অদ্ভুত তত্ত্বে চলছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

পেস বোলার তাসকিন আহমেদ সোমবার একটা ছবি প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোতে। ক্রাইস্টচার্চের কোনো এক মেঠোপথ ধরে হাঁটছেন জনাপাঁচেক ক্রিকেটার। মধ্যমণি সাকিব আল হাসান, ডানে তাসকিন আর মোসাদ্দেক হোসেন। বামে ইয়াসির রাব্বি আর সৌম্য সরকার। সাকিবের টি-শার্টে আক্রমণে উদ্যত সিংহের ছবি।

১৯৯২’র বিশ্বকাপে ইমরান খান দলের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করতে বাঘের ছবিওয়ালা টি-শার্ট পরেছিলেন। সেই বিখ্যাত ‘কর্নার্ড টাইগার’ তত্ত্ব তো ক্রিকেট রূপকথারই অংশ, যেভাবে উড়তে থাকা নিউজিল্যান্ডকে পরপর দুই ম্যাচে হারিয়ে ফাইনালে উঠে এসেছিল পাকিস্তান, তারপর শিরোপা লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে হারানোটা ছিল ডালভাতের মতোই। সাকিব ক্রাইস্টচার্চে সেরকমই কোনো তত্ত্ব আমদানি করেছেন কি না জানা নেই, তবে এটা স্পষ্টই বোঝা গেছে যে, বাংলাদেশ দলটা এখন আর পারফরমেন্সে নয়, তত্ত্বের জোরেই চলছে।

টেকনিক্যাল ডিরেক্টর শ্রীধরন শ্রীরামের ‘ইমপ্যাক্ট’ তত্ত্ব মেহেদী হাসান মিরাজকে বানিয়ে দিয়েছে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান আর রাসেল ডমিঙ্গোর ‘ম্যাচ আপ’ তত্ত্ব সাকিবকে ব্যাটিং অর্ডারে ঠেলে নামিয়েছে ৭-এ। ডানহাতি ব্যাটসম্যানের সামনে বামহাতি বোলার, ব্যাটিং অর্ডারে একজন বামহাতির পর একজন ডানহাতি... এমন সব উদ্ভট তত্ত্বনির্ভর ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ যে ফলটা করছে, তাতে হলফ করেই বলা যায় এই তত্ত্বের অনুসারী হয়ে অন্য কেউ বিপর্যয় ডেকে আনতে চাইবে না।

ওয়ানডে বিশ্বকাপে সফল হয়েছিলেন তিনে ব্যাট করে, টি-টোয়েন্টিতেও সেখানেই ব্যাট করেছেন বেশিরভাগ সময় যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলোতে আরও পরেই ব্যাট করতে দেখা গেছে সাকিবকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে রবিবার ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে সাকিব ব্যাট করতে নেমেছিলেন ৭-এ। প্রায় সাড়ে চার বছর পর টি-টোয়েন্টিতে ওই পজিশনে ব্যাট করলেন সাকিব, জাতীয় দলে এই সংস্করণে মাত্র তৃতীয়বার এত নিচে খেললেন। ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কারণটা জানতে চেয়েছিলেন ধারাভাষ্যকার ক্রেইগ ম্যাকমিলান। সাকিবের উত্তর ছিল, ‘আমার ওপরে ব্যাট করারই কথা ছিল। তবে ওদের দুজন স্পিনার বোলিং করছিল, আমাদের মনে হয়েছে, উইকেটে ডানহাতি-বাঁহাতির সমন্বয় রাখলে ভালো হবে। তবে আজ তা কাজে লাগেনি।’

মাত্র ১২০ বলের খেলায় যে কোনো দল চেষ্টা করে নিজেদের দলের সেরা ব্যাটসম্যানদের যতটা সম্ভব রান করার সুযোগ দেওয়ার। সেখানে মিরাজকে দিয়ে ইনিংসের উদ্বোধন করাবার দুঃসাহসের সঙ্গে দলের অধিনায়ককে ৭-এ ঠেলে নামানোর ফল যদি হয় আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ১৩৭ রান করা এবং ৮ উইকেটের হার কপালে জোটা, তাহলে সেই পরীক্ষাকে ব্যর্থ বলে বাতিলের খাতাতেই ফেলে দেওয়া উচিত।

শ্রীরাম বলেছিলেন, তিনি ইমপ্যাক্ট খোঁজেন পারফরম্যান্স নয়। সত্যিটা হচ্ছে, ইমপ্যাক্ট কিংবা পারফরমেন্স দুই-ই দুর্লভ হয়ে পড়েছে। শ্রীরাম দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয়টা ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। ছয় ম্যাচের মাত্র একজন ব্যাটসম্যান হাফ-সেঞ্চুরি করেছেন, আফিফ হোসেন ৭৭* রান করেছিলেন আরব আমিরাতের বিপক্ষে। পেস বোলারদের পারফরম্যান্সও হতাশাজনক, মোস্তাফিজুর রহমান পাঁচ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন মোটে তিনটি। প্রতি ম্যাচেই ত্রিশের ওপর রান দিয়েছেন আর সবশেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো উইকেট না নিয়ে বিলিয়েছেন ৪৮ রান।

পারফরম্যান্সই যেখানে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে খুঁজতে হচ্ছে, সেই পারফরম্যান্সের ইমপ্যাক্ট বা ম্যাচে প্রভাব খুঁজতে গিয়ে লোম বাছতে কম্বল উজাড় হওয়ার জোগাড়। সম্প্রতি আইসিসি তাদের ওয়েবসাইটে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ১৬ দলের ওপেনারদের একটা বিশ্লেষণভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে ১৬ দলের ভেতর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫। দুই ওপেনারের ব্যাটিং র‌্যাংকিং, রান, গড়, স্ট্রাইক রেট বিবেচনায় তৈরি করা এই তালিকায় বাংলাদেশের মিরাজ-সাব্বিরের নিচে কেবল নামিবিয়া!

ফেরা যাক তাসকিনের সেই ছবিতে। যে ছবির সঙ্গে এই পেসার লিখেছেন, ‘পেছন ফিরে তাকালে শুধু অনুতাপই হবে। সামনে তাকালে চোখ পড়বে সুযোগে।’ অতীত ভুলে নতুন শুরুর গল্প তো অনেকবারই লিখতে চেয়েছে বাংলাদেশ, কিন্তু ভাঙা রেকর্ডের মতো ঘুরে ফিরে সেই একই ‘উন্নতি’ আর হার থেকে শিক্ষা নেওয়ার গল্পই বেজেছে। বক্তা বদলে গেলেও বক্তব্য বদলায়নি। নিউজিল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে হারের পর বুধবার আবারও নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখিই হবে বাংলাদেশ। কে জানে সেদিন আবার কোন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট!