দেশের ফুটবলাঙ্গন এখন মাতোয়ারা নারী ফুটবলারদের নিয়ে। সাবিনা-কৃষ্ণাদের নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়কে দেখা হচ্ছে দেশের ফুটবলের বাঁক বদল হিসেবে। মেয়েদের এই অবিশ্বাস্য অর্জনের পর স্বভাবতই ছেলেদের ফুটবলের রুগ্ণ রূপটা আরও বড় হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়াও নারীদের সাফল্যে ভালো করার চাপ অনুভব করার কথা স্বীকার করেছিলেন। এমনিতেই জিততে ভুলে গিয়েছিল জাতীয় দল। গত নভেম্বরে শ্রীলঙ্কায় চারজাতি আসরে মালদ্বীপকে ২-১ গোলে হারানোর পর তারা টানা সাত ম্যাচ জয়শূন্য কেটেছে। তবে নারীদের অর্জিত সাফল্য দেখে জামালরা চাপে ভেঙে পড়েননি। বরং দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচিয়ে তারা পেয়েছেন কাক্সিক্ষত জয়। ২১৩ দিন পর গতকাল কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে ফিফা প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিকদের রাকিব হোসেনের একমাত্র গোলে হারিয়েছে লাল-সবুজের দল। তাতে যেমন দীর্ঘ সময়ের জয়ের খরা কেটেছে, দলের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরাও বাংলাদেশ অধ্যায়ে মিলেছে প্রথম জয়।
র্যাংকিংয়ে ১৮ ধাপ এগিয়ে থাকলেও কম্বোডিয়ার কাছে স্বীকৃত ম্যাচে অতীতে হারের অভিজ্ঞতা নেই বাংলাদেশের। ১৯ সেপ্টেম্বর দু’দল একটি অনানুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলেছিল। যেখানে স্বাগতিকরা জিতেছিল ১-০ গোলে। সেই হারের পর কম্বোডিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সব শঙ্কা উড়িয়ে পরিকল্পিত খেলা দিয়ে ছেলেরা ফুটবলপ্রেমীদের উৎসবের আনন্দটা বাড়িয়ে দিয়েছে। কম্বোডিয়ার বিপক্ষে পাঁচবারের দেখায় এ নিয়ে চতুর্থবার জয়ের হাসি হাসল বাংলাদেশ। একটা ম্যাচ হয়েছে ড্র।
ম্যাচের শুরু থেকেই কাবরেরা ঘর সামলে ৪-১-৪-১ প্রতি-আক্রমণনির্ভর কৌশলে খেলাতে থাকেন। সুমন রেজাকে সামনে রেখে জামাল, মতিন, বিপলু ও রাকিব ছিলেন আক্রমণ গোছানোর দায়িত্বে। আতিকুর রহমান ফাহাদের ছিল হোল্ডিং মিডফিল্ডারের দায়িত্ব। আর ডিফেন্সলাইন গড়া হয়েছিল টুটুল হোসেন বাদশা, বিশ্বনাথ ঘোষ, তারিক কাজী ও রহমত মিয়াকে নিয়ে। আর তেকাঠির নিচে এই ম্যাচেও বিশ্বস্ততার ছাপ রেখেছেন আনিসুর রহমান জিকো।
ম্যাচের নবম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে অহেতুক ফাউল করে বসেন বিপলু আহমেদ। তবে সিন কাকাদার ফ্রিকিক জমা পড়ে জিকোর গ্লাভসে। ১৪ মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার সহজ সুযোগ নষ্ট করেন জামাল ভুঁইয়া। ডান দিক থেকে বিশ্বনাথের লম্বা থ্রোইন ভালো জায়গায় পেয়েও জালে রাখতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। চার মিনিট পর লেফট উইঙ্গার কাকাদার বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া জোরালো শট দারুণ ক্ষিপ্রতায় ফিস্ট করে দলকে রক্ষা করেন জিকো। ২৩ মিনিটে প্রতিআক্রমণ থেকে পাওয়া প্রথম সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন রাকিব। নিজেদের অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে দ্রুত একাই অনেকটা এগিয়ে রাকিবকে আড়াআড়ি পাস বাড়িয়েছিলেন মতিন মিয়া। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দেখে শুনে ডান পায়ের কোনাকুনি শটে কম্বোডিয়া কিপারকে পরাস্ত করেন এই রাইট উইঙ্গার।
এই গোলের পর বাংলাদেশের খেলায় দেখা যায় কিছুটা পরিবর্তন। একটু বেশিই যেন রক্ষণাত্মক হয়ে খেলতে থাকে কাবরেরার দল। তাতে আক্রমণ গোছানোর সুযোগ পেয়ে চড়াও হয়ে খেলেছে স্বাগতিকরা। চার মিনিট পর জিকোকে পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন কম্বোডিয়ার ফরোয়ার্ড কিম সোকিয়ুথ। বক্সের বাইরে থেকে তার শট অবশ্য চলে যায় বার উঁচিয়ে। বিরতি থেকে ফিরেও বাংলাদেশের রক্ষণে চাপ প্রয়োগ করে গেছে কম্বোডিয়া। তবে জিকোর দৃঢ়তার পাশাপাশি রক্ষণভাগের ভুল কম হওয়ায় বড় কোনো বিপদ ঘটেনি। উল্টো দু’বার ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। ৭৫ মিনিটে দুর্ভাগ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় মতিন মিয়ার সামনে। ফ্রিকিক থেকে বল পেয়ে বাঁ দিক থেকে একজনকে কাটিয়ে ডান পায়ের বাঁকানো শট নিয়েছিলেন মতিন। তবে তার প্রচেষ্টা কম্বোডিয়া কিপারের গ্লাভস ছুঁয়ে ক্রসবারে আঘাত হানে। এই গোলটা হয়ে গেলে আরও নির্ভার হয়ে খেলতে পারতবাংলাদেশ। সেটা তো হয়নি। বরং চারটি পরিবর্তনে বাংলাদেশ আরও খোলসে ঢুকে পড়েছিল। মাঠ ও বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে থাকলেও কম্বোডিয়া অ্যাটাকিং থার্ডে পেরে ওঠেনি। যোগ করা সময়ে ব্যবধান বাড়ানোর ফের সুযোগ পায় বাংলাদেশ। তবে বদলি মিডফিল্ডার সোহেল রানার স্বার্থপরতায় তা হয়নি। বল নিয়ে বক্সে প্রবেশ করে ফাঁকায় দাঁড়ানো সাজ্জাদকে পাস না বাড়িয়ে নিজে শট নিতে গিয়ে সুযোগ হারান চট্টগ্রাম আবাহানীর এই খেলোয়াড়।
২৮ সেপ্টেম্বর আরেকটি প্রীতি ম্যাচে নেপালের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।