এমন রাত হবে জানা ছিল না

টানা চার ম্যাচ লংকান অধিনায়ক দাসুন শানাকা টস জিতেন। সেই তিনিই কিনা এশিয়া কাপের ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টস হেরে যান। আর তাতেই হতাশার মেঘ জমা হলো শ্রীলংকার সমর্থকদের মনের আকাশে। শিরোপা হারটা তারা তখনই দেখে ফেলেছিলেন। তবে অধিনায়ক ছিলেন আত্মবিশ্বাসী।

টস হারের পর সঞ্চালকের কাছে শানাকা বলেছিলেন, ‘টস জিতলে আমরাও বোলিং করতাম। কিন্তু ফাইনাল হওয়ায় আগে ব্যাট পেয়ে আমরা খুশি। টুর্নামেন্টে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি, এর ধারাবাহিকতা ফাইনালে রাখতে চাই। সবচেয়ে বড় ইতিবাচক হলো ব্যাটসম্যানরা ফর্মে ফিরেছে, বিশেষ করে ওপেনাররা। বোলাররাও দুর্দান্ত। বিশ্বকাপের আগে ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। এশিয়া কাপের ফাইনালে আমাদের রেকর্ড ভালো। আরেকবার চ্যাম্পিয়নের অপেক্ষায় আছি আমরা।’

একজন দলনেতার এমন কথার পর সমর্থকরা হয়তো ঠাট্টা আর খিল্লিতে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু ড্রেসিং রুমে থাকা তার সতীর্থতরা নিশ্চয়ই মনোবল হারাননি। অধিনায়কের আশার বাণী নিশ্চতভাবে আত্মবিশ্বাস জোগায়।

বক্তব্যের শুরুতে ‘ফাইনালে আগে ব্যাট পেয়ে আমরা খুশি’ এবং শেষ লাইন ‘টুর্নামেন্টের ফাইনালে আমাদের রেকর্ড ভালো, আরেকবার চ্যাম্পিয়নের অপেক্ষা’। এ দুটো লাইনই বলে দেয় পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হয়। প্রতিপক্ষকে ‘মাইন্ড গেমে’ কিভাবে পরাস্ত করতে হয়। লংকান এই টিমটা যেন সেটাই করেছে।

তবে মাঠে নামার পর লংকান সমর্থকদের হতাশই হওয়ার কথা। শুরুতেই নাসিম শাহর দারুণ এক ডেলিভারিতে বোল্ড। তারপর ১০ ওভার শেষে মাত্র ৬৭ রান, নেই টপ অর্ডারের পাঁচ ব্যাটার। এমন পরিস্থিতি থেকে তো জয়ের চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে হয়, সম্মানজনক একটা সংগ্রহে লড়াই করার মতো একটা লক্ষ্য দিতে পারার চিন্তাতেই মগ্ন থাকে বেশিরভাগ ক্রিকেটাররা।

কিন্তু শ্রীলংকা দল সেখান থেকে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাজপাকসে যেভাবে চার-ছক্কার তান্ডবে মাতিয়ে তুলেছিলেন দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, তা অবিশ্বাস্য। যা দেখে মনে হয়েছে, ফাইনাল আর জেতা নয়, উপভোগ করতেই ফিল ফ্রি হয়ে ব্যাট করছিলেন লংকানরা। তাতে রাজাপাকসে খেলেন ৪৫ বলে ৭১ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস। সঙ্গে দুটি অর্ধশতরানের রানের জুটি বাধেন হাসারাঙ্গা ও চামিকা করুনারত্নের সঙ্গে। আর তাতেই শেষ ১০ ওভারে ১০৩ রান তুলে নেয় শ্রীলংকা। পেয়ে যায় ১৭০ রানের বড় লক্ষ্য। শেষ ৬০ বলে উইকেটও তারা হারায় মাত্র একটি।

