দেশে এলএসডি রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, টিকার ঘাটতি

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসজনিত রোগ লাস্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি)। এই ভাইরাসটি মূলত গৃহপালিত গরু ও মহিষকে আক্রান্ত করে। ২০১৯ সালে দেখা দেওয়া এ রোগের নির্দিষ্ট টিকা বভিবক্স আমদানি  না করায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গাইড লাইন অনুযায়ী গরুকে বসন্ত রোগের টিকা গোট পক্স দেওয়া হচ্ছে। এতে কিছু ফল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি গোটা পক্সের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশের গরু ও মহিষের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এলএসডি প্রথম ধরা পড়ে। প্রথমে চট্টগ্রামে আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া উপজেলায়। পরবর্তীকালে এ রোগ ছড়ায় দেশের অন্যান্য জেলায়। ২০১৯ সালে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯৭টি গরুর মৃত্যু হয়। এসময় দেশে এ রোগের কোনো টিকা ছিল না। পরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মরক্কো থেকে এলএসডির জন্য বভিবক্স নামে টিকা আমদানির অনুমোদন দেয়। সেটা ১১ মাসের জন্য। ২০২০ সালে দেশে ভ্যাকসিন আসে মরক্কো থেকে।

এসিআই লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং ম্যানেজার ডা. আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সে সময় এলএসডি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে এ টিকার চাহিদা ছিল। পরের বছর রোগের পাদুর্ভাব কমে যাওয়ায় টিকার চাহিদা কমে যায়। এ কারণে ব্যাপক আকারে টিকা আনা হয়নি। এ বছর রোগটি আবারও বাড়লে টিকার চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু কারও কাছে পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় এটা কেউ দিতে পারছে না।

সরকারের প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চলতি মাস পর্যন্ত গোটা পক্স টিকা উৎপাদন করেছে ২৫ লাখ ডোজ। এ ছাড়া তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলএসডির জন্য টিকা আমদানি করছে। দেশে টিকা দেওয়ার যোগ্য গরু ও মহিষ আছে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ।

এসিআই লিমিটেডের বিজনেস ম্যানেজার ডা. মইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে এ পর্যন্ত লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরু সংখ্যা ১০  থেকে ১২ লাখ হবে। এ রোগে খুব কম গরুই মারা যায়। তবে গর্ভবতী প্রাণীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে আমদানি করা যে টিকা আছে তা দিয়ে সারা দেশের গরুকে টিকা দেওয়া কোনো মতেই সম্ভব নয়। আর এই মুহূর্তে টিকা আসারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল মিলিয়ে মোট গবাদি পশু আছে ৫ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার। এর মধ্যে গরু আছে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার; মহিষ প্রায় ১৫ লাখ; ভেড়া ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার এবং ছাগল আছে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৪ হাজার। এসব গবাদি পশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরু এলএসডিতে আক্রান্ত হয়। এরপরে মহিষের এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পরিচালক ড. অমলেন্দু ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশের চাহিদা অনুসারে আমাদের প্রতিষ্ঠান টিকা উৎপাদন করে। এ অর্থবছরে এলএসডির জন্য ৩০ লাখ গোট পক্স টিকা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।  এখন পর্যন্ত ২৫ লাখ টিকা উৎপাদন হয়ে গেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গত তিন মাসে লাম্পি স্কিন ডিজিজে (এলএসডি) আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ৭০১টি গরু। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৯৫২টি, আগস্ট মাসে ২ হাজার ৯টি। এর আগে জুলাই মাসে এলএসডিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৭৪০টি গরু। এই তিন মাসে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ১৫৩টি গরু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে আক্রান্ত প্রাণীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৮টি। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৭৩৯টি, সিলেটে ২১৯টি, বরিশাল ও রাজশাহীতে ৬২টি করে ১২৪টি এবং রংপুরে ৫৯টি গরু উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ৯০০ গরু চিকিৎসা নিয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও এপিডেমিওলজি ইউনিটের প্রধান ডা. মোজাফফর গনি উসমানি জুয়েল দেশে রূপান্তরকে বলেন,  দেশে গত তিন মাসে লাম্পি স্কিন ডিজিজে (এলএসডি) আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ৭০১ টি গরু।

এলএসডি রোগের লক্ষণ: লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) একটি ভাইরাসঘটিত রোগ, যা মূলত গৃহপালিত গরু ও মহিষকে আক্রান্ত করে। প্রাণীর গায়ে ফোসকা দেখে প্রাথমিকভাবে এই রোগ শনাক্ত করা হয়। লাম্পি স্কিন ডিজিজ ছড়িয়ে পড়লে গরু পালনের সঙ্গে জড়িত সকলে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই  রোগের ফলে গরু থেকে মাংস ও দুধ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে আসে গর্ভপাত এবং অনুর্বরতার মতো বিষয়গুলো।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিস্বাস্থ্য শাখার উপপরিচালক ডা. মো. শাহিনুর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মশা-মাছি, মুখের লালা ও খামারে অব্যবস্থাপনার কারণে এ রোগ ছড়ায়। এ রোগে প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রিতে  পর্যন্ত হয়ে থাকে। গরু খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। শরীরে খুবই ব্যথা হয়। তার দুদিন পর গরুর শরীরের বসন্তের মতো গুটি গুটি চাকা দেখা দেয়। পরে  সেখান থেকে পুঁজ জমে ফেটে মাংস খসে পড়ে। এতে গরুর ওজন ও দুধ উৎপাদনও কমে যায়। আক্রান্ত গরুকে শনাক্ত করে আলাদা রাখতে না পারলে অন্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জুন, জুলাই ও আগস্টএই তিন মাস এলএসডির জন্য পিক টাইম।