ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের সাধারণ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দিন ধরে টিকে আছে। শুরুতেও ইরানের ইসলামি বিপ্লব ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, আর নয়তো তা সফল হতে পারতো না। কিন্তু, ৪৩ বছর পর এসে মনে হচ্ছে, ইরানের জনগণের বড় অংশই এখন আর ইসলামি শাসন পছন্দ করছে না। কারণ বিপ্লবের সময় যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি ইসলামি শাসকরা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানেই প্রথম রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করতে এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি সাংবিধানিক বিপ্লব হয়েছিল। সেই বিপ্লবে ইসলামপন্থীরাও অংশগ্রহণ করেছিল। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর ইসলামি শাসকরা ক্রমাগত চরম কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠে। ফলে বিপ্লবের দুই দশক পর থেকেই ইরানের জনগণের বিশাল অংশ কয়েক বছর পরপরই ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসছে। তবে এবারের বিদ্রোহ আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন এবং আরও ব্যাপক ও গভীর বলেই মনে হচ্ছে।
১৯৬০ এবং ৭০ এর দশকে শাহের অধীনে আগ্রাসী ধর্মনিরপেক্ষতা, তেল-গ্যাস সহ জাতীয় খনিজ সম্পদ পশ্চিমাদের হাতে তুলে দেওয়া, দুর্নীতি এবং দমন-পীড়নমুলক রাজতান্ত্রিক শাসনে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের জনগণের বড় অংশই রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার জন্য ইসলামি প্রতীক, ধারণা এবং নেতাদের দিকে ফিরেছিল। তাদের কাছে শাহের আগ্রাসী পশ্চিমীকরণ প্রকল্পের বিপরীতে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের প্রস্তাবিত ‘ইসলামি সরকার’ ব্যবস্থাকেই সমাধান মনে হচ্ছিল। আয়াতুল্লাহরা জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সহ জণকল্যাণমূলক এক উদার ইসলামি শাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এমনকি বামপন্থীরাও ইসলামি বিপ্লবে সমর্থন দেয়। কারণ ইসলামি নেতারা নাস্তিক, কমিউনিস্ট সহ সকল মত ও পথের সহাবস্থান এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। যে কারণে বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পক্ষে লেখালেখি করেন।
কিন্তু বিপ্লবের পর ইসলামি শাসকরা হাজার হাজার কমিউনিস্টকে হত্যা করে এবং এমন একটি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে যা শাহের রাজতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে কোনো অংশেই কম দমন-পীড়নমূলক নয়। এমনকি পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর ধর্মগুরুরাও কখনো কল্পনাও করতে পারেননি এমন নিয়মও চাপিয়ে দেওয়া হয়। যেমন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সব ধর্মের নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাব পরার নিয়ম। অবশ্য, তেল-গ্যাস সহ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণের ফলে দুই দশকের মধ্যেই ইরানে মোটামুটি শক্তিশালি একটি জাতীয় বুর্জোয়া অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। এছাড়া ইরান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়ও বেশ অগ্রগতি অর্জন করে। যার প্রতিফলন দেখা যায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্রসহ যুদ্ধবিমান ও জাহাজ তৈরি এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দারিদ্র দূর করতে পারেনি ইসলামি সরকার।
অন্যদিকে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এবং বিশেষকরে ইন্টারনেট প্রযুক্তির ফলে দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় চলে আসার ফলস্বরুপ নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নারীর স্বাধীনতার আকাঙ্খাও তৈরি হতে থাকে। তারা ধর্মীয় অনুশাসন পালনে ইসলামি সরকারের জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ইরানের ধর্ম-পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া চলমান বিক্ষোভের ১৮তম দিন গত ৩ সেপ্টেম্বরে ইরানের মাশাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সামনে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা বলছিল, ‘এই আন্দোলন এখন আর শুধু প্রতিবাদ নয় বরং এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে’। রাস্তার বিক্ষোভকারীরাও স্লোগান দিচ্ছে, আমরা আর ভয় পাই না, আমরা এবার লড়ব। ইরানের ইসলামি শাসকদের অভিযোগ এই বিক্ষোভের পেছনে তাদের চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের উস্কানি রয়েছে। তবে, বাস্তবতা হলো ইরানের নতুন প্রজন্মের শহুরে তরুণদের একটা বিশাল অংশ এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনী গুলি চালিয়ে ইতিমধ্যেই প্রায় দুইশ বিক্ষোভাকারীকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। হাজার হাজার জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবুও বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ নেই এখনো। গতকাল সন্ধ্যার পর ২৮তম দিনের মতো ইরানজুড়ে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিকে, রাজধানী তেহরানের তরুণদের একটি গ্রুপ আগামীকাল থেকে পুরো দেশজুড়ে নতুন করে জাতীয়ভাবে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
