জ্ঞানের সাগর দয়ার সাগর

ঈশ্বরচন্দ্রের নামের সঙ্গে বিদ্যাসাগর এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আজ আর বোঝার উপায় নেই বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্রের উপাধি এবং তার প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র শুধু বিদ্যাসাগর হিসেবেই পরিচিত নন, সাধারণ মানুষের ‘দয়ার সাগর’ তিনি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘জ্ঞান ও মনীষার জন্য ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি তিনি (ঈশ্বরচন্দ্র) তার শিক্ষকদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কিন্তু তার সাধারণ দেশবাসী তাকে আরেকটি উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘দয়ার সাগর’ নামেই পরিচিত। এই উপাধি যে নিছক উপাধি নয়, সেটি ব্যাখ্যাও করেছেন সুনীতিকুমার। তিনি বলেন, ‘এই একটি উপাধির মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের মস্ত বড় একটি দিক উদঘাটিত হয়েছে। একদিকে তিনি সুপ-িত ও শিক্ষাব্রতী, তার যুক্তিবাদী মননের ঔজ্জ্বল্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রত্যেকটি আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন, অন্যদিকে তার হৃদয় দুস্থ মানবতার জন্য করুণায় বিগলিত। বিদ্যাসাগরের একটি মহৎ হৃদয় ছিল, যা আত্মমর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল; কখনো কোনো অন্যায়, দম্ভ বা ঔদ্ধত্যের কাছে তিনি মাথানত করেননি। এমনকি শাসক ব্রিটিশ রাজপুরুষও তাকে অবহেলা করতে পারেনি।’

ঈশ্বরচন্দ্র পাঁচ বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় পড়ালেখা শুরু করেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব প্রতিভাবান। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দুই বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, ইংরেজিসহ নানা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। প্রতি বছরই তিনি বৃত্তি, গ্রন্থ ও আর্থিক পুরস্কার পান। তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হওয়ার পর সব শ্রেণির হিন্দুদের জন্য কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। ইংরেজি ভাষা শেখাকে তিনি বাধ্যতামূলক করেন এবং বাংলা শিক্ষার ওপরও জোর দেন। তিনি শিক্ষাবিস্তারের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। বিভিন্ন জেলায় ২০টি বিদ্যালয় ও ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। হিন্দুসমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টায় বিধবাবিবাহ চালু হয়। বিধবাবিবাহ আইনের জন্য তিনি সরকারের কাছে ২৮ বার আবেদন করেছিলেন, জোগাড় করেছিলেন ৫৫ হাজার মানুষের স্বাক্ষর। এ ছাড়া বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ এবং স্ত্রী শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি আন্দোলন করেছেন। সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে তার অবদান অপরিসীম।

বাংলা ভাষার আধুনিকায়নে বিদ্যাসাগরের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, সেখানে পড়ানোর জন্য একের পর এক লিখেছেন পাঠ্যপুস্তক। সংস্কৃতসহ ইংরেজি প্রভৃতি ভাষার চিরায়ত সাহিত্যকে বাংলায় রূপান্তরের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছেন ‘যথার্থ মানুষ’। বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন খুব প্রণিধানযোগ্য, ‘বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দু-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’