সরকারি সমন্বয়হীনতা-দুর্নীতির কারণে গ্রিড বিপর্যয়: বিএনপি

৪ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ সারাদেশে ব্ল্যাক আউট হয়। এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সরকারের সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছে বিএনপি। পাশাপাশি বিদ্যুৎখাত নিয়ে নিজেদের পরামর্শ উপস্থাপন করেছে দলটি।

শুক্রবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষে এসব কথা তুলে ধরা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্থায়ী কমিটির কনিষ্ট সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ নেটওয়ার্ক ও গ্রাহক সংযোগ-এই চারটি মৌলিক স্তরের সুসমন্বয় জরুরি। এটি না করায় ২০১৪, ২০১৭ ও ২০২২ সালে একের পর এক জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় ঘটছে। ঘটনার পর দায়সারা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ দূর না করে বিদ্যুৎখাতকে  সরকার ‘বিলিয়নিয়ার’ তৈরির কারখানায় পরিণত করেছে। এতে করে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন সংকটাপন্ন হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার বিদ্যুৎখাতে দায়মুক্তি আইন করে। এতে বলা হয় বিদ্যুৎ কোম্পানি কিংবা সংশ্লিষ্টরা অনিয়ম করলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই করা যাবে না। এমনকি কোনো আদালতে এদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা যাবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে সবাই মিলে দুর্নীতি করছে এরা, আর তার দায়ভার বহন করতে হচ্ছে এবং হবে এ দেশের সাধারণ জনগণকে। অথচ চুক্তি করার সময় প্রতি ইউনিট বেশি দামে বিক্রি, ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানিতে শুল্ক ছাড়, সহজ সুদে ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেওয়া, জমি ক্রয়ে সুবিধা- ইত্যাকার অসংখ্য অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছে এসব কোম্পানিকে। চুক্তির ফাঁকে ও ফাঁদে আটক দেখিয়ে আদতে আওয়ামী লীগের লোকেরাই কৌশলে এ টাকা বাগিয়ে নিয়েছে। অথচ চলমান জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের মতো এহেন ক্রান্তিকালেও অলস কুইক রেন্টাল বিদুৎকেন্দ্রগুলো চালানোই যায়নি।’

এ সময় দলটির নেতারা বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়মুক্তি আইন করে মানুষের রক্তচোষা এ সকল দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে চাইছে। কিন্তু কোনভাবেই তাদের রক্ষা করা যাবে না। কারণ জনগণ নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করলেও তারা সেবা পাচ্ছেন না। বরং ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন জনগণ। তাই জনগণের আদালতে একদিন এদের বিচার হবেই হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে বলা হয় “বিদ্যুতের মহাসড়ক” যার মাধ্যমে সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে এ ধরণের বিপর্যয়ের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসাবেই বিবেচিত হয়। নিয়মিত বিরতিতে চলছে গ্রিড বিপর্যয়। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০২২ সালের ঘটনা বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক মহা সতর্ক বার্তা। প্রত্যেক বারের মত এবারও রুটিন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন যেখানে মাত্র ৬৯% ও ১৪০% বেড়েছে, সেখানে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ৪১৭%। উৎপাদন পরিকল্পনায় অপরিণামদর্শিতার অভাবে মহাপরিকল্পনাটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র- ২০২০ সালের ডিসেম্বরে উৎপাদনে গেলেও সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ শেষ না হওয়ায় কেন্দ্রটি সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করছে। অথচ কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে কেন্দ্রটিকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্য যে সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে যতটা আগ্রহী, সঞ্চালন লাইন সংস্কার ও আধুনিকায়নে ততটাই নিষ্ক্রিয় থেকেছে। সঞ্চালন লাইন দুর্বল, লোড ব্যবস্থাপনাও আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে বারবার গ্রিড বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। এনালগ পদ্ধতির লোড ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ করছে জাতীয় গ্রিডকে।’

বিএনপি নেতারা বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে আমদানি নির্ভরতা বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ। সরকার বাপেক্সকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। স্থলভাগে ও সমুদ্রে গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ মিয়ানমার তাদের অংশে এরইমধ্যে গ্যাস উত্তোলন করেছে। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। ওপেক কিংবা ওপেক প্লাস দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস কেনার জন্য বড় ও স্থায়ী সরবরাহ চুক্তি করেনি সরকার। অথচ কমিশন খাওয়ার জন্য তেল উৎপাদনকারী নয় এমন বড় দেশ যেমন চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ওপরদিকে মোট আমদানির ৫০% স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাতার ও ওমানের মতো দেশের বড় গ্যাস সরবরাহের চুক্তির অফার উপেক্ষা করে কমিশন খাওয়ার লোভে উচ্চদামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনছে সরকার।’

তারা বলেন, ‘এদিকে হাতে ডলার নেই। এক বছরে আমদানি-রপ্তানি ঘাটতি ৩৩ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক রিজার্ভ কমছে। সেপ্টেম্বরের হিসাবে যা ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটা ফাঁকি আছে যা আইএমএফ উত্থাপন করেছে। রিজার্ভ স্থিতি ভাল নয়। রেমিট্যান্স প্রবাহও সুখকর নয়। সরকার তাই রিজার্ভ এর ডলার রক্ষা করতে তেল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে শেষ রক্ষা হয় কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’

বিএনপি নেতারা বলেন, ‘সরকার সবকিছুর জন্যই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর করোনার দোষ দিয়ে পার পেয়ে যেতে চাচ্ছে। অথচ করোনা কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগ থেকেই সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতি খাদের কিনারে চলে এসেছিল।’