকে রেখে প্রদর্শন করা হয় চিড়িয়াখানায়। তাহলে সেগুলো মুক্তির জন্য কেন তারা দাবি তুলছেন না?