তবে অনেক বিশ্লেষক আবার বলছেন, আগের সবগুলো আন্দোলনের মতোই এবারের আন্দোলনও বিপ্লবে রুপ নেয়ার আগেই নির্মমভাবে দমন করা হবে। ঠিক যেভাবে দমন করা হয়েছিল, ১৯৯৯ সালে বাকস্বাধীনতার দাবিতে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ২০০৫ ও ২০০৬ সালের নারী অধিকার আন্দোলন, ২০০৯ সালে ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং ২০১৯ সালে জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আন্দোলন। ২০১৯ সালের আন্দোলনে নিরাপত্তাবাহিনী সরাসরি গুলি করে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল।
তথাপি ইরানের জনগণের বিশ্বকে চমকে দেওয়ার নজির রয়েছে অনেক। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের সময়ও অনেকে ভাবতে পারেনি ইরানের ধর্মীয় নেতারা জনগণকে সাথে নিয়ে একটা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলবে। শাহের বন্দুকের নলের সামনেও খালি হাতে লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারবে। এবারও অনেকে ভাবতে পারেনি যে, বিক্ষোভ এক সপ্তাহের বেশি চলবে। এমনকি সরকারের ভেতরের সংস্কারবাদীরাও সরব হয়েছেন এবার। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ অধ্যাপকের সঙ্গে এক আলোচনায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেন, ‘জনগণের আশা আকাঙ্খাকে উপেক্ষা করেই তাদেরকে শাসন করা যাবে এমনটা ভাবা ভুল। মানুষকে গায়ের জোরে বেশিদিন শাসন করা যায় না’। আন্দোলনে যোগ দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের শিক্ষকরাও একাত্মতা প্রকাশ করছেন। তেহরানের বিখ্যাত শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা পোশাকে সরকারপন্থীদের হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। ৬৫ জন শিক্ষক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তরুণদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার রয়েছে। বিশাল সংখ্যক শিল্পী, ফুটবল তারকা এবং ক্রীড়াবিদ আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করেছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোও আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেছে।
বড় ঘটনা হলো এবারের আন্দোলনে তরুণী ও স্কুলছাত্রীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু কামনা করে স্লোগান দিয়েছে। এরপর শ্রমিকরাও খামেনির মৃত্যু চাই বলে স্লোগান দিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো এমন স্লোগানে ইরানের ডিপ স্টেট তথা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরাও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছেন। যেমন গত সোমবার কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি এজেই বলেন, ‘আমি প্রস্তুত। চলুন কথা বলি, আমরা যদি ভুল করে থাকি, সেগুলো সংশোধন করতে পারি’। ইসলামি বিপ্লবের ৪৩ বছর পর এই প্রথম এমন নরম সুর বের হলো দেশটির বিচার বিভাগের প্রধানের গলা থেকে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিও একসময় বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন।
ইরানে এর আগের নারী অধিকার আন্দোলনগুলোকে পশ্চিমা চক্রান্ত বলে খুব সহজেই দমন করা গেছে। কিন্তু এবারের আন্দোলন নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে একটি পাল্টা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রুপ নিয়েছে। এই ধরনের বিপ্লব অনেক সময় রাজনৈতিক বিপ্লবের চেয়েও বেশি শক্তিশালি এবং দমন করা কঠিন হয়। আর ইরানের এবারের আন্দোলনকারীদের জন্মই হয়েছে ইসলামি বিপ্লবের পরে এবং তারা মূলত ইন্টারনেট যুগে বেড়ে উঠেছে। ফলে তাদের মাথায় পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো কোনো মানসিকতাও নেই।
ইরানি কবি ও পণ্ডিত ফাতেমেহ শামস বলেন, ‘ইরানের এবারের আন্দোলন অনেক বেশি আমূল পরিবর্তনকামী নাগরিক ভিত্তিক রাজনীতি। আর এই প্রজন্ম ১৯৮০ ও ৯০-র দশকের প্রজন্মের চেয়ে একেবারেই আলাদা। তাদের কল্পনা এবং আকাঙ্খাও একেবারেই ভিন্ন। আমাদের প্রজন্মের মেয়েরা রাস্তায় নেমে মাথার হিজাব ছুড়ে ফেলে তা দিয়ে আগুন জ্বালানোর মতো কাণ্ড ঘটানোর কল্পনাও করতে পারতো না। এমন একটি প্রজন্মকে ক্ষেপিয়ে তোলা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল’।
আগের যে কোনো আন্দোলনের চেয়ে এবারের আন্দোলন পুরো ইরানজুড়ে অনেক বেশি ছড়িয়েছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রতিটি প্রদেশেরই একাধিক শহরে বিক্ষোভ চলছে। এমনকি ইসলামি বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল মাশাদ এবং কোম শহরেও নারীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। ইরানের রাজনীতিতে নারীরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে আসছেন। ১৮৮৬ সালের তামাক আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯০৬ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও ইরানের নারীরা উল্লেযোগ্য ভুমিকা রেখেছিলেন। আর এবারের আন্দোলনের একেবারে নেতৃত্বেই রয়েছেন নারীরা।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, আন্দোলনে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্মের উপস্থিতি। এই প্রজন্ম ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবও দেখেনি, ১৯৮০-৮৮ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধও দেখেনি। ফলে তারা ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। এই প্রজন্ম রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে আমূল পরিবর্তন চায়। কিন্তু, সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে তারা হয়তো এখনই কোনো বিপ্লব ঘটাতে পারবে না। তবে, ইসলামি শাসকরা তাদের শাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে বাধ্য হবে এবং অবশেষে নতুন এই প্রজন্মের হাত ধরেই হয়তো ইরানে অচিরেই সেই সাংবিধানিক বিপ্লবের সময় থেকে গত শত বছরেরও বেশি সময় ধরে কাঙ্খিত গণতন্ত্র আসবে।