'খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি দিতাম পাখির পায়' —মানুষের ভেতরে এই অচিন পাখিকেই খোঁজ করেছেন তিনি। তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে চেনা ও মানুষকে ভজন করে পার করে দিয়েছেন এক জীবন। তিনি ফকির লালন সাঁই। আজ তাঁর ১৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির ছেঁউরিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতি বছর এ সময় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় কালিন্দী নদীর ধারে লালন ভক্ত-সাধকদের মিলনমেলা বসে। হয় তিন দিন ধরে অনুষ্ঠান। করোনার কারণে দুই বছর বন্ধ ছিল এ উৎসব। সরকারের অনুমতি পাওয়ায় এ বছর তিন দিনের স্মরণোৎসব শুরু হয়েছে।
এ আয়োজনকে আরও বর্ণিল করতে সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমির উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে আখড়াবাড়ীর বাইরে মাঠে বিশাল প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। লালন মঞ্চে লালন একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি ও লালন সংগীত শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় আলোচনা সভার পর রাতভর চলবে লালন সংগীতের আসর।
২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি 'শ্রোতা জরিপ'-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিল - সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? তিরিশ দিনের ওপর চালানো সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০ জন বাঙালির তালিকায় ১২তম স্থানে আসেন সাধক লালন ফকির। লালন ফকির ছিলেন একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক ও দার্শনিক। তাঁর গানের মধ্যে সন্ধান পাওয়া যায় এক বিরল মানব দর্শনের।
লালন শাহ, যিনি লালন ফকির বা লালন সাঁই নামেও পরিচিত, তিনি মৃত্যুর ১৩২ বছর পর আজও বেঁচে আছেন তাঁর গানের মাঝে। তাঁর লেখা গানের কোন পাণ্ডুলিপি ছিল না, কিন্তু গ্রাম বাংলায় আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তাঁর রচিত গান ছড়িয়ে পড়ে লোকের মুখে মুখে। লালন ফকিরকে 'বাউল-সম্রাট' বা 'বাউল গুরু' হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তাঁর গানের মাধ্যমেই উনিশ শতকে বাউল গান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি প্রায় দু হাজার গান রচনা করেছিলেন বলে লালন গবেষকেরা বলেন।
তার কর্ম সবার জানা কিন্তু তার ধর্ম আজও অজানা। তার জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোন কোন গবেষক ধারণা করছেন তিনি অবিভক্ত বাংলার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
লালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। আর সেই মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আত্ম সাধনার মাধ্যমে। দেহের ভেতরেই মনের মানুষ বা যাকে তিনি অচিন পাখি বলেছেন, তার বাস। সেই অচিন পাখির সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়ে দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর মাধ্যমে। আর এটাই বাউলতত্ত্বে 'নির্বাণ' বা 'মোক্ষ' বা 'মহামুক্তি' লাভ। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।
তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষ এর কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন, কিন্তু শরীরেই মনের বাস। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না। লালন, মানব আত্মাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে। খাঁচার ভেতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সঙ্গে, যা সহজেই খাঁচারূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দী করে রাখা যায় না।