চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেস শুরু হয়েছে। এই কংগ্রেসে মাও সে-তুংয়ের পর দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হিসেবে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর অবস্থান পোক্ত করতে পারেন।
রোববার (১৬ অক্টোবর) প্রথম দিনের বড় অংশ জুড়েই থাকল নিজেদের পরাক্রমের ইতিবৃত্ত। সূত্রের খবর, সম্মেলনে দেখানো হয়েছে গালওয়ান সংঘর্ষের কিছু অংশের ভিডিও চিত্র। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং গালওয়ানের ঘটনাকে নিজের শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম হাতিয়ার করেছেন বলে মত কূটনীতিকদের একাংশের।
তাদের মতে, কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে গালওয়ান-সংঘর্ষের ভিডিও দেখানো নয়াদিল্লি-বেইজিং সম্পর্কের তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গালওয়ানের ভিডিও দেখানোর লক্ষ্য যদি ভারত হয়, তা হলে তাইওয়ান নিয়ে সি চিন পিংয়ের বক্তব্যের নিশানা অবশ্যই আমেরিকা। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তার স্পষ্ট ঘোষণা, তাইওয়ানে বলপ্রয়োগ করা হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে চীনের আমজনতাই। জবাব দিতে দেরি না করে তাইওয়ানও বলেছে, মাথা নত করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
২০২০ সালের ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন ২০ জন ভারতীয় জওয়ান। দীর্ঘ ৪৫ বছর পরে ভারত-চীন সেনাবাহিনী এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। ওই ঘটনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তিক্ত করে তুলেছে। ঘটনার দু’বছর পরেও তা স্বাভাবিক হয়নি।
সূত্রের খবর, সিপিসি-র সম্মেলন চলাকালীন চীনের সরকারি গণমাধ্যমে গালওয়ান সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, নিহত সেনার দেহ, নদীর পানি ঠেলে পরস্পরের দিকে এগিয়ে চলেছে দুই দেশের সেনা। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে চীনের সেনাবাহিনী, গালওয়ান উপত্যকায় নিজেদের জাতীয় পতাকা ধরে দাঁড়িয়ে কয়েক জন চীনা সেনা। এই দৃশ্যগুলি দেখানোর পাশাপাশি, এক চীনা সেনা ওই দিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে চলেছেন গণমাধ্যমে। তার নাম কিউই ফাবাও। যিনি গালওয়ান সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন। এ বছর বেইজিং অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকসে এই ফাবাওকে দিয়েই মশাল বহন করিয়েছিল চীন। যার প্রতিবাদে ওই অলিম্পিকের উদ্বোধনী এবং সমাপ্তি অনুষ্ঠান বয়কট করেছিল ভারত। গালওয়ান যুদ্ধে আহত ফাবাওকে পরবর্তীকালে পুরস্কৃতও করেছিল চীন প্রশাসন। ‘বীরত্বে’র জন্য এ বারের পার্টি সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সুযোগও পেয়েছেন তিনি। সূত্রের খবর, গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ ফাবাও আজ ছিলেন অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সিপিসি সম্মেলনের আগে ভারতের সঙ্গে সীমান্তে সংঘর্ষ বাধানো এবং ভারতকে সীমান্তে সেনা মোতায়েনে বাধ্য করে সি চিন পিং আসলে পার্টির মধ্যে নিজের ক্ষমতা আরও বেশি করে প্রদর্শন করতে চেয়েছেন। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। ওই সূত্রটি জানাচ্ছে, পার্টি সম্মেলনে সেনার পরাক্রমের বিভিন্ন ফুটেজ দেখানো হয়েছে। যার বড় অংশ জুড়ে ছিল গালওয়ান।
সি চিন পিং বলেছেন, সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থে সেনাবাহিনীকে আরও আধুনিক করে তোলা হবে। একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন, সেনাবাহিনী চলবে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশেই। রাজনৈতিক
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অরুণাচল এবং লাদাখ সীমান্তে অস্থিরতা নিয়ে বার বার আলোচনার পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছে ভারত। ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার কথা বলেছে। তা সত্ত্বেও সিপিসি-র সম্মেলনে গালওয়ান প্রসঙ্গ তুলে চীন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কারও কথায় কান দেবে না।
গালওয়ানের মতোই তাইওয়ান নিয়েও একরোখা চীন। সি চিন পিং সম্মেলনের প্রথম দিনে স্পষ্ট করেই বলেছেন, তাইওয়ান চীনের বিষয়, চীনই এর সমাধান করবে। চীনের সঙ্গে তাইওয়ান সংযুক্তিকরণে আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে এবং সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালাবো। কিন্তু শক্তিপ্রয়োগ করা হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না।
চীনা প্রেসিডেন্টের ইঙ্গিত, তাইওয়ান নিয়ে কোনও তৃতীয় পক্ষকে বেইজিং কোনও অবস্থাতেই বরদাস্ত করবে না। তাইওয়ানে চীন-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর ওপরে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করতে চীন যে পিছপা হবে না তাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন সি চিন পিং।