আবাসনের খাতের প্রতিষ্ঠান ‘রাকিন ডেভেলপমেন্ট’ কোম্পানির মিরপুরের অফিস সন্ত্রাসী কায়দায় দখলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এমডি এস এ কে একরামুজ্জামানের বিরুদ্ধে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা।
অভিযোগে জানা যায়, তার উপস্থিতিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গত ২৪ সেপ্টেম্বর অফিস দখলের সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুইজারল্যান্ডের নাগরিক ফাদি বিতা ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমাইয়া তাসনীনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তাদের জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়।
নিজেদের অফিস ফিরে পাওয়া, দেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেছেন সুইজারল্যান্ডের নাগরিক ফাদি বিতা।
তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বুধবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন এই বিদেশি নাগরিক।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত একরামুজ্জামানের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত এস এ কে একরামুজ্জামান রাকিন ডেভলপমেন্টের সাবেক এমডি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি। ব্রাম্মণবাড়ীয়-১ (নাসিরনগর) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচন করেন একরামুজ্জামান। অবৈধভাবে ১৮৪ কোটি টাকা দুবাইয়ে পাচারের অভিযোগে একরামুজ্জামাসহ তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালের ১৩ মে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা দায়ের করে।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশের আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিল করে দুদক। এই সময়ে রাকিন ডেভেলপমেন্টের এমডি ছিলেন একরামুজ্জামান।
দুদকের মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা ২০১০ সালে দুবাইয়ে আল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল এবং থ্রি স্টার নামে দুটি অফশোর কোম্পানি খোলেন। পরে বাংলাদেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা দুবাইয়ে পাচার করেন। দুবাইয়ে ওই অর্থ উপার্জনের কোনো উৎস দেখাতে পারেননি অভিযুক্তরা। তারা দুবাইয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে কখনও জানাননি বা কোনো অনুমতি নেননি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুইজারল্যান্ডের নাগরিক বলেন, ‘প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাংলাদেশে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করা হয়েছে, যেখানে অনেক বাংলাদেশির কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কোম্পানি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন একরামুজ্জামান নামে একজন বাংলাদেশি পরিচালক। কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়ার পর পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তার অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২২ সালে তাকে অব্যাহতির পূর্ব পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি, তাই আইনের ধারা অনুযায়ী তার এ পদ অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছরধরে অবৈধভাবে তিনি এই পদে বহাল ছিলেন’।
ফাদি বিতার বলেন, ‘কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ছাড়াই এস এ কে একরামুজ্জামান কোম্পানির সম্পত্তি বন্ধক রেখে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। কোম্পানির নামে কয়েকটি অনুমোদনহীন ব্যাংক হিসাব খুলে সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। নিয়মের তোয়াক্কা না করে ‘স্টার পোরসেলিন’ নামে একটি কোম্পানির নামে ৭৩ কোটি ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। একরামুজ্জামানের ১৪ বছর ধরে এমডি’র দায়িত্ব পালনকালে এই সময়ে কোম্পানির কোনো লাভ দেখানো হয়নি, বরং প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। নানা অনিয়মের কারণে গত ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কোম্পানির ৮১তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্তক্রমে একরামুজ্জামানকে সরিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।’
ফিদার দাবি করেন, এমডির দায়িত্ব পালনকালে একরামুজ্জামান কোম্পানির প্রচুর অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে খরচ করেছেন। কোম্পানিকে সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতায় আনতে এবং এখানে গ্রাহকদের অর্থ বিনিয়োগকে নিরাপদ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিই। এতে একরামুজ্জামান নাখোশ ও ক্ষিপ্ত হন। তার অনিয়মগুলো প্রকাশ্যে আসার পর আমাকে সঠিকভাবে দায়িত্বপালনে বিভিন্ন উপায়ে বাধা প্রদান শুরু হয়। এরপরই তার উপস্থিতিতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। হামলার পর তার এবং ডিএমডি সুমাইয়া তাসনীনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বেআইনিভাবে চিঠিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘দেশে যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আরও হুমকির মুখে পড়বে। তবে শুরু থেকে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যথেষ্ট সহযোগিতা পাওয়া সত্ত্বেও ঠিকভাবে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছি না। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ থাকার পরও সহায়তা করতে গড়িমসি করছে স্থানীয় প্রশাসন’।
প্রতিষ্ঠানটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমাইয়া তাসনীন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে নারীদের নিরাপত্তা, দেশের ভাবমূর্তি, বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশিদের নিরাপত্তার মতো বিষয় জড়িত। তাই দ্রুততার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
বিষয়টি নিজ দেশের দূতাবাসকে অবহিত করার কথা জানিয়ে ফাদি বিতার বলেন, রাষ্ট্রদূত বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে কথা বলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পরও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর একটি ঘটনা দিয়ে পুরো দেশকে বিচার করতে চাই না। আমি চাই এখানে যে আইন আছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হোক।