পাকিস্তানের ১৭১ রানে লক্ষ্য তাড়ায় শুরুর ওভারটা ভালো হয়নি লংকানদের। ১১ বলে ওভার শেষ করা মাধুশাংকাও ঘুরে দাঁড়ান পরের ওভারেই। তৃতীয় ওভারের জোড়া আঘাতের পর রিজওয়ান ও ইফতিখারের ব্যাটে ফের পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে যায় ম্যাচ। ১৬ ওভার পর্যন্ত যা তাদের দিকেই ছিল। কিন্তু ১৭তম ওভারে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ডি সিলভা যেভাবে এলেন, তাতে ম্যাচ পুরোটাই লংকানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আগের তিন ওভারে যিনি কোনো উইকেটই পাননি। সেই বোলার নিজের শেষ ওভারে শিকার করেন পাকিস্তানের বিপজ্জনক তিন ব্যাটারকে। তাতেই যেন চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান। সেই চাপ আর সামলে উঠতে পারেনি তারা।

পাকিস্তান অবশ্য বোলিং ইনিংস থেকেই চাপে ছিল। শাদাব খান ক্যাচ মিস করলে জীবন পেয়েছিলেন রাজাপাকসে। সেই রাজাপাকসে শেষ বল অবধি ছিলেন অপরাজিত। যখন ব্যাটিং তান্ডব চালাচ্ছিলেন তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্রেক-থ্রো। কিন্তু সেটা আর পায়নি পাকিস্তান। যেন চাপের মুখে ছিল পাক ফিল্ডাররা। যার বোঝা বইতে পারছিল না তারা।

অথচ ইনিংসের শুরু থেকেই চাপেই ছিল শ্রীলংকা। নাহ! ভুল বললাম। চাপটা তাদের টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১০৫ রানে অলআউটের পর ৫৯ বল বাকি থাকতেই ৮ উইকেটে হার দিয়ে এশিয়া কাপের মিশন শুরু হয়েছিল লংকানদের। তারপর বাংলাদেশ ম্যাচের আগে বাকযুদ্ধ মাঠের লড়াই থেকেও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। অবশেষে বাংলাদেশের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয় দিয়েই তারা ঘুরে দাঁড়ায় টুর্নামেন্টে। এরপর আর কোনো ম্যাচ না হেরে নিশ্চিত করে ফাইনাল।

ফাইনালে আবার শুরু থেকেই চাপ। টস হারের ধাক্কা সামালাতে না সামলাতে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্রুত ওপেনারদের হারানোটা সবচেয়ে বড় চাপ লংকানদের জন্য। কারণ টুর্নামেন্টের ৪৫ শতাংশ রানই শানাকাদের স্কোর বোর্ডে যোগ করেছেন মেন্ডিস ও নিশাংকারা। সেই দুই উদ্বোধনী ব্যাটারের ‍উইকেট হারিয়ে চাপেই পড়েছিল। স্কোরবোর্ডে ১০ ওভার শেষে ৫ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৬৭ রানে সেই চাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সে চাপকে একপাশে রেখে কত দারুণভাবেই না তারা ঘুরে দাঁড়ায়!

প্রত্যেকটা চাপ দারুণভাবে সামলেছে লংকানরা, খাঁদের কিনারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বদলে দিয়েছে ম্যাচের চিত্রপট। সেই উদ্বোধনী ম্যাচের শ্রীলংকা দলকে দেখে যেমন কেউ ভাবেনি এই দল ফাইনাল খেলবে। তেমনি রবিবার রাতে দুবাইয়ে লংকানদের ৫ উইকেটে ৫৮ রান স্কোরবোর্ড দেখেও কেউ ভাবেনি তারা শিরোপাও জিতে ফেলবে। কিন্তু দাসুন শানাকারাই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতলেন, শ্রীলংকার মাথায়ই উঠলো এশিয়া সেরার মুকুট।

দুবাইয়ে রবিবার রাতে ফাইনাল দেখার পর শ্রীলংকা সমর্থকরা নিশ্চয়ই গুণ গুণ করে গেয়ে উঠতে পারেন শিরোনামহীনের, ‘এ রাতে… এমন রাত হবে জানা ছিল না।’