৪০ বাই ২০ ফুট ঘরে আবদ্ধ মাবিয়াদের স্বপ্ন

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের ভেতরেই বড় জায়গা জুড়ে প্রায় পতিত আইভী রহমান সুইমিং পুল। যত্রতত্র জঞ্জালের ভাগাড় আর ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের ভিড় ঠেলে কয়েক কদম হাঁটলেই সুবিশাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবন (এনএসসি টাওয়ার)। এ দুই স্থাপনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে জরাজীর্ণ এক দ্বিতল ভবন। যার নিচতলার একটি ৪০ বাই ২০ ফুট কক্ষে দম আটকে যাওয়ার জোগাড় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলা ভারোত্তোলনের। এই অপরিসর জিমেই চার দিন হয়ে গেল পুরুষ ও নারীদের জাতীয় ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতা।

এসএ গেমসের শেষ তিনটি আসর প্রমাণ দিবে অন্যদের ছাড়িয়ে কতটা এগিয়ে ভারোত্তোলন। ২০১০-এ সোনার হাসি হাসিয়েছিলেন হামিদুল ইসলাম। তার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ ও ২০১৯ সালে মাবিয়া আক্তারের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা। শেষবার মাবিয়ার পাশাপাশি জিয়ারুল ইসলামের চমকে দেওয়া স্বর্ণপদক। দেশের হয়ে পরপর তিন আসরে স্বর্ণপদক জয়ের অনন্য রেকর্ড অন্য কোনো খেলার নেই। ভারোত্তোলকদের টানা সাফল্যে ক্রীড়াঙ্গনের কর্তাদের প্রত্যাশাও সীমা ছাড়িয়েছে। অথচ ক্রীড়াঙ্গনের হর্তাকর্তাদের উদাসীনতায় পদকপ্রসবা এই খেলাটাকেই এগুতে হচ্ছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

তবে চার দেয়ালে বন্দি থেকেও ভারোত্তোলকরা অদম্য। এবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ২০ ইভেন্টে নতুন জাতীয় রেকর্ড হয়েছে ২৫টি! ১৭ ক্লাব ও ৫ সংস্থার নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৩৮ জন লিফটারের সঙ্গে ফেডারেশন ও ম্যাচ অফিসিয়াল ছিলেন ১৮ জন। অর্থাৎ ১৫৬ জন মানুষের ব্যস্ততাটা ছিল ছোট্ট ওই জিমে। গতকাল ছিল সমাপনী। তাই ভিড়টাও ছিল অন্য তিন দিনের চেয়ে বেশি। পুরো জিমে গায়ে গা লাগিয়ে থাকতে হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে। এর মধ্যেই চলেছে রড-ওজনের, একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াই। ক্রমেই বাড়তে থাকা করোনার রক্তচক্ষু তোয়াক্কা করার সুযোগ তাদের নেই। ছিল না লিফটারদের বিশ্রাম নেওয়ার, ওয়ার্মআপ করার যথেষ্ট সুযোগ। ইভেন্টের আগে-পরে তাদের ঠাঁই নিতে হয়েছে সামনের নোংরা-আবর্জনায় ঠাসা এবড়োথেবড়ো রাস্তায়।

