কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

কোটি টাকার আসবাবে ঘুণ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) নবনির্মিত শেখ হাসিনা হলের জন্য আসবাবপত্র সরবরাহের দুই মাসের মাথায় তাতে ঘুণে ধরেছে। এসব আসবাবপত্র কেনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, ছাত্রনেতা ও আসবাবপত্র ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, রাবার কাঠের তৈরি আসবাবপত্রগুলো মানসম্মত নয়, এগুলো সর্বোচ্চ ছয় মাস টিকবে। এ ছাড়া রাবার কাঠের মান ভালো না হওয়ায় সচরাচর তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ আসবাবগুলোকে কুবির ইতিহাসের সেরা মানসম্পন্ন আসবাবপত্র বলে দাবি করেছেন।

জানা গেছে, শেখ হাসিনা হলসহ আরও কয়েকটি ভবনের জন্য ৭১ লাখ ৭৫০ টাকার চুক্তিতে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আসবাবপত্র সরবরাহ করতে থাকে। তবে মান ভালো না হওয়ার অভিযোগে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। এরপর চলতি বছর ১৭ এপ্রিল সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন উড ওয়ার্কসকে ১ কোটি ১০ লাখ ৮ হাজার ৭৭ টাকায় একই প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রথম দরপত্রে আকাশি কাঠের আসবাব সরবরাহের কার্যাদেশ দিলেও পরবর্তী দরপত্রে দেড় গুণ বেশি ব্যয়ে রাবার কাঠের আসবাবপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয় কুবি কর্র্তৃপক্ষ। তবে আসবাবপত্র বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশি কাঠের চেয়ে রাবার কাঠের দাম কয়েক গুণ কম।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ ছাত্রনেতা বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের লোকদের অবৈধ যোগসাজশ না থাকলে দাম বাড়িয়ে নিম্নমানের আসবাবপত্র দিতে পারে না। স্পেসিফিকেশন কমিটির সুপারিশেরও ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।’

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো কেনাকাটায় দরপত্র আহ্বানের আগে পণ্যের চাহিদা ও বিবরণ তৈরি করে স্পেসিফিকেশন কমিটি। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করে কুবি কর্র্তৃপক্ষ। তবে স্পেসিফিকেশন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আগের দরপত্রে আকাশি কাঠ দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের অজান্তেই পরবর্তী প্রতিষ্ঠানকে রাবার কাঠের আসবাব সরবরাহ করতে বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে আসবাবপত্র স্পেসিফিকেশন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. শামিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে আকাশি কাঠের আসবাবপত্র কেনার জন্য স্পেসিফিকেশন তৈরি করে দিয়েছিলাম। কমিটির সুপারিশকৃত আসবাবপত্র প্রশাসন কেন দেয়নি, সেটা তারা জানে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এসএম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আসবাবপত্র কেন ঘুণে ধরেছে এটা ওরা (ঠিকাদার) এলে দেখাব। যদি সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে এটা ওরা রিটার্ন (ফেরত) নেবে।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন আসবাবপত্র ক্রয় ও বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। যদি আসবাবপত্রে সমস্যা থাকে, তাহলে ওরা পরিবর্তন করে দেবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন ঘুণে ধরা আসবাবগুলোকে কুবির ইতিহাসের সেরা মানসম্পন্ন আসবাবপত্র বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘যাচাই-বাছাই কমিটি আগেই ফ্যাক্টরিতে গিয়ে যাচাই-বাছাই করেছে। এ আসবাবপত্রের কোয়ালিটি ভেরি হাই ও বেস্ট কোয়ালিটি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন ফার্নিচার আগে আসেনি।’

তবে আসবাবপত্র যাচাই-বাছাই কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জিএম মনিরুজ্জামান বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, শেখ হাসিনা হলের আসবাবপত্র তারা যাচাই-বাছাই করেননি।

সরবরাহ করা আসবাবে দুই মাসেই ঘুণে ধরার কারণ জানতে চাইলে ইস্টার্ন উড ওয়ার্কসের ব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আসবাবপত্রগুলো রাবার কাঠের হলে নষ্ট হওয়ার কথা নয়। আমরা তো রাবার কাঠই দিয়েছি। এ কাঠ ৫০-১০০ বছরেও কিছু হওয়ার কথা নয়। তবুও এ ক্ষেত্রে আমাদের ট্রিটমেন্ট ইউনিটের কোনো ত্রুটি হয়েছে কি না তা খোঁজ নেব। আর পর্যবেক্ষণের জন্য শিগগিরই টিম পাঠাব। ওরা কোনো সমস্যা দেখলে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’