হু জিনতাওকে সরিয়ে নেওয়ার নতুন ভিডিও রহস্য আরও বাড়ালো

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গত শনিবার দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসের সমাপনী পর্বের সম্মেলন চলাকালে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে একপ্রকার ধরেবেঁধেই মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।এই ঘটনার ছবি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তেই জল্পনা শুরু হয়ে যায়। এবার হু জিনতাওকে নাটকীয়ভাবে সরিয়ে নেওয়ার আগের মুহূর্তগুলোতে যা যা ঘটেছিল তার একটি নতুন ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভিডিওতে হুর বামে বসা পলিটব্যুরোর বিদায়ী সদস্য লি ঝানশুকে সাবেক প্রেসিডেন্টের হাত থেকে একটি নথি সরিয়ে নিতে ও তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকেও ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে দীর্ঘ নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে, যিনি পরে হুকে মঞ্চ ছেড়ে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন ও হাত ধরে তাকে বাইরে নিয়ে যান। সিঙ্গাপুরভিত্তিক চ্যানেল নিউজ এশিয়া এ ভিডিওটি প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

হু জিনতাওকে কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়ার এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত’ ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এর মাধ্যমে শি তার ক্ষমতা দেখিয়েছেন; বুঝিয়েছেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হুর যুগ সুস্পষ্টভাবেই শেষ হয়ে গেছে। তবে অনেকেই বলছেন, মূলত হুর অসুস্থতার কারণেই তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া পরে টুইটেও জানায়, অসুস্থ বোধ করায় হুকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। চীনে টুইটার নিষিদ্ধ থাকায় দেশটির জনসাধারণ অবশ্য সিনহুয়ার এই ভাষ্য জানতে পারেনি। হুকে সরিয়ে নেওয়ার ওই ঘটনার পরদিনই সিপিসির শীর্ষকর্তা হিসেবে শির তৃতীয় মেয়াদ শুরুর ঘোষণা আসে; এবার দলের পলিটব্যুরোতেও তার অনুগতরাই আরও জেঁকে বসেছে বলেও ভাষ্য পশ্চিমা গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের।

হু জিনতাও ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সেসময় তিনি দেশকে বাইরের বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করার প্রয়াস নিয়েছিলেন বলেই মনে করা হয়। অন্যদিকে শি এমন একটা দেশ পরিচালনা করছেন, যেটি ক্রমশ নিজেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

চ্যানেল নিউজ এশিয়ার ওই ফুটেজ ‘হুর অসুস্থতা’ সংক্রান্ত চীনা সরকারের অবস্থান খারিজ না করলেও সাবেক প্রেসিডেন্টের সামনে থাকা নথিটিও যে তাকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে।

এক পর্যায়ে ঝানশু হুকে সহায়তায় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন বলেও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, যদিও শেষমেষ পলিটব্যুরোর এই বিদায়ী সদস্য আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি, তার আগেই বাম পাশে থাকা ওয়াং হানিং তাকে টেনে ধরে ফের আসনে বসিয়ে দেন বলে মনে হচ্ছে। 

তাকে হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় হু প্রেসিডেন্ট শিকে কিছু একটা বলেন, সেসময় শিকেও মাথা নাড়তে দেখা গেছে। তবে শির চোখে-মুখে সেসময় আবেগের কোনো বহিঃপ্রকাশ ছিল না। হুকে নিয়ে যাওয়ার সময় মঞ্চের সামনের সারিতে বসে থাকা বাকি নেতৃত্বকে তার দিকে ঘুরে তাকাতেও দেখা যায়নি।

কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্টাডি টাইমসের সাবেক সম্পাদক দেং ইউয়েন বলেছেন, চারপাশে এত এত ক্যামেরা, এর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে হুর পড়ার অধিকার নেই এমন কোনো নথি তার সামনে রাখার কোনো কারণই নেই। এটা অবশ্যই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ওই নথিতে কী ছিল, এবং ওই সময়ে ঘটনাস্থলে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল সে বিষয়ে আরও তথ্যপ্রমাণ না পাওয়া গেলে কেউই এই ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারবে না।

অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ওয়েন-টি সুংও বলছেন, নতুন ফুটেজ থেকেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। চীন মূলত কঠোর শৃঙ্খলার ভেতর চলে, বিশেষ করে এমন উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে, আরও বিশেষত শি’র জমানায়, যেখানে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।

কংগ্রেসের মঞ্চে হওয়া এই নাটক ‘স্ক্রিপ্টের বাইরে’ এবং হু জিনতাওয়ের অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ থেকে উদ্ভূত হলেও, এখন এটিকে শির নতুন পলিটব্যুরোর আবির্ভাবের প্রতীক হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়। চীন যে আর কখনোই হু জিনতাও জমানার নীতিতে ফিরছে না, ওই ঘটনার পরদিন হওয়া পলিটব্যুরোতে যে সেই বার্তাই এসেছে।

শনিবার কংগ্রেস শেষে আবারও ৫ বছরের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ ফোরাম পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির (পিএসসি) প্রধান হয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফলে তিনিই ফের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। এই নিয়ে টানা তৃতীয় বার সিপিসির পলিটব্যুরো কমিটির প্রধানের পদে এলেন ৬৯ বছর বয়সী জিনপিং। এর মধ্য দিয়ে চীনের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস তৈরি হল। মাও সে-তুংয়ের পর দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হিসেবে আবির্ভুত হলেন শি জিনপিং। প্রতি ৫ বছর পর পর কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত হয় চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে। গত ১০ বছর ধরেই পার্টির সর্বোচ্চ ফোরামের প্রধান হিসেবে আছেন শি জিনপিং।

কমিউনিস্ট শাসিত চীনের সংবিধান অনুযায়ী, পার্টির ২৫ সদস্যবিশিষ্ট পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধানই দেশটির রাষ্ট্রপতি হন। শি জিনপিং তৃতীয় বারের মতো এই কমিটির প্রধান হওয়ায় নিশ্চিতভাবেই আরও ৫ বছর চীনের প্রেসিডেন্ট থাকছেন তিনি। এমনকি তিনি চাইলে আজীবনও চীনের রাষ্ট্রপ্রধান পদে থাকতে পারবেন। এমনকি অনেকেই মনে করেন যে, ৬৯ বছরের শি জিনপিং হয়তো আজীবনের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখবেন।

আরও পড়ুন...

মঞ্চ থেকে হু জিনতাওকে জোর করে সরিয়ে নেওয়া কীসের ইঙ্গিত?

ফের ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় শি জিনপিং, চীনে নতুন ইতিহাস