পরপর দুটি এসএ গেমসে সোনাজয়ী মাবিয়ার দেখা মিলল কক্ষের বাইরে চায়ের টং দোকানের সামনে। শুকনো হাসি দিয়ে বললেন, ‘স্বচক্ষেই তো দেখলেন। এরকম জায়গায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে হয়েছে আমাদের। তারপরও ক্রীড়া পরিষদ, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাদের চাওয়ার শেষ নেই আমাদের কাছে।’ এই প্রতিকূল পরিবেশেও এবার নিজেকে ছাড়িয়ে মাবিয়া গড়েছেন নতুন রেকর্ড। এই রেকর্ডটাই যেন আক্ষেপটা খুঁচিয়ে দিয়েছে বহুগুণে, ‘১২ বছরের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে জঘন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম এবার। এসব নিয়ে কারোই মাথাব্যথা নেই। অথচ আন্তর্জাতিক গেমসে আমাদের খেলতে হয় বিশাল জিমে, হাজারো দর্শকের সামনে। সেই আবহের সঙ্গে এবারের আবহ রাত-দিন ফারাক। ফেডারেশনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ তাদের জায়গা না দিলে কীভাবে তারা আয়োজন করবে? ভালো পরিবেশ পেলে হয়তো স্ন্যাচ ও ওভারঅল লিফটেও রেকর্ড গড়তে পারতাম।’ তিনি যোগ করেন, ‘বডি ওয়েট দেওয়ার পর দুই ঘণ্টা বিশ্রামের জন্য একটা বিশ্রামকক্ষ প্রয়োজন হয়। সেটা এখানে ছিল না। ফলে আমাদের এরকম আশপাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।’ যখন একটা ইভেন্ট চলেছে বাকি ইভেন্টের লিফটারদের এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। ভাগ্য ভালো যে পাশে থাকা বাংলাদেশ বডি বিল্ডিং ফেডারেশন তাদের জিমটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল।

অথচ যেসব খেলার কোনো ভবিষ্যৎ নেই সেরকম অনেক খেলাই নানাভাবে সরকার ও অলিম্পিক ফেডারেশনের কাছ থেকে বাগিয়ে নিচ্ছে নানা সুযোগ-সুবিধা। আর ভারোত্তোলন ফেডারেশন বারবার একটা উন্নতমানের জিমের দাবি জানিয়েও প্রতিকার পায়নি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের খেলাধুলাই এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে মনে করেন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহ-সভাপতি উইং কমান্ডার (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ, ‘৫২ বছরেও একটা ভালো জিম পাইনি। কর্তাব্যক্তিদের বারবার বলেও লাভ হয়নি। তাই এবার নিজেদের এই ছোট্ট জিমেই আয়োজন করতে হয়েছে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় খেলাটা নিঃশেষ হয়ে যাবে, ধুলাটাই (স্থাপনা) শুধু পড়ে থাকবে। একটা খুপড়ি ঘরে যখন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে, তখন পাশেই ক্রীড়া পরিষদের সুরম্য ভবনে চলছে ভাড়া-বাণিজ্য। অথচ যখন এই ভবন হয়, তখন বলা হয়েছিল প্রতিটি ফেডারেশনকে জায়গা দেওয়া হবে সেখানে।’

গত বছর এনএসসি ভবনের নিচতলায় অবস্থিত জিমন্যাসিয়ামে হয়েছিল জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। সেটা করতে গিয়ে জিমন্যাস্টিক ও তায়কোয়ান্দোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে হয়েছিল ভারোত্তোলন কর্তাদের। তাদের প্রতিযোগিতা চলাবস্থায় অন্য দুটি ফেডারেশনের লোকজন এসে ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছিল। এবার তাই সেই ভেন্যুর জন্য এনএসসিকে অনুরোধ করেনি ভারোত্তোলন ফেডারেশন। সূত্র জানিয়েছে, হ্যান্ডবল স্টেডিয়াম ও রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স বড় অঙ্কের ভাড়া দাবি করায় ফিরে আসতে হয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল দিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করা ভারোত্তোলন ফেডারেশনকে। নিজেদের সবচেয়ে অবহেলিত দাবি করে এসএ গেমসে সোনাজয়ী লিফটার ও বর্তমানে কোচ হামিদুল বলেন, ‘এটা ফেডারেশনের লজ্জা নয়। এটা গোটা জাতির লজ্জা। এরকম অবহেলা করা হলে একটা সময় কেউ আর লিফটার হতে চাইবে না। খেলাটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ সেনাবাহিনীর হয়ে এবারের আসরে তিনটি জাতীয় রেকর্ড গড়া তরুণ লিফটার আশিকুর রহমান তাজের কথাগুলো আকুতি হয়ে বেজেছে, ‘আমাদের দিকে একটু সুনজর দিন। দেখবেন আমরা আরও ভালো কিছু দেশকে এনে দিতে পারব।’

সেই সুনজর দেওয়ার লোকের যে বড্ড অভাব এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে।