‘কেবল সেবা নয়, মানুষকে দাও তোমার হৃদয়। হৃদয়হীন সেবা নয়, তারা চায় তোমার অন্তরের স্পর্শ।’ হৃদ্যতাপূর্ণ এমন সেবা দিয়েই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। মানুষের হাসিই ছিল তার আনন্দ, মানুষের কল্যাণই ছিল তার ব্রত। তাকে বিশ্বশান্তির পায়রা বলে অভিহিত করা হতো।
মাদার তেরেসার আসল নাম অ্যাগনিস গঞ্জা বোজাঝিউ। মহীয়সী এই নারী জন্মগ্রহণ করেন ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট। তিনি ছিলেন নিকোলো ও দ্রানা বয়াজুর কনিষ্ঠ সন্তান। মাত্র ৮ বছর বয়সে বাবা হারান তিনি। বাবার মৃত্যুর পর তার মা তাকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালন-পালন করেন পরম যত্নে। ছোট্ট অ্যাগনেস মিশনারিদের জীবন ও কাজকর্মের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসতেন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি ধর্মীয় জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে একজন মিশনারি হিসেবে যোগ দেন সিস্টার্স অব লোরেটো সংস্থায়। এরপর তার মা আর বোনদের সঙ্গে আর কোনোদিন তার দেখাটা পর্যন্ত হয়নি।
১৯২৯ সালে ভারতে এসে দার্জিলিংয়ে নবদীক্ষিত হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। পোশাক হিসেবে বেছে নেন নীলপাড়ের একটি সাধারণ সাদা সুতির কাপড়। এসময় ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, বস্তি এলাকায় কাজ শুরু করেন।
১৯৫০ সালে কলকাতায় তিনি মিশনারিজ অফ চ্যারিটি নামে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কলকাতার ‘স্বর্গীয় টেরিজা’ (Blessed Teresa of Calcutta) নামে পরিচিত হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষের পাশে। একাত্তরের ডিসেম্বরে মাদার তেরেসা খুলনা ও ঢাকার কয়েকটি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এসব ক্যাম্পে পাকসেনারা একটানা বাংলাদেশি নারীদের ওপর অত্যাচার করে আসছিল। এসব দেখে মুষড়ে পড়েন তিনি। ঢাকায় ফিরে খোলেন ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজ’-এর একটি শাখা। তখন বেশিরভাগ যুদ্ধশিশুকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো, ফেলে দেওয়া হতো ডাস্টবিনে। মাদার তেরেসা ওই সময় পরম মমতায় যুদ্ধ শিশুদের কোলে তুলে নেন। ১৯৭৯ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি তার সেবাকার্যের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার ও ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন ’ লাভ করেন। বহু পুরস্কার পেলেও এই নিয়ে তার কোনো গর্ব ছিল না। বরং তিনি পুরস্কার হাতে নিয়ে বিব্রত কণ্ঠে বলতেন, ‘আমি অতি ক্ষুদ্র। আমার শক্তি হচ্ছে আমার কর্মীবাহিনী আর জনগণের ভালোবাসা। এই পুরস্কার তো তাদের প্রাপ্য!’
তিনি শত কষ্টেও নিজে হাসিমুখ নিয়ে থাকতেন। নিজের সহকর্মী সেবক-সেবিকাদেরও হাসিমুখে সেবাদানের কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘তুমি যখন কারও সঙ্গে দেখা করো তখন হাসিমুখ নিয়েই তার সামনে যাও। কেননা হাস্যোজ্জ্বল মুখ হলো ভালোবাসার শুরু।’ ঈশ্বর যা দিয়েছেন তা নিয়েই আনন্দে জীবনযাপনে উৎসাহিত করেছেন তিনি। তিনি বলতেন, আনন্দই প্রার্থনা, আনন্দই শক্তি, আনন্দই ভালোবাসা। ভালো কাজ করার জন্য ধনী হতে হবে বা ক্ষমতাশালী হতে হবে তা তিনি বিশ্বাস করতেন না। সামর্থ্য অল্প হলেও ভালো কাজ করা সম্ভব তা বোঝাতে তিনি বলতেন, ‘আপনি যদি ১০০ জন লোককে খাওয়াতে না পারেন, তাহলে মাত্র একজনকে খেতে দিন।’ তিনি মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র কোনো বিচারেই বিবেচনা করতেন না। তার কাছে সবাই ছিল ঈশ্বরের সন্তান। তিনি বলতেন, যদি তুমি মানুষকে বিচার করতে যাও তাহলে ভালোবাসার সময় পাবে না। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মারা যান এই মহীয়সী নারী। সৃষ্টিকুলকে আমৃত্যু ভালোবাসা এই মানুষটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল।