এমপি লিটন হত্যা

ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকার আসামি চন্দন কুমার গ্রেপ্তার

বহুল আলোচিত গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকারদলীয় সাবেক এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সমন্বয়কারী ও ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তার নাম চন্দন কুমার রায়। গতকাল রবিবার রাতে সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আজ সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়।

র‍্যাব জানায়, ২০১৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এলাকায় নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় তৎকালীন গাইবান্ধা-১ আসনের (সুন্দরগঞ্জ) আসনের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট বোন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। একজন সংসদ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তখন দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের তৈরি হয়। দায়েরকৃত হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা ৩০ এপ্রিল ২০১৭ তারিখ মূল পরিকল্পনাকারী আবদুল কাদের খানসহ আটজনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। যার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে প্রধান সমন্বয়কারী চন্দন কুমার রায় ব্যতীত বাকি সাতজন গ্রেপ্তার হয়। পরবর্তীতে ২৮ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ বিচার কার্যক্রম শেষে গ্রেপ্তারকৃত ৬ জন এবং পলাতক আসামি চন্দনসহ ৭ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন বিজ্ঞ আদালত। অপর একজন আসামি সুবল চন্দ্র কারাগারে বিচারাধীন থাকাকালীন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পলাতক চন্দন কুমার রায়কে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোল কর্তৃক রেড নোটিশ জারি করা হয়। 

এরই ধারাবাহিকতায় গতরাতে র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-৩ ও র‌্যাব-৬ এর যৌথ অভিযানে সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকা হতে উক্ত হত্যা মামলার প্রধান সমন্বয়কারী ও ইন্টারপোল কর্তৃক রেড নোটিশ জারিকৃত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি চন্দন কুমার রায়কে (৪৩) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি গাইবান্ধা জেলার পল্লি এলাকার সুশীল চন্দ্র বর্মণের ছেলে।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ সংসদীয় আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল কাদের খানের পরিকল্পনাতে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। আবদুল কাদের খান ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুন্দরগঞ্জ এলাকায় নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার দুর্নীতির বিষয়ে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন অভিযোগ উত্থাপন করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ আসন হতে নিহত মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন তৎকালীন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। পূর্বের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও তৎকালীন সংসদ সদস্যকে সরিয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য হওয়ার লোভে মূলত হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে আবদুল কাদের খান। ২০১৬ সালে প্রথম দিকে এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে গ্রেপ্তারকৃত চন্দন কুমার রায়কে জানান আবদুল কাদের খান। গ্রেপ্তারকৃত চন্দন ও আবদুল কাদের খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে ২০১৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর এমপি লিটন’কে তার নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জানা যায় যে, গ্রেপ্তারকৃত চন্দন কুমার রায় সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগ এর সহ-দপ্তর বিষয়ক সম্পাদক ছিল। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময় এমপি লিটন এর সমর্থিত লোকজনের সঙ্গে তার মারামারির ঘটনা ঘটে এবং গ্রেপ্তারকৃত চন্দন গুরুতর আহত হয়। গ্রেপ্তারকৃত চন্দনের ভাষ্যমতে, এমপি লিটনের প্ররোচনায় একই সময়ে একটি মামলার আসামি দেখিয়ে তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হয় এবং উক্ত মামলায় গ্রেপ্তারকৃত চন্দন ১৯ দিন কারাভোগ করে। তার বিরুদ্ধে থাকা চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য মামলা হতে অব্যাহতি পেতে সে এমপি লিটনের সহযোগিতা চায়; কিন্তু এমপি লিটন তাকে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বলায় সে এমপি লিটনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজির অভিযোগে ২০১৬ সালের প্রথমদিকে এমপি লিটন তাকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে আবদুল কাদের খানের পিএস ও এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী শামসুজ্জোহার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে আবদুল কাদের খানের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। চন্দনের ভগ্নিপতি সুবল রায় এমপি লিটনের বাড়ির দারোয়ান হিসেবে কাজ করার সুবাদে এমপি লিটনের গমনাগমনের বিষয়ে তথ্য জানা সহজ ছিল চন্দনের। এমপি লিটনকে হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় আবদুল কাদের খান গ্রেপ্তারকৃত চন্দনের সহযোগিতায় হত্যাকাণ্ডের নতুন পরিকল্পনা করেন বলে জানায়।

এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত চন্দন প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এমপি লিটনের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে আবদুল কাদের খান ও হত্যাকাণ্ড জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের তথ্য প্রদান করত গ্রেপ্তারকৃত চন্দন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড তাদের সহযোগী মেহেদী, শাহীন, রানা, শামসুজ্জোহা ও ড্রাইভার হান্নান অস্ত্র চালানো ও হত্যাকা-ের পর দ্রুত পলায়েনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চন্দন এমপি লিটনের ঢাকা হতে গাইবান্ধা আগমনের তথ্য দেয়। তারা মাঝপথে হত্যার পরিকল্পনা নিলেও এমপি লিটন গাবতলী এসে ফিরে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তারা এমপি লিটন’কে তার নিজ বাড়িতেই হত্যার পরিকল্পনা করে। সেই মোতাবেক ঘটনার দিন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ লিটনের চাচাতো ভাই সুবল এবং গ্রেপ্তারকৃত চন্দন বাড়িতে অবস্থান করে এবং এমপি লিটন কখন কি অবস্থায় থাকে ওই সংক্রান্ত খোঁজখবর অন্যান্যদের দিতে থাকে। ওই দিন বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত জানায় যে, এমপি লিটন তার নিজ বাড়িতে একা অবস্থান করছে। পরিকল্পনা মোতাবেক হত্যাকারী শাহীন, রানা ও মেহেদী মোটরসাইকেলযোগে এমপি লিটনের বাড়িতে গমন করে এবং নৃশংসভাবে গুলি করে কিলিং মিশন সম্পন্ন করে। হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত আবদুল কাদের খানসহ জড়িত ০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও গ্রেপ্তারকৃত চন্দন পার্শ্ববর্তী দেশে আত্মগোপন করায় সে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। হত্যাকাণ্ড-ের আনুমানিক ১৫/১৬ দিন পর সে তার আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় পার্শ্ববর্তী দেশে আত্মগোপন করে। 

জানা যায় যে, গ্রেপ্তারকৃত চন্দন কুমার রায় ২০১০ সালের দিকে রাজধানীর একটি অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করে। ০২ বছর সাংবাদিকতা করার পর গাইবান্ধা ফিরে স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর চন্দন পার্শ্ববর্তী দেশে পলায়ন করে এবং নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে শাওন রায় নামে ভুয়া নাগরিকত্ব, আঁধার/রেশন কার্ড করে সেখানে অবস্থান করে। পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানকালীন সে রংপুর ও গাইবান্ধা সীমান্ত নিকটবর্তী হওয়ায় সে সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের চালান বাংলাদেশে পাঠাত। সম্প্রতি মাদক সংক্রান্ত কাজে সে কিছুদিন যাবৎ সাতক্ষীরায় সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে উক্ত তথ্যভিত্তিক সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী ভোমরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। মাদকের অর্থ সংগ্রহ, মাদকের ব্যবসা তদারকি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সময়ে সে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মাদক চোরাচালান সংক্রান্ত কার্যক্রম শেষে পুনরায় পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যেত বলে জানায়। 
 